Home » মতামত » ঈদ পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে আতঙ্ক – সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া

ঈদ পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে আতঙ্ক – সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া

দিন বদলের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছিল বর্তমান সরকারকে। কিন্তু এ কেমন দিন বদল?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

peoples reactionঈদ পরবর্তী রাজনীতির উত্তাপ বাড়বে বৈ কমবে না। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, কঠোর আন্দোলনের। সরকার অনমনীয়। এমন অবস্থায় সহিংসতার মাধ্যমেই কি সমাধান আসবে এমন প্রশ্ন করছেন অনেকেই। এমন পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতি তো বটেই রাজনীতিসমাজ এমনকি মানুষের জন্যও ভালো হবে না। এরই মধ্যে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। খুনছিনতাইডাকাতি বেড়ে গেছে। মানুষ চরম অস্বস্তি নিয়ে এবার বাড়ি যাচ্ছে। ফিরতে পারবে কিনা, ফিরলেও কেমন দাঁড়াবে রাজনীতির চেহারা, তা নিয়ে চিন্তিত। সাধারণ সাধারণ মানুষের কিছু প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হলো।

ঢাকার উত্তরায় বসবাসকারী বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত আবু সালেহ আহমেদ বলেন, একটি হলো দলীয় ভাবনা, অপরটি জাতীয় ভাবনা। জাতীয় ভাবনার অনুকূলে দলীয় ভাবনা নিরূপিত হলে দলীয় ভাবনাও জাতির কাছে হয়ে উঠতে পারে প্রিয় ভাবনা। এমন ভাবনা গণআকাঙ্খার প্রতিনিধিত্ব করার কারণে তা গণতান্ত্রিক ভাবনা হিসেবেও পরিগণিত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের রাজনীতি যেন জাতীয় ভাবনার অনুকূলে যেতে চাইছে না, বরং নানা ছলাকলা, দমনপীড়ন ও কলাকৌশলের মাধ্যমে পুরো জাতিকে সংকীর্ণ দলীয় ভাবনা ও দলীয় স্বার্থের অনুগামী হতে বাধ্য করতে চায়। ব্যাপারটি আরো মারাত্মক হয়ে ওঠে তখন, যখন দেখা যায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরাও শপথের কথা ভুলে গিয়ে দলীয় উন্মাদনায় নেতাকর্মীদের বিপজ্জনক পথে অগ্রসর হওয়ার আহবান জানান।

রাজধানীর মুগদা পাড়ায় বাসবাসকারী মুনিরুজ্জামান বলেন, জনগণ দিন বদলের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছিল বর্তমান সরকারকে। কিন্তু এ কেমন দিন বদল? প্রকাশ্যে একজন নিরীহ পথচারীকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করা হবে আর পুলিশ তা চেয়ে চেয়ে দেখবেএরই নাম কি দিন বদল? এসব উদাহরণ থেকে উপলব্ধি করা যায়, বর্তমান সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশ্রয় প্রদানে সক্ষম হলেও দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়নি। সরকারের এমন আচরণে আবারও প্রমাণিত হলো যে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হলেই সরকার গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যে পরমতসহিষ্ণুতা, আদর্শনিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা প্রয়োজন তা থেকে আমাদের রাজনীতি অঙ্গন এখনও অনেক দূরে। এমন অবস্থায় দেশের জনগণ আশাবাদী হবে কেমন করে? অথচ আমাদের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা সব সময় জনগণকে আশাবাদী হওয়ার আহবান জানান। কিন্তু জনগণ যে আশাবাদী হবে তার অনুকূলে তারা কতটা কাজ করছেন? এমন আত্মসমালোচনা তাদের মধ্যে থাকলে বিশ্বজিৎরা প্রকাশ্য রাজপথে পুলিশের সামনে এভাবে নিহত হতো না। আর পুলিশও হত্যাকারীদের মামলায় আসামী করতে কুণ্ঠিত হতো না। এমন অবস্থা কখনো একটি স্বাধীন জাতির কাম্য হতে পারে না।

খুলনার খালিশপুরের পলাশ বলেন, গণতান্ত্রিক শাসন, আইনের শাসন, জনগণের অধিকার এসব বিষয় বাংলাদেশে কথার কথা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে একদলীয় শাসন, সামরিক শাসন, বেসামরিক লেবাসে সামরিক শাসন ইত্যাদি পথ বেয়ে এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের অবসানের পর আশা করা হয়েছিল, যে দেশে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু প্রতিশ্রুত বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা রূপ নিয়েছে দ্বিদলীয় পাল্টাপাল্টির রাজনীতিতে। শাসকশ্রেণীর নিজেদের মধ্যকার বিরোধ জনগণের স্বার্থে নয়, ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা রক্ষা করার স্বার্থে কতটা হিংস্র ও উন্মত্ত হতে পারে তার নজির আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি, বিশেষত ২০০৬ সালের আগস্টসেপ্টেম্বর মাসে। এর আগে থেকেই দ্বিদলীয় পাল্টাপাল্টি ও সংঘাতের রাজনীতির অবসানের কথা নানাভাবে শোনা যাচ্ছিল। ওই বিশেষ পরিস্থিতিতেই বিদ্যমান শাসনপ্রশাসন টিকিয়ে রাখতে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল এবং দুই বছর ধরে রাজনীতির সংস্কার, শাসনপ্রশাসনের সংস্কার, দুর্নীতির অবসান ইত্যাদি কথা দেশবাসীকে শোনানো হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনে ‘মহা বিজয়’ নিয়ে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শাসনের শুরু। ইতোমধ্যে মহাজোটের ক্ষমতার পৌনে পাঁচ বছর পার হয়েছে। দ্রব্যমূল্য, সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, শ্রমিক নির্যাতন, দারোয়ান থেকে সর্বোচ্চ বিচারালয়ে দলীয়করণ, টেন্ডারবাজিদখলদারিত্ব, বিদ্যুৎ সংকট, জাতীয় সম্পদ গ্যাসকয়লা লুট, ভারতসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন।

দিনাজপুরের ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক নেতারা কেউ ক্ষমতার আসনে থাকেন, আবার কেউ ক্ষমতার বাইরে থাকেন। আজ যারা ক্ষমতার বাইরে কাল তারা ক্ষমতার আসনে বসবেন না এমনটি কেউ হলফ করে বলতে পারে না। সুতরাং পুলিশকে শ্রেয়বোধ ও শালীনতা বিসর্জন দিলে চলবে না। হতে পারে ক্ষমতাধরদের পক্ষ থেকে কেউ কেউ পুলিশকে অমার্জিত আচরণে উৎসাহিত করতে পারেন। কিন্তু তাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে দু’দিন পরে তারাও এ ধরনের অবাঞ্ছিত আচরণের শিকার হতে পারেন। ক্ষমতায় থাকাকালে আমরা নদীর নিয়মটি ভুলে যাই। নদীর একূল ভাঙে, ওকূল গড়ে এই তো নদীর খেলা। সুতরাং প্রকৃতি ও সময়ের এই নিয়মকে কারোরই অবজ্ঞা করা ঠিক নয়। বিগত ফখরুদ্দীনমইনুদ্দিনের অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে অত্যন্ত অশোভনভাবে টেনেহিঁচড়ে আদালতে হাজির করা হয়েছিল। টেলিভিশন ফুটেজে দেখা সেদিনকার এই দৃশ্য আমি আজও ভুলতে পারি না। সেদিন তার প্রতি যে অবজ্ঞা ও অসম্মান প্রদর্শন করা হয়েছিল তা কোনো সভ্য সমাজে অনুমোদনযোগ্য নয়। সেদিন অপর নেতা বেগম খালেদা জিয়া বিবৃতি দিয়ে এই অশোভন আচরণের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার এই শ্রেয়বোধ সেদিন বহুল প্রশংসিত হয়েছিল। আজ শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী। আর ফখরুদ্দীনমইনুদ্দিন সাহেবরা দেশ ছেড়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন। একেই বলে সময়ের ফের। এই সময়ের ফের সম্পর্কে কারোরই বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়।

কুমিল্লার আশিক জানান, রাজনীতি যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই উত্তাপে অন্য কেউ আরও দাহ্যবস্তু নিক্ষেপ করে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে ও জটিল করে তুলছে কিনা সেটাও রাজনীতিবিদদের গভীরভাবে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ ও বীক্ষণ করতে হবে এবং সময়োচিত রাষ্ট্রনায়কসুলভ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেবল তাহলেই অন্য কেউ রাজনীতিকদের মুখে কালি ছিটাতে পারবে না। এখানে মানুষের কোনো স্থান নেই। ঈদের পর কী হবে বলা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আলম চৌধুরী জানান, ঈদের পর রাজনীতি সহিংসতার দিকেই যাবে বলে মনে হচ্ছে। এ জন্য ব্যবসায় ভাটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আগের মতো পণ্য আমদানি করছে না। বলা তো যায় না কোন সময়ে কি হয়ে যায়। শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হলে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিএনপির উচিত দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক কার্যক্রম ঘোষণা করা। সরকারের উচিত নির্বাচন বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসা।

সিলেটের মিজান বলেন, কবে নির্বাচন হবে তা জানা যাচ্ছে না। নির্বাচন নিয়ে এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতি অতীতে কখনই দেখা যায়নি, কখনো ছিল না। সরকার বলছে, অক্টোবরে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দেবে। পুরো বিষয়টি স্পষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুত নয় জাতীয় নির্বাচনের জন্য। নইলে তারা কেন এ সময়ে আরপিওর সংশোধনী নিয়ে চিন্তা করছে। অযাচিতভাবে বিতর্ক তৈরি করছে। সরকারকে বোঝাতে হবে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য বদ্ধ পরিকর। কিন্তু তাদের কার্যক্রমে মনে হচ্ছে নীল নকশার নির্বাচনই তারা করতে চায়।।