Home » বিশেষ নিবন্ধ » ক্রসফায়ারের পুরনো গল্প – নিহত তারেক ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন

ক্রসফায়ারের পুরনো গল্প – নিহত তারেক ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

crossfireউদার গণতন্ত্র আর কল্যাণকর প্রযুক্তিই তো সবাইকে দেখালো রাজধানীতে ফিল্মী স্টাইলে খুন। অত্যাধুনিক ও দ্রুততর গণমাধ্যমও দেখালো সেই হত্যাকারীদের তাজা লাশ। ভাবখানা এমন যে, এই সমাজে অন্যায়ের জন্য নেই একটুও ছাড় -‘জিরো টলারেন্স!’ সব অপরাধীর জন্য ‘শাস্তি’ নিশ্চিত করতে আছে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমনির্মোহ সশস্ত্র ব্যবস্থা। কি শান্তির সময়! আরব দেশের কিসাসও অনেক জটিল প্রক্রিয়া। এদেশের ব্যবস্থা আরও দ্রুততর।

যুবলীগ নেতা মিল্কি হত্যাকাণ্ড দেখে আহাউহু করেনি কেউ। একদিন পর তারেক হত্যাকাণ্ড দেখেও একই প্রতিক্রিয়া। কয়েকজন শিক্ষিতবুদ্ধিজীবী কেবল বললেন, বিচার বহির্ভূত হয়ে গেল ব্যাপারটা। তাদের কথার আর মূল্য কি এই রাষ্ট্রে! ‘অন্যায়ের ছাড় নেই’ প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন সংসদ সদস্য রনিকে গ্রেফতারের পর। কাজেই খুনের বদলে ডবল খুন হলে ভুল নেই, দোষ নেই। এই রাষ্ট্র তো শুরু থেকেই এই নিয়মে চলছে। আগে রক্ষী বাহিনী মেরেছে, অন্য বাহিনী মেরেছে, পুলিশ মেরেছে এবং মারছে। এখন র‌্যাব মারছে। এবং দ্রুততার সঙ্গেই। না হলে যে তার নামের সুনাম থাকে না। ১৯৭৩৭৪ এর দিকে রক্ষী বাহিনী পিটিয়ে মারতো। পুলিশ বহুদিন হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন করে মেরেছে। কিছুদিন এনকাউন্টারও করেছে তারা। তবে র‌্যাব এক্ষেত্রে অনবদ্য ক্রসফায়ার হয়ে যায়, তারা আসামি নিয়ে বের হলেই। এমন যে ভয়ঙ্কর তাদের বেশভূষা তাতেও খতরনক সন্ত্রাসী দল নাকি ডরভয় পায় না তাদের উপর গুলি চালায়, আসামি ছিনিয়ে নিতে। আর তারাও চালায় গুলি। ফলে হয়ে যায় ক্রসফায়ারের গল্প।

কিন্তু মিল্কি হত্যা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মানুষের মুখে মুখে এসব প্রশ্ন ঘুরছে। এসব প্রশ্নের মধ্যে উত্তরও যে নেই তা কিন্তু নয়। সিসিটিভি ক্যামেরায় সুনির্দিষ্টভাবে দেখে তার পরেই তো গ্রেফতার করা হয়েছিল তারেককে। কিন্তু সামান্য পথ আনতেই তো হয়ে গেল সেই পুরনো নাটকের নতুন মঞ্চায়ন। তারেককে ওই হত্যার জন্য কে বা কারা নির্দেশ দিয়েছিল, আরও কারা ছিল এর নেপথ্যে কতো কিছু না বের হতে পারতো। কিন্তু অতিমাত্রায় ক্ষমতাশালীদের কারণে তা সম্ভব হয় না কখনো। কেঁচো খুড়তে সাপ যেন বের না হয় সে জন্যই ওই ক্রসফায়ারের ঘটনাটি ঘটেছে। এখন সেই নির্দেশদাতা বা দাতারা নিশ্চয়ই বক্তৃতাবিবৃতি দিয়ে দেশে আইনের শাসন, সুশাসন, গণতন্ত্র, মানুষের জীবন ও অধিকার এসব ছবক দিয়ে যাচ্ছেন। মিল্কি হত্যাকান্ডের পরে এখন নানা গল্প তৈরি হচ্ছে, আরো হবে সন্দেহ নেই। কারণ জজ মিয়া সৃষ্টির গল্পকাররা এখনো বেঁচে আছেন এটা হচ্ছে তার প্রমাণ। এখন মিল্কির বডি গার্ডের স্ত্রী দৃশ্যপটে এসেছে, আরো কতো কি যে হবে! কিন্তু তারেক জ্যান্ত থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো।

র‌্যাব নানা কল্পকাহিনী তৈরি করে তা প্রচার করে আসছে প্রতিটি ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রেও এর ব্যতয় হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। কারণ রাষ্ট্র যখন তার একটি প্রতিষ্ঠানকে হত্যার বৈধ অধিকার দেয় তখন কাগজেকলমে কিছু একটা বললেই তো চলে।

খুবই স্বল্প সময়ে ক্ষমতাসীনদের একজনকে হত্যা এবং তার স্বল্প সময়ের মধ্যেই সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের কথিত ক্রসফায়ারে র‌্যাবের সময় লাগলো না। কিন্তু ঠিক এর উল্টো কাজটিই হয় আমজনতার ক্ষেত্রে। একজন লিমনকে নিয়ে যে কতো ঘটনা ঘটলো, সেখানে র‌্যাবের ভূমিকাই বা কি ছিল, তা সবারই জানা। এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটছে অলক্ষ্যে কিংবা অধিকাংশের অগোচরে। রাষ্ট্র যখন নিজেই সন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, এর প্রতিষ্ঠান হিসেবে র‌্যাব কিংবা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী আলাদা ভূমিকা পালন করবে, এটা আশা করা যায় না, আশা করা উচিতও হবে না। সে দিন রক্ষী বাহিনী যা করেছিল আজও তাই ঘটবে।

সব সময়ই ওই বাহিনীগুলো এবং তার নির্দেশদানকারী সরকার বলে থাকে, সন্দেহভাজন আসামি মারা পড়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০১২ সালে ক্রসফায়ারের ঘটনা গুমের কারণে একটু কম হলেও তাও সংখ্যাটা ৪০এর উপরে। এ বছরের জুন পর্যন্ত অবশ্য সংখ্যাটি ছিল কমপক্ষে ৩০। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও। আর এতে লজ্জা পান না প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। ক্ষমতাসীনরাও সাফাই গেয়ে যান। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উদাহরণ দিতে গিয়ে বারবার তারা উচ্চারণ করেন, এসব হত্যার ঘটনাগুলো। বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সন্ত্রাসী নিধন করছে। কিন্তু আসলেই কি তাই? অসংখ্য সাধারণ মানুষ, নিরীহ মানুষ মারা পড়েছে এই তথাকথিত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার হত্যাকাণ্ডে।।