Home » প্রচ্ছদ কথা » ‘জনগণ বাস্তব পরিস্থিতিই বিবেচনা করবে, বিল বোর্ডের বক্তব্য নয়’

‘জনগণ বাস্তব পরিস্থিতিই বিবেচনা করবে, বিল বোর্ডের বক্তব্য নয়’

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, . আকবর আলি খান, . সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং ড. ইমতিয়াজ আহমদএর প্রতিক্রিয়া

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

bill boardআওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের কথিত নানা সাফল্য এবং উন্নয়নের বর্ণনা দিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিল বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। সারা ঢাকা ছেয়ে গেছে বিল বোর্ডের বিজ্ঞাপনে। এ নিয়ে জনগণের মধ্যে কৌতূহলের যেমন সৃষ্টি হয়েছে তার চেয়েও বেশি জন্ম নিয়েছে নানা প্রশ্নের। শুরু হয়েছে নানবিধ, নানামুখী আলোচনা। সরকারের মেয়াদকালের শেষ সময়ে এসে বিল বোর্ডের ছড়াছড়িতে বাস্তবে জনগণের মনের উপরে কোনো প্রভাব বিস্তার সম্ভব কিনা বা বিল বোর্ড স্থাপনে কোনো লাভ হবে কিনা? এই প্রশ্নে আমাদের বুধবারএর কাছে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চারজন বিশিষ্টজন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, . আকবর আলি খান, . সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং ড. ইমতিয়াজ আহমদ।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক

এমনিতেই বিল বোর্ড জিনিসটি খুব বিরক্তিকর। এ জন্য যে, বিল বোর্ড আমাদের আকাশকে মুছে ফেলে, পরিবেশকে ভারাক্রান্ত করে, চলাফেরার সুযোগ সীমিত করে এবং নানা অসুবিধা দেখা দেয়। সাধারণ বিল বোর্ডই বিরক্তিকর। এর মধ্যে ক্ষমতাসীনদের যে বিল বোর্ড তা তো খুবই বিরক্তিকর। এটা উল্টো ফল দেবে। কতো টাকা খরচ হচ্ছে, নিজেদের অর্জনগুলোকে তারা প্রকাশ করতে চাচ্ছে বিল বোর্ডের মাধ্যমে। অর্থাৎ এটা বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপন কিন্তু নানা সময়ে মানুষকে বিরক্ত করে। মানুষ কিন্তু দেখছে, যে প্রতিশ্রুতিগুলো তারা দিয়েছিল সেগুলো যে পালন করছে, এটা বিজ্ঞাপনে বোঝা যাবে না। বরং দেখা যাবে যে, মানুষের মনে যে সব প্রশ্নগুলো রয়েছে যেমন শেয়ারবাজারে মানুষ যে বসে পড়েছে, হলমার্কের কেলেঙ্কারি হয়েছে কতো শত কোটি টাকার, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি হয়েছে এবং যে কারণে তা বাতিল হয়ে গেল, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, টেন্ডারবাজি চলছে, এ নিয়ে খুনখারাবি হচ্ছে। তারা দেখছে মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে, যা আগে কখনই ঘটেনি। সাগররুনি নিহত হলো কিন্তু অপরাধীকে আর খুঁজেই পাওয়া গেল না। ইলিয়াস আলী রাজনীতির মানুষ, সে গুম হয়ে গেল, যা আগে কখনই ছিল না। গণধর্ষণ হচ্ছে, যা আগে কখনই ঘটেনি। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকরা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে ধর্ষণসহ এ রকমটা আগে কখনই ছিল না। মানুষের ওপরে এসব বিষয়গুলো খুব বড় বোঝা হয়ে চেপে আছে। এ জায়গাগুলোর সমাধান না করে উল্টো বিজ্ঞাপন দিলে মানুষ বিরক্ত হয়। এটা বিজ্ঞাপনদাতারা বোঝেননি। মানুষ প্রথমে এ নিয়ে হাসাহাসি করবে, পরে আরো বিরক্ত হবে। যতো দেখবে ততোই বিরক্ত হবে। ইতোমধ্যে এমনটা দেখাও যাচ্ছে। তাদের যে উদ্দেশ্য ভোট পাওয়া, সে ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে বিল বোর্ড কোনো ফল দেবে না। এই যে বললাম, বিল বোর্ডের উপরে সাধারণ মানুষের যে বিরক্তি তাতো থাকবেই। মানুষ মনে করবে এটা সরকারি টাকায় হচ্ছে, সে জন্য বিরক্তিটা আরো বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের বিজ্ঞাপন তো আছেই, এর উপরে রাজনৈতিক দলও যদি বিজ্ঞাপনদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়, মানুষের বিরক্তি নিশ্চয়ই বাড়বে। যে বিরক্তি ইতোমধ্যেই পুঞ্জিভূত হয়ে আছে সেটা আরো বাড়বে। এতে রাজনৈতিক দলের সুবিধা হবে না।।

. আকবর আলি খান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং বিশ্লেষক

বিল বোর্ড দিয়ে নির্বাচনে খুব একটা ভালো ফল হবে বলে আমার মনে হয় না। তার কারণ হচ্ছে, দেশের সিংহভাগ মানুষ লেখাপড়াই জানে না। কাজেই লেখাপড়া যারা জানে না তারা বিল বোর্ড পড়তে পারবে না। দ্বিতীয়ত. যারা লেখাপড়া জানে তারাও যে খুব আগ্রহ নিয়ে এটা পড়বে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর তৃতীয়ত. বিল বোর্ড কতোগুলো স্থানে স্থাপন করা হয়, সারাদেশে তো বিল বোর্ড দেয়া সম্ভব নয়। সুতরাং অল্প কিছু স্থানে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, সে পরিমাণ সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আর নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন দলের জন্য বিভিন্ন রকম হবে। বিরোধী দলের পক্ষে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পার পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সরকারি দলের জন্য প্রতিশ্রুতিই মানুষ শুধু শুনবে না, ক্ষমতাসীন দলের মূল্যায়ন করার জন্য সরকার কি কাজ করেছে এটা সম্পর্কে প্রত্যক ভোটারের আলাদা মূল্যায়ন আছে। সরকার যতোই অর্জনের কথা বলুক না কেন, সে অর্জনগুলো ভোটারদের কাজে লেগেছে কিনা, সেটা কিন্তু ভোটার ভালো ভাবেই জানে। কাজেই এ ধরনের প্রচারণা থেকে কতোটুকু লাভ হবে তা বলা মুশকিল। তবে ভারতের একটি অভিজ্ঞতা আমরা স্মরণ করতে পারি। ভারতের বিজেপি তার শাসনের শেষে ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’ নামে একটি শ্লোগান তুলেছিল। অর্থাৎ তাদের আমলে ভারত জ্বল জ্বল করছে, উন্নতিতে ও সাফল্যে। এরপরে নির্বাচনে কিন্তু তাদের ভরাডুবি হয়েছিল। কারণ ভোটাররা জানতো যে, ওটা শাইনিং ইন্ডিয়া ছিল না। সুতরাং ভোটারদের মন না জেনে, ভোটারদের কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করলে তারা তা খাবে না।।

. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

সরকার তাদের কার্যকলাপ প্রচারের জন্য বিল বোর্ড ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে এমনটা হওয়ায় বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া বিল বোর্ড দেয়ার কিছু নিয়মকানুন আছে। তারা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছে কিনা বা কারা প্রচার করছে তা উল্লেখ থাকতে হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে এটা আদৌ স্পষ্ট নয়। তবে মানুষ ঠিকই বুঝবে কারা এটা করেছে। এটি করা হয়েছে নির্বাচনে প্রভাব ফেলার জন্য। প্রশ্ন হলো, যে সব কথা ওই বিল বোর্ডে বলা হয়েছে, তা তো দৈনন্দিন বিষয়। এটা করা তো সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু হঠাৎ ফলাও করে এগুলো প্রচার একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার। যে সব কথা ওই সব বিল বোর্ডে বলা হয়েছে, বাস্তবে অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ে মানুষ কতোটা উপকৃত হয়েছে বা বাস্তবায়িত হয়েছে তাও একটি প্রশ্ন। বিল বোর্ডগুলোতে বরং কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যা বলা হচ্ছে আসলেই তা হয়েছে কিনা? মানুষ প্রশ্ন করবে, মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে কিনা, অর্থনৈতিক বৈষম্যে কি অবস্থায় আছে, দুর্নীতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন। এই ধরনের নানা বিষয় মানুষ বিবেচনা করবে। উন্নয়ন হয় এবং এর সুফল জনগণ পায় যখন দেশে স্থিতিশীল পরিস্থিতি, আইনের শাসন, সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হয় এবং দুর্নীতি কমে তখনই। কিন্তু বিরাট বিল বোর্ড দিয়ে প্রচারপ্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মন জয় কষ্টকর হবে বলে আমি মনে করি। মানুষ এখন যথেষ্ট সচেতন। আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে নির্বাচনের আগে সবার জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির পরিবেশ এর মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে মনে হয়, জনগণ যে অসংখ্য সমস্যা ও সঙ্কট মোকাবেলা করছে তা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেয়ার এটি একটি প্রচেষ্টা মাত্র। কিন্তু জনগণ বাস্তব পরিস্থিতিই বিবেচনার মধ্যে রাখবে।।

. ইমতিয়াজ আহমদ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দুটো বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। একটি হলো বাংলাদেশের জনগণ এমনিতেই রাজনীতির ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। তাকে শিক্ষিত করার মতো অবস্থা এখন আর নেই। আরেকটি বিষয় হলো, প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশ যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে এবং টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র, ফেইসবুক, টুইটারসহ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন উপায়ে জনগণ এখন খবরাখবর পাচ্ছে। সেখানে হঠাৎ করে বিল বোর্ডের মাধ্যমে এক ধরনের তথ্য পেয়ে মানুষ একেবারে শিক্ষিত হয়ে যাবে সেটা আশা করা ঠিক নয়। বরং যেটা হবে এই বিল বোর্ডকে নিয়ে তা হলো, এক ধরনের আয় বাণিজ্যের ব্যবস্থা হবে। সব সময়ই আমরা এটা দেখেছি, সে সমালোচনাই এবারও দেখা দেবে এবং বাড়বে। আমার মনে হয়, বিল বোর্ডের যে বক্তব্য তা যদি কাজের মাধ্যমে করা যায়, জনগণ আসলে তাই চায়। জনগণ যদি দেখে সন্ত্রাস কমছে, মিল্কির মতো শপিংমলে কেউ মারা যাচ্ছে না বা বিশ্বজিতের মতো ঘটনা ঘটছে না, পদ্মার সেতুর মতো ঘটনা বা শেয়ারমার্কেটের মতো ঘটনা ঘটছে না তাহলেই মানুষ সন্তুষ্ট হবে। তখনই মানুষ বুঝতে পারবে যারা শাসন ক্ষমতা হাতে নিয়েছেন তারা সচেতন এবং প্রকৃতার্থে চেষ্টা করছে। কিন্তু এভাবে বিল বোর্ড দিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা বদল করা যাবে বলে আমি মনে করি না। তবে এর প্রভাবে যেটা হতে পারে, যা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে অর্থাৎ এক ধরনের সমালোচনা কিন্তু শুরু হয়েছে। এটা আরো বাড়বে। যদি এমনটা হতো বিল বোর্ড দেয়ার একটা সংস্কৃতি বাংলাদেশে আছে বা বছর বছর এমনটা সরকার দিত তাহলে তা ভিন্ন বিষয় ছিল। কিন্তু একেবারে শেষ সময়ে এসে, বিশেষ করে পাঁচ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হারার পরে এই বিল বোর্ডকে মানুষ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখবে। আর যখন কৌশল হিসেবে দেখবে তখন ওই কৌশলটাই চোখে পড়বে, রাজনৈতিক বিষয়টি ততোটা পড়বে না। ওই কৌশলটি যথেষ্ট সমালোচিত হবে বলে আমি মনে করি।।