Home » অর্থনীতি » লাগামহীন দ্রব্যমূল্য – সরকারের কান নাই চক্ষু নাই

লাগামহীন দ্রব্যমূল্য – সরকারের কান নাই চক্ষু নাই

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

price hikeঈদ সামনে রেখে আরো এক দফায় বাড়ল দ্রব্যমূল্য। মসলা, পোলাওয়ের চালের দাম বেড়েছে বেশি। রমজানে বেড়ে যাওয়া পণ্যমূল্যও নিয়ন্ত্রণে আসেনি এখনো। এর মধ্যে আরেক দফায় দ্রব্যমূল্য বাড়ায় নাভিশ্বাস উঠেছে মানুষের। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসকদের কঠোর হতে বাণিজ্য মন্ত্রীর নির্দেশনা, প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপ, ব্যবসায়ীদের প্রতিশ্রুতি কোনোটিই শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি। বেড়েই চলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রতিরোধে গঠিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘দ্রব্যমূল্য মনিটরিং’ কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইএর সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন। মহাসড়কে চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে মারাত্মকভাবে। ১ জুলাই ও ১১ জুলাইয়ের দ্রব্যমূল্যের তুলনামূলক বিবরণে দেখা যায়, ১ জুলাই বেগুন, রসুন, আদা, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ইত্যাদির দাম ছিল কেজিপ্রতি যথাক্রমে ৩৫, ৫০, ৫৫, ৩৬ ও ৩০ টাকা। মাত্র ১০ দিন পর ১১ জুলাই ওই দ্রব্যগুলোর মূল্য দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮০, ৮৫, ৮৫, ৫৫ ও ২০০ টাকা। ১ জুলাই এক হালি লেবু এবং একমুঠো ধনেপাতার দাম ছিল যথাক্রমে ১০ ও ৪০ টাকা, যা ১১ জুলাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ ও ২১৫ টাকায়। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম এক সপ্তাহে বৃদ্ধির হার প্রায় ১৮৯ শতাংশ। চাল, মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, ইত্যাদির দামও অনেক বেড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় বাইরে চলে গেছে। কোনো কোনো নিত্যপণ্যের দাম তিনগুণ আবার কোনোটির দ্বিগুণ বেড়েছে, যা ক্রেতাদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে।

কাগজেকলমে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে এর কোন প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বরং চাল, ডাল আটা, মাছ, আদা, রসুনসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এমনকি এ সময় শীতের সবজির দাম নিম্নমুখী হওয়ার কথা থাকলেও তা বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকার বিভিন্ন সময় নানা পদক্ষেপ নেয়ার কথা বললেও বাজারে এর প্রায় কোনটিরই কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যায়নি। বরং যেসব পদক্ষেপ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, সরকার যেন সেসব পদক্ষেপ গ্রহণেই বেশি উৎসাহী! সব মহলের আপত্তি সত্ত্বেও সম্প্রতি ষষ্ঠবারের মতো বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এর অর্থ দ্রব্যমূল্যকে আরও উসকে দেয়া। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বেড়ে যায় পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়। স্বভাবতই বৃদ্ধি পায় পণ্যের দাম। শুধু খাদ্যদ্রব্য নয়, বাসভাড়া, বাড়িভাড়াসহ জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত। এমনকি বর্তমান সরকারের আমলে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে জীবন রক্ষাকারীসহ প্রায় সব ধরনের ওষুধের দাম। এর ফলে চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। কিন্তু সরকারের এদিকে ভ্রƒক্ষেপ নেই। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে প্রায় নির্বিকার থাকতেই দেখা গেছে। ফলে দুর্ভোগ বেড়েছে সাধারণ মানুষের। সরকারের কাছে জনস্বার্থ গুরুত্ব পেলে এমনটি ঘটত না। বস্তুত, বর্তমান সরকারের চার বছরে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। এ ব্যাপারে সরকারকে আন্তরিক বলেও মনে হয়নি। বাজারে অসৎ পন্থা অবলম্বন বা কারসাজি রোধে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশকেও (টিসিবি) সেভাবে কাজে লাগানো হয়নি। অথচ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এক নম্বর প্রতিশ্রতি ছিল, দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হবে। কিন্তু সরকারের কার্যকলাপে মনে হয়, তারা এ অঙ্গীকারের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন। ক্রমাগত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অত্যধিক।

পরিসংখ্যান মতে, গত এক বছরে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়েনি। বরং সদ্য বিদায় নেওয়া অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয় কমেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে বলেই কমে গেছে সঞ্চয়ের হার। অথচ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলছে। আয় বাড়েনি, কিন্তু বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। এর উপরে বাড়টি বিপদ রমজান মাসকে ব্যবসা করার মাস হিসেবে বেছে নেয়ায় সাধারণ মানুষের বাজার খরচ বেড়ে গেছে অনেক অনেক বেশি। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবেই এক বছরে দাম বেড়েছে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আটাসহ ৩০টি পণ্যের। এক বছরে মসুর ডালের দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর মধ্যে বড় দানা (তুরস্ক) ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। মাঝারি দানা ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। নেপালি ডালের দাম বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। দেশী রসুনের দাম বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। শুকনা মরিচের দাম বেড়েছে ১০ শতাংশ। হলুদের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আদার দাম বেড়েছে ৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। আবার কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাব মতে, গত এক বছরে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে গড়ে ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ। যার মধ্যে চালে বেড়েছে ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ডালে বেড়েছে ১১ দশমিক ৬৯ ভাগ। পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের দাম বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৮৭ ভাগ। গরুর দুধে বেড়েছে ৯ দশমিক ৩১ ভাগ।

রমজানের মাসখানেক আগেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার তদারকির জন্য ১৪টি টিম গঠন করে। কিন্তু এসব তদারক টিম মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। খুচরা বাজারে বেড়েছে ডিমের দামও। ফার্মের মুরগির ডিম তিন টাকা বেড়ে ৩৫ টাকা, দেশি হাঁস তিন টাকা বেড়ে ৩৮ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। দেশী মুরগি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা দরে। লেয়ার মুরগি ১৫৫ টাকা, ১ কেজি ওজনের প্রতিটি দেশী মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। গরুর মাংস কেজিপ্রতি ২৮০ টাকা ও খাসির মাংস কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়। মাছের বাজারে বেড়েছে ইলিশসহ সব ধরনের মাছের দাম। শান্তিনগর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের হালি ৪০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকায়।

বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে ১৩৫ টাকা থেকে ১৩৮ টাকা দরে। আর ৫ লিটার ওজনের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৬৫০ থেকে ৬৬৫ টাকা দরে। আর খোলা সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে। তবে প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে ১০৯ থেকে ১১০ টাকা। খোলা পামওয়েল প্রতি লিটার বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা দরে। এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খেজুর, ছোলা ও মসুর ডালের খুচরা ও পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, প্রতি কেজি ইরাকি জাহেদি খেজুর পাইকারি বাজারে সর্বোচ্চ ৭২ থেকে ৭৫ টাকা ও খুচরা পর্যায়ে ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হবে। প্রতি কেজি অস্ট্রেলিয়ান ছোলার সর্বোচ্চ পাইকারি দর ৫২ থেকে ৫৪ টাকা ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৬২ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া কানাডার মসুর ডাল প্রকারভেদে সর্বোচ্চ পাইকারি মূল্য ৭২ থেকে ৭৫ টাকা ও খুচরা মূল্য ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত বাণিজ্য সচিব এটিএম মর্তুজা রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সোমবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে খেজুর, ছোলা ও মসুর ডালের আমদানি, মজুত ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে এসব পণ্যের খুচরা ও পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এর আগে ৩০ জুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে দেয়। এর মধ্যে প্রতি কেজি চিনির দাম মিলগেটে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪১ টাকা, পাইকারি পর্যায়ে সাড়ে ৪২ টাকা ও খুচরা বাজারে সাড়ে ৪৫ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। প্রতি লিটার পামঅয়েলের সর্বোচ্চ দর মিলগেটে ৬৯ টাকা, পাইকারি বাজারে ৭০ টাকা ও খুচরা পর্যায়ে ৭৩ থেকে ৭৫ টাকায় বেঁধে দেয়া হয়। এ ছাড়া খোলা (লুজ) সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ দাম মিলগেটে ১০১ টাকা, পাইকারি পর্যায়ে ১০২ টাকা ও খুচরা বাজারে ১০৫ থেকে ১০৮ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। আর বোতল জাত সয়াবিন তেল এক লিটার ১২৭ টাকা এবং পাঁচ লিটারে যে দাম আছে তা থেকে ২৫ টাকা কমে নির্ধারণ করা হয়।

যথাযথ উদ্যোগ নেয়ায় বর্তমান সরকারের সাড়ে চার বছরে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি। মাঝে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের কথা বলা হলেও তা করা হয়নি। সর্বোপরি আইন করেও যে এটি স্থিতিশীল রাখা যাবে, তার নিশ্চয়তা মিলছে না। ভেজাল খাদ্য উৎপাদন বন্ধ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে আইন প্রণয়ন করা হলেও প্রয়োগের অভাবে সেখান থেকে মানুষ কোনো সুবিধাই পাচ্ছে না।।