Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ষাট দশকের বাংলা চলচ্চিত্র – (শেষ পর্ব)

ষাট দশকের বাংলা চলচ্চিত্র – (শেষ পর্ব)

ফ্লোরা সরকার

movie-of-60sফরাসি কবি,সাহিত্যিক এবং সমালোচক সাঁৎ বভ্ (১৮০৪১৮৬৯) ক্লাসিক সাহিত্যের অসাধারণ একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন – “ক্লাসিক লেখক হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি মানুষের আত্মাকে সমৃদ্ধ করেছেন। যিনি মানবতাকে উপহার দিয়েছেন নতুন দৃপ্ত পদক্ষেপ, দিয়েছেন দ্বিধাহীন নৈতিক সত্যের নিশ্চিত সন্ধান, যিনি তার চিন্তাধারাকে, তার জীবনবোধকে, তার আবিষ্কৃত সত্যকে তুলে ধরেছেন ব্যাপ্ত উদারতায়। প্রতিটি যুগের মানুষের কাছেই তিনি সমকালীন এবং সমাদৃত”। শুধু তাই না ক্লাসিকের ধারণার সঙ্গে মানুষের রুচিবোধের অবশ্যম্ভাবী সম্পর্কের উপরেও তিনি জোর দিয়েছেন এবং রুচির মানদণ্ডকে নতুন করে যুগে যুগে প্রতিষ্ঠার কথাও ব্যক্ত করেছেন। তার মতে যে সমাজে স্থিরতা নেই, মূল্যোবোধ ও রুচিবোধ স্বাভাবিকভাবেই সেখানে অস্থির নৈরাজ্যের শিকার। ষাট দশকের যেসব চলচ্চিত্র নিয়ে গত পর্বগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে সেসব ছবির সবগুলো ক্লাসিক পর্যায়ের না হলেও নিদেন পক্ষে ছিলো রুচিসম্মত। এসব ছবির নির্মাণ নিখুঁত না হলেও, চাকচিক্যময় না হলেও কোন না কোন বার্তা দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। যেসব বার্তা যুগিয়েছে চিন্তার খোরাক। অন্তরবাহির করেছে সমৃদ্ধ। করেছে সচেতন। সহায়তা করেছে নিজেদের জানতে, বুঝতে, চিনতে এবং উপলব্ধি করতে। স্মরণ রাখা প্রয়োজন পঞ্চাশ থেকে ষাট দশক এদেশের বাঙালি মুসলমানদের জন্যে এমন একটি যুগসন্ধিক্ষণ যে সন্ধিক্ষণে তারা একটু একটু করে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিক্ষার আলোয় নিজেদের আলোকিত করার চেষ্টা করে চলেছে। নিজেদের অধিকারস্বাধিকার বুঝে নেয়ার চেষ্টা করছে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় এমনকি কলকাতা ও পাকিস্তানের তুলনায় (কলকাতার প্রথম সবাক ছবি ‘ দেনাপাওনা’ নির্মিত হয় ১৯৩১ সালে এবং পাকিস্তানের (তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তান) প্রথম ছবি ‘তেরি ইয়াদ’ নির্মিত হয় ১৯৪৮ সালে) পিছিয়ে থাকলেও, এদেশের বাংলা ছবির পত্তনের সময়কাল অর্থাৎ ১৯৫৬ সালের ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে ক্রমাগত সম্মুখে ধেয়ে চলেছিলো। ষাটের দশকের প্রারম্ভেই শুরু হয়েছিলো নির্মাণের সেই বিপুল স্রোতধারা।

এই দশকে আমরা মোটামুটি ভাবে পাঁচ ধরণের চলচ্চিত্রের বিকাশ ঘটতে দেখি . মূল ধারা থেকে কিছুটা ভিন্ন ধারার ( অবশ্যই তথাকথিক বিকল্প ধারা নয়) ছবি, যেমন নদী ও নারী, জাগো হুয়া সাভেরা, আকাশ আর মাটি, আসিয়া, কাঁচের দেয়াল ইত্যাদি। যেসব ছবির আবেদন আজও ফুরিয়ে যায়নি। বিশেষত জাগো হুয়া সাভেরা ছবিটিকে ক্লাসিক পর্যায়ের ছবি বললেও অত্যুক্তি হবে না। ২. লোকগাঁথা ভিত্তিক ছবি। যেমন রূপবান, ভাওয়াল সন্যাসি, বেহুলা,ভানুমতি, মলুয়া, মহুয়া, গাজীকালু চম্পাবতী, আলিবাবা ইত্যাদি। যেসব ছবি এদেশের মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের কাছে অসামান্য আবেদন রেখেছিল। ৩. রূপকাহিনী ভিত্তিক ছবিগুলোও একই শ্রেণীর কাছে একই রকমের আবেদন রেখেছিলো। যেমন কাঞ্চনমালা, সুয়োরানীদুয়োরানী, পাতাল পুরীর রাজকন্যা,অরুণ বরুণ কিরণমালা, আলোমতি ইত্যাদি। ৪. সামাজিক ধারার ছবি। যেমন সুর্যস্নান, দুই দিগন্ত, ধারাপাত, সুতরাং, নীল আকাশের নীচে ইত্যাদি। যেসব ছবি সমাজের বাস্তব প্রতিফলনেরই ছায়া ফেলেছিলো। ৫. ইতিহাস ভিত্তিক চলচ্চিত্র। ইতিহাস ভিত্তিক চলচ্চিত্রের সংখ্যা মাত্র দুটো হলেও (সিরাজউদ্দৌলা এবং শহীদ তীতুমীর) ‘ সিরাজউদ্দৌলা’ একাই অনেক চাহিদা পূরণ করেছিলো। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে ‘সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিটি এমন এক সময়ে নির্মিত (১৯৬৭) যখন ১৯৬৯ এর গণঅভূত্থান আসন্ন প্রায়। ‘সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিটি তাই প্রভুত পরিমাণে প্রেরণা যুগিয়েছে সেই অভূত্থানে। তবে একটি প্রয়োজনীয় ধারার ছবি আমরা সেই সময়ে পাইনা। তা হলো রাজনৈতিক ধারার ছবি। যে ধারার সূচনা পরবর্তীতে ১৯৭০ এর দিকে জহির রায়হানের হাত ধরে ‘জীবন থেকে নেয়া’ দ্বারা সূচীত হয়। যাইহোক, ষাট দশকের বিভিন্ন ধারার ছবি নিয়ে ইতিমধ্যে গত পর্বগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আমরা দেখেছি সেই সময়ে শুধু নির্মাতারাই নন ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল কলাকুশলীর সততার আত্মনিবেদন। দর্শক ছিলো হলমুখী। সততার যতেœ লালিত সেই সাদাকালো ছবিগুলো আজও তাই রঙিন। এবার স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের রঙিন চিত্রটি কেমন দাঁড়ালো তা দেখা যাক।

১৯৭১ এর পর আমাদের চলচ্চিত্রে প্রথম যে আঘাতটি আসে তা হলো মারপিট বা মারদাঙ্গা ছবি। যার সূত্রপাত ঘটেছিলো “রংবাজ” (১৯৭৩) ছবির হাত ধরে। তার আগের বছর অর্থাৎ ১৯৭২ এ বেশকিছু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র যেমন জয়বাংলা, ওরা এগার জন, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী এবং রক্তাক্ত বাংলা নির্মিত হয়। যার কোনটিকেই যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র বলা যায় না। কেননা যুদ্ধভিত্তিক ছবির যে ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পটভূমির প্রয়োজন, তার কোনটিই এসব ছবিতে আমরা পাইনা। মারদাঙ্গা ছবির পাশাপাশি শুরু হলো গল্প চুরির অবাধ স্বাধীনতা। ভারতীয় হিন্দী ছবির অনুকরণে নির্মিত হতে থাকলো একের পর এক ছবি। অনুকরণ প্রথা ষাটের দশকেও যে ছিলোনা তা নয়। তবে সেই অনুকরণ ছিলো শুধু ছবির নায়কনায়িকা এবং স্বল্প পরিমাণে সংলাপ কেন্দ্রিক। যেমন নায়ক রাজ্জাক, রহমানকে দেখা যেতো উত্তম কুমারের অনুকরণে চুলের বিন্যাস করতে। সুচীত্রা সেনের সাজসজ্জার অনুকরণে আমাদের নায়িকাদের সাজ। যা ছিলো শুধুই বহিরঙ্গের অনুকরণ। অভিনয়ের মঞ্চে যে যার বৈশিষ্ট আর ব্যক্তিত্ব বজায় রেখেছেন। কিছু কিছু ছবিতে কোলকাতা কেন্দ্রিক ছবির সংলাপের অনুকরণে সংলাপ উচ্চারিত হলেও তা ছিলো নিতান্তই নগণ্য। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর শুরু হলো শুধু অনুকরণ নয বরং অনুররণ। রঙিন ছবির আলোচনার পূর্বে এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত ‘মালা’ এবং ‘সঙ্গম’ ছবি দুটি যথক্রমে এদেশের প্রথম রঙিন সিনেমাস্কোপ এবং পূর্ণ রঙিন সিনেমা। এই দুটি ছাড়া সেই সময়ে আর কোন রঙিন ছবি আমরা দেখিনা। স্বাধীনতা উত্তর কালে ১৯৭৮ এর পর রঙিন পর্দা চলচ্চিত্রে প্রথম দৃষ্টিগোচর হতে লাগলো। তবে পূর্ণাঙ্গ রঙিন নয়, আংশিক। শুধু গান বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছবির দৃশ্য রঙিন দেখা যায়। ১৯৮০ সালে পূর্ণাঙ্গ রঙিন ছবি আমরা দেখি আজমল হুদা মিঠু পরিচালিত “দোস্তী” তে। মজার বিষয় হলো এই সময় থেকে অর্থাৎ ১৯৮০ থেকে শুধু গল্প নয় ‘ফ্রেম টু ফ্রেম’ চৌর্যবৃত্তির হিড়িক পড়ে গেলো। ১৯৯০ এ যার মাত্রা ছিলো সর্বোচ্চে। মুম্বাই থেকে সম্পূর্ণ ছবিটি কপি করে পেস্ট শুরু হলো। ২০০০ সালের পর তারও প্রয়োজন পড়লো না। ইন্টানেটের কল্যাণে ঘরে বসেই কপিপেস্টের কাজ সম্পন্ন হতে থাকলো। তখন শুধু একটি ছবি নয় দুই তিনটি ছবির গল্প জোড়া দিয়ে বিনা পরিশ্রমে, নিবীর্য কল্পনার শ্রমে একের পর এক ছবি নির্মিত হতে থাকলো।

রংবাজ” দিয়ে যে মারদাঙ্গা ছবির সূত্রপাত ঘটেছিলো পরবর্তীতে অর্থাৎ নবক্ষই পরবর্তী সময়ে তা ভায়োলেন্সে রূপ নিলো। ভায়োলেন্স শুধু কাহিনীতে নয়, অভিনয়ে, চিত্রগ্রহনে, সম্পাদনায়, দৃশ্য সজ্জায় সবকিছুতে যেন ‘আধিভৌতিক’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে থাকলো। ‘আধিভৌতিক’ অর্থাৎ যা বাস্তবে কখনো দেখা যায় না, এমনকি কোন সুস্থ মস্তিস্কের কল্পনাতেও না। এসব প্রবর্তনের প্রধান কারণ ‘গ্ল্যামার’ বা “চাকচিক্যময়তা”। আশি পরবর্তী রঙিন পর্দা গ্ল্যামারকে যত বেশি আবশ্যক করে তুলতে লাগলো, ছবির কাহিনী, সংলাপ, অভিনয় এক কথায় আঙ্গিক ও শৈলী ততোধিক অনাবশ্যক হয়ে পড়লো। অন্যদিকে এই সময়ের যান্ত্রিক কলাকৌশলের উন্নয়ন অর্থাৎ অত্যাধুনিক টেকনিক গ্ল্যামারকে আরো গ্ল্যামারাস করে তুলতে লাগলো। দর্শকও পর্দায় রঙের ছড়াছড়ি আর টেকনিক দেখে শুধু রঙ আর টেকনিকেই অভ্যস্ত হয়ে পরলো। কিন্তু মজার বিষয় হলো এত আয়োজনের পরেও চলচ্চিত্রের সংখ্যা ক্রমশ নিম্নাভিমূখীর দিকে চলে গেলো। স্বাধীনতা উত্তর চলচ্চিত্রের মূল সমস্যর সূত্রপাত এখান থেকেই শুরু হলো।

একাত্তর এবং আশির দশকে হলের সংখ্যা প্রায় ১১০০ তে উন্নীত হয়, কিন্তু ২০০০ সালের পর তা ৬০০ তে নেমে আসে। চলচ্চিত্র শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজারের বিবেচনায় সিনেমা হলের পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হলের সংখ্যাবৃদ্ধির অর্থ অভ্যন্তরীণ বাজারের সম্প্রসারণ, বাজারের সম্প্রসারণ অর্থ সিনেমার সংখ্যারও সম্প্রসারণ এবং বিপরীত দিকে হলের সংখ্যা হ্রাস অর্থ সবকিছুর হ্রাস। ভারতীয় ছবি তার অভ্যন্তরীণ বাজার ছাড়িয়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের বাজারের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছে। জার্মানি এবং লন্ডনের হলে এখন প্রতি সপ্তাহে একটি করে ভারতীয় ছবি মুক্তি পায়। অর্থনীতির গণিতে বাণিজ্য পুঁজি যদি উৎপাদিত পুঁজিতে রূপান্তরিত হতে না পারে পুঁজি বাজার তখন সংকুচিত হতে বাধ্য। আমাদের চলচিচত্র শিল্পের সূচনালগ্ন থেকে প্রধানত নির্মাতারাই ছবির নির্মাণ ব্যয় বহন করতেন। নিজ ব্যয়ের লগ্নিকৃত পণ্য মানসম্মত হতে বাধ্য এবং তাই হয়েছিলো সেই সময়ে। স্বাধীনতা উত্তর লগ্নে এখানকার উঠতি ফটকা ব্যবসায়ী এবং কালোবাজারির কালো টাকার লগ্নিকৃত ছবির ক্ষেত্রে দেখা গেলো তারা উৎপাদন ছেড়ে শুধু মুনাফার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে অশ্লীল যৌনতা, হিংস্রতা, অবাস্তবতা, মারামারি এবং অনুলিপি সম্বলিত ছবি দিয়ে দর্শক মন জয় করার এক প্রাণান্তকর চেষ্টা তারা চালিয়ে গেছেন। অর্থনীতির সংজ্ঞানুযায়ী কোন কিছু উৎপাদনের অর্থ অধিকতর উপযোগ সৃষ্টি। চলচ্চিত্র শিল্পে এই অধিকতর উপযোগ সৃষ্টির প্রধান পথটি হলো সুস্থ রুচিবোধ এবং জীবনবোধ সম্পন্ন বাস্তব এবং নান্দনিক ছবির উপস্থাপন। দর্শকরুচি একদিনে সৃষ্টি হয় না। তাকে যতেœর সঙ্গে ধারণ এবং লালনপালনের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী বিশেষত নবক্ষই পরবর্তীর অনুকরণ এবং অনুররণের একই রিলের ছবির পুনরাবৃত্তি একজন অতি নিম্নরুচিবোধসম্পন্ন দর্শকের রুচীতেও অরুচী ধরিয়ে দিলো। অর্ধ শিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত এসব দর্শককে বোকা মনে করার কোন কারণ নেই। এই একই দর্শক ১৯৬৫ সালে ‘রূপবান’ ছবির হিরক জয়ন্তী পার করেছিলেন। ছবিটি প্রসঙ্গে চলচ্চিত্রকার হারুনর রশীদ বলেন “ ছবি মুক্তির পর মফস্বলের হলগুলোতে ঘটেছিল নানা ঘটনা। নৌকায় কিংবা গরুর গাড়িতে গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা ছুটেছিল কাছাকাছি শহরের সিনেমা হলে ‘রূপবান’ দেখবার আশায়। কিন্তু টিকেট মেলা তো সহজ নয়। পরিবার পরিজন নিয়ে অনেককে নৌকায় কিংবা গরুর গাড়িতেই দিনরাত অপেক্ষা করে থাকতে হয়েছে। এই অপেক্ষার সময় ঘটেছে কত ঘটনা। কোথায় যেন গর্ভবতী এক গৃহবধূকে গরুর গাড়িতেই সন্তান প্রসব করতে হয়েছিল ।” কী অবিশ্বাস্য ! বাস্তব কাহিনী যেন সিনেমার কাহিনীকেই হার মানায়। এবং এই হার সম্ভব হয়েছিলো উল্লেখিত অধিকতর উপযোগ সৃষ্টির তত্ত্বের কারণে। কাজেই চলচ্চিত্র যখন উৎপাদিত না হয়ে অনুকরণ আর অনুররণ হতে থাকে তখন সেই শিল্পের উৎপাটন অবসম্ভাবী হয়ে পড়ে। বাণিজ্য পুঁজিকে উৎপাদিত পুঁজিতে রূপান্তরের স্বপ্ন থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে স্বাধীনতা উত্তর সব ছবিই কি অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়েছিল ? আমরা কি উঁচুমানের, জীবনবোধ সম্পন্ন কোন চলচ্চিত্র নির্মিত হতে দেখিনি ? অবশ্যই দেখেছি। স্বাধীনতা উত্তর কালে আমরা যেমন ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘লাঠিয়াল’ ‘মেঘের অনেক রং’ ‘বসুন্ধরা’ ‘ডুমুরের ফুল’ এর মতো জনপ্রিয় ছবি দেখেছি তেমনি দেখেছি ‘ ধীরে বহে মেঘনা’ ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘সুপ্রভাত’ ‘ ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’র মতো বুদ্ধিদীপ্ত, জীবনবোধ সম্পন্ন ছবি। আমরা পাই ষাটের দশকের খান আতাউর রহমান, সুভাষ দত্ত সহ স্বাধীনতা পরবর্তীর আলমগীর কবীর, কবীর আনোয়ার, শেখ নেয়ামত আলী, মসিহউদ্দীন শাকেরের মতো আরো বেশকয়েজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার। কিন্তু গোবরে পদ্মফুলের মতো স্বাধীনতা উত্তর এসব জীবনবোধ সম্পন্ন চলচ্চিত্র এবং সৎ ও অকৃত্রিম নির্মাতারা রঙিন পর্দার ঝলসানো কৃত্রিম আলোতে নিজেদের খুব বেশি আলোকিত করতে পারেননি। অর্থনীতিবীদ গ্রেসামের বিধির মতো পুরোনো নোট যেভাবে বাজার থেকে নতুন নোটকে বিতাড়িত করে ঠিক তেমনি ভাবে হাতে গোনা এসব ছবি এবং নির্মাতারা ক্রমশ রঙিন পর্দার আড়ালে চলে যেতে থাকলেন এবং তার স্থান দখল হতে থাকলো পুরোনো জীর্ণ নোটযুক্ত অনুৎপাদনশীল চলচ্চিত্র এবং চলচ্চিত্রকারদের দ্বারা। স্বাভাবিক নিয়মে তাই দর্শকও হল ত্যাগে উদ্যত হলেন। হলের সংখ্যাও হলো সংকুচিত।

নতুন শতাব্দির প্রারম্ভে অর্থাৎ ২০০০ সালের শুরুর দিকে বেশকিছু তরুণ পরিচালকের আগমন ঘটে। যারা মূল ধারার পাশাপাশি ভিন্ন ধরণের চলচ্চিত্র নির্মাণে নিজেদের নিয়োজিত করলেন। যেমন মোর্শেদুল ইসলাম, তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল, আবু সাঈদ, মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী সহ বেশ কয়েজন। নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে এসব নতুন এবং তরুণ নির্মাতাদের ভেতর সম্ভাবনা থাকলেও একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, সবাই না হলেও এদের মাঝে একদল নির্মাতা বিশেষ একটি নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে তাদের ছবি কেন্দ্রিভুত রেখেছেন। ফলে তাদের নির্মিত ছবির বিষয়বস্তুর বৈচিত্র একদিকে যেমন লোপ পেলো অন্যদিকে হারিয়ে গেলো তাদের ভেতরে থাকা সুপ্ত সম্ভাবনাগুলো। অপর দল ছবির সংলাপ নিয়ে এতোটাই ব্যতিব্যস্ত যে কলকাতাকেন্দ্রিক সংলাপের উৎপাটন ঘটাতে যেয়ে নিজের মাতৃভাষা বাংলার উপর উৎপীড়ন শুরু করলেন। শেষোক্ত দলের ছবিতে না থাকলো কোন গল্প, না কোন নান্দনিকতা, পড়ে রইলো শুধু বাংলা ভাষার অপব্যবহার। যে ভাষা ইতিমধ্যে টিভি নাটক থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন চিত্র সহ গোটা নতুন প্রজন্মের ভাষাকে কলুষিত করে ফেলেছে। রাশিয়ার মহান চিত্রনির্মাতা তারকোভস্কি তার ডায়রিতে স্পেনের কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং দার্শনিক জর্জ সান্তায়ানার (১৮৬৩১৯৫২) একটি চমৎকার উক্তি তুলে ধরেছেন – “একজন মানুষের আত্মাই যদি মুক্ত না হয়, তাহলে সারা পৃথিবীর স্বাধীনতায় তার কীই বা এসে যায় ?” ষাটের দশকের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আলোয় আলোকিত সেই নব্য শিক্ষিত নির্মাতাদের মাঝে আমরা কোন সংকীর্ণতা দেখিনা। তাদের মাঝে একটা লক্ষ্যই সেদিন কাজ করেছিলো কীভাবে চলচ্চিত্র নামক শিল্পকে মনন, মেধা আর অনুশীলন দিয়ে উন্নততর করা যায়। সেই সময়ে তারা পরাধীন হলেও তাদের আত্মা ছিলো মুক্তো। আজ আমরা স্বাধীন হয়েও আমাদের আত্মা সংকুচিত। ষাটের নির্মাতারা অনুকরণ নয় বরং প্রভাবিত হতেন। এফ.ডি.সি.’র সহযোগিতায় এদেশের প্রথম ছবি “আসিয়া” (১৯৬০,পরিচালক ফাতেহ লোহানী) নির্মিত হয়েছিলো সত্যজিৎ রায়ের “পথের পাঁচালী”র প্রভাবে। এই প্রসঙ্গে ফরাসি সাহিত্যিক অঁদ্রে জিদের উক্তি স্মরণযোগ্য – “ —তাছাড়া প্রভাবকে যারা ভয় পান, প্রভাবকে গ্রহণ করতে যাদের আপত্তি, পরিণামে দেখা যায় এক অভিনব শাস্তি পান তারাই। কারণ ব্যর্থ অনুকরণের দুর্ভাগ্য এদের হাতেই ঘটে। অন্যের শিল্পকর্মকে তারা গভীরভাবে আত্মসাৎ করেন না। তারা শিল্প বা সাহিত্যকর্মের বহিরাবরণটাকেই শুধু দেখেন তার বেশি দেখতে গেলেই সীমিত মনের শঙ্কা আঙুল উচিয়ে শাসায় তাদের গভীর প্রভাব আহরণের প্রত্যাশায় উন্মুখ শুধুমাত্র জাতশিল্পীরাই কোন বিশেষ সৃষ্টিকে বিস্মৃত হবার চেষ্টা করেই তার গভীরে প্রবেশ করেন, তার মাঝে তন্ময় হন”। জিদের মতে প্রভাব কোন কিছু সৃষ্টি করেনা, তা শুধু আত্মাকে জাগ্রত করে। আত্মার এই জাগরণ প্রভাবের পাশাপাশি প্রেরণার মাধ্যমেও ঘটে থাকে। যে প্রেরণা উদ্বুদ্ধ করে ক্লাসিক শিল্প নির্মাণে। আর প্রেরণা হচ্ছে অভিনেতা ও মঞ্চ পরিচালক উৎপল দত্তের ভাষায় সেই নিবিড় নিভৃত অনুভূতি, প্রথম প্রেমের উন্মোচনের মতো, বারোয়ারি মন্ডপের বস্তুর মতো যা নয়। পৃথিবীর সব মহান শিল্পকর্মের সৃষ্টি লগ্নের সময়কালটা তাই থাকে নিবিড় আর নিভৃত। ষাটের দশকের চলচ্চিত্রের ঊষালগ্ন বর্তমানের মতো বারোয়ারি মন্ডপের মতো ছিলো না বলেই একাধারে আমরা যেমন মননশীল, মেধাবী এবং নান্দনিক নির্মাতা আর কুশীলবদের পেয়েছিলাম, আমরা আশা করবো বর্তমানের সব ভুল ভ্রান্তি সংশোধন পূর্বক ভবিষ্যতে তার চাইতেও মহৎ নির্মাতা আর কুশীলবদের আগমন ঘটবে, যাদের সৃষ্টিশীলতাকে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ক্লাসিক বলে গর্ব অনুভব করতে পারবেন।।

 

তথ্য সূত্র:

. ষাট দশকের উল্লেখিত চলচ্চিত্র সমূহ।

. বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস অনুপম হায়াৎ।

. চলচ্চিত্রকার সালাউদ্দীন হারুনর রশিদ।

. প্রবন্ধ ‘ক্লাসিক কি ?’ – সাঁৎ বভ।

. তারকোভস্কির ডায়রী।

. প্রবন্ধ ‘সাহিত্যে প্রভাব’ অঁদ্রে জিদ।

.উৎপল দত্তের গদ্যসংগ্রহ , নাট্যচিন্তা।

.চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমান (সাক্ষাৎকার )

.চলচ্চিত্র পরিচালক ও সাংবাদিক সাদেক খান (সাক্ষাৎকার)

১০. চলচ্চিত্র সমালোচক ও লেখক অনুপম হায়াৎ (সাক্ষাৎকার)