Home » আন্তর্জাতিক » ইরোম শর্মিলা – নিঃসঙ্গ যোদ্ধা

ইরোম শর্মিলা – নিঃসঙ্গ যোদ্ধা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

irom sharmilaতাকে হয়তো জরাগ্রস্ত আর দুর্বল দেখাচ্ছে, কিন্তু তিনি ভারতের মণিপুরের নৃশংস আমর্ড ফোর্সেস (স্পেশাল পাওয়ার্স) অ্যাক্ট (এএফএসপিএ)-এর সন্ত্রাস বন্ধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার নাম ইরোম শর্মিলা। মনিপুরের এই লৌহমানবী এএফএসপিএ বাতিলের দাবিতে ১২ বছর ধরে অনশন ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন।

বর্তমানে তিনি অবস্থান করছেন ভারতের জাতীয় রাজধানী নয়া দিল্লিতে। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে অনশনের মাধ্যমে আত্মহত্যা চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নিজের অবস্থান ঘোষণা করে ইরোম বলেন, ‘আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করিনি। আমি নিজস্ব পন্থায় প্রতিবাদ করছিলাম। আমি অহিংস পন্থায় প্রতিবাদ করছিলাম।’ তিনি আরো বলেন, ‘মনিপুরে এএফএসপিএ’র কারণে সহিংসতা হয়ে পড়েছে প্রশাসনের একটি হাতিয়ার। ভারত সরকারকে অবশ্যই এটা বাতিল করতে হবে।’ ফ্যাকাশে দেখতে এই নারী এএফএসপিএ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত অনশন অব্যাহত রাখতে অনমনীয়। সম্প্রতি নয়া দিল্লি পৌঁছে ইরোম বলেন, ‘আমরা যদি লড়াই অব্যাহত রাখি, তবে আইনটি বাতিল হবে। আমাদের কথা শোনা হবে।’

মনিপুরের স্বার্থ রক্ষা এবং এর দুদর্শা অবসানে ইরোম নিঃসঙ্গ যোদ্ধা। রাজ্যটিতে হানাহানি, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাবে এমন জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা অল্প কথায় বলা অসম্ভব। আর মনিপুর এবং এর জনগণের ট্রাজেডির কথা তুলে ধরছেন ইরোম। এই নারী একাই এএফএসপিএ’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ১২ বছর ধরে অনশন ধর্মঘট করে যাচ্ছেন। গৌহাটির অ্যাক্টটিভিস্ট আরমান আলী বলেন, ‘এএফএসপিএ’র কারণে মনিপুরের (পুরো উত্তরপূর্বাঞ্চল সম্পর্কে এটা প্রযোজ্য) সব তরুণতরুণী সম্ভাব্য সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়েছে। অধিকন্তু এএফএসপিএ’র মতো বিশেষ আইনের কারণে ‘স্বাধীন দেশে’ বসবাস করার বিদ্রুপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

ভারতের স্বাধীনতা লাভের অব্যাহতি পর দেশটির পুরো উত্তরপূর্ব জনপদকে ‘গোলযোগপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ওই এলাকায় স্রেফ সন্দেহের বশে লোকজনকে গ্রেফতার করা হয়, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে তাদের হত্যা করে। আরমান আলী বলেন, ‘এটা সত্য যে উত্তরপূর্ব ভারত জঙ্গিবাদে আক্রান্ত। কিন্তু আমাকে ভারতের একটি এলাকার কথা বলুন যেখানে অপরাধ আর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় না। বলতে পারবেন না। কিন্তু আমি আপনাকে বলতে পারি, ভারতের অন্য কোথাও সাধারণ লোকদের প্রতিদিনই নিজেদেরকে দেশের আইন মেনে চলা নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে হয় না।’

বিতর্কিত আইনটির বিরুদ্ধে শর্মিলার অনশনের ১২ বছর পূর্ণ হয়েছে ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর। তার অনশন শুরু হয়েছিল ২০০০ সালের ৫ নভেম্বর। ইম্ফলআইজায়াল মহাসড়কের পাশে ম্যালম গ্রামের একটি বাস স্ট্যান্ডের কাছে আসাম রাইফেলস ন্যাশনাল চাইল্ড ব্রেভারি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীসহ ১০ বেসামরিক লোককে হত্যা করার কয়েক দিন পর তিনি অনশন শুরু করেন। তার বড়ভাই ইরোম সিংহজিৎ বলেন, ‘শর্মিলা তার অনশনের ১২ বছর পূর্ণ করেছে। এখন সে তার আন্দোলনের ১৩তম বছরে রয়েছে। নির্যাতনমূলক আইনটি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত সে তা চালিয়ে যাবে। রাজ্য সরকার এবং ৬০ জন আইনপ্রণেতা তার সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করছে। কিন্তু কেউই আইনটি বাতিল করার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তার সংগ্রামের প্রতি তাদের মনোভাবে আমরা সন্তুষ্ট নই।’

ছোটখাট গড়নের শর্মিলা একটি শাল জড়িয়ে থাকেন। নাকে পাইপ ঢোকানো রয়েছে। এই দৃশ্য দেখে কারো পক্ষেই চোখের পানি সামলানো অসম্ভব। কিন্তু ভারত সরকার সম্ভবত নীরবতা অবলম্বন করে তার শহিদি মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো কর্তৃপক্ষ, কোনো রাজনীতিবিদ, কোনো আমলা এখন পর্যন্ত তার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেননি। কিন্তু এই পলকা আর দুর্বল নারীই দৃঢ়প্রতিজ্ঞভাবে এখন টানা পাঁচ শতাধিক সপ্তাহ ধরে কোনো ধরনের খাবার ও পানীয় গ্রহণ না করে একাকী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বাস্তবতা হলো, তিনি ‘বিশ্বের দীর্ঘতম অনশন ধর্মঘটকারী’ হিসেবে ইতোমধ্যেই বিশ্বরেকর্ড গড়ে ফেলেছেন। অবশ্য এমন রেকর্ড নিয়ে উল্লাস করার কোনো কারণ নেই, বরং এ নিয়ে অনুতাপ করা উচিত।

শর্মিলা বলেছেন, ‘আমি আমার অনশন ভাঙবো না। আমি যেটাকে ন্যায়সঙ্গত ও সঠিক বলে বিশ্বাস করি, তার জন্য মৃত্যুবরণ করতেও প্রস্তুত।’ তিনি দৃঢ় অথচ ক্ষীণকণ্ঠে বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করছি।সরকার কেন সেনাবাহিনীকে ভয় পায়? কেন তারা সেনাবাহিনীর কথা শুনছে? কেন তারা জনগণের কল্যাণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না।’

শর্মিলা এখন যে আইনের অধীনে আটক রয়েছেন, সেই আইনের বলে পুলিশ তার মুক্তির পর তাকে এক বছরের জন্য গ্রেফতার করতে পারে। তিনি তার বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টিকারী অনশন ভাঙতে অস্বীকার করার প্রেক্ষাপটে তাকে আবারো গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তার আটকাদেশ বাড়ানোর জন্য প্রতি ১৫ দিন পর পর তাকে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রাখা হয়েছে। তাকে নাক দিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে।

তিনি তার ধর্মঘট শুরু করার তিন দিন পর পুলিশ তাকে ‘আত্মহত্যাচেষ্টা’র অভিযোগে গ্রেফতার করে। ভারতীয় দণ্ডবিধি ৩০৯ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যা করা অবৈধ। তাকে পরে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে দেওয়া হয়। তার স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি হতে থাকলে পুলিশ তাকে গ্রেফতারকালে বাঁচিয়ে রাখতে বলপূর্বক নাক দিয়ে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা নেয়। তারপর থেকে ইরোম শর্মিলা আইপিসি ধারা ৩০৯এর আওতায় প্রতি বছর ছাড়া পাচ্ছেন এবং গ্রেফতার হচ্ছেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে শর্মিলা জ্বালাময়ী কবিতা লিখছেন, আশা করছেন, একদিন কর্তৃপক্ষ তার কথা শুনবে।

রাজনৈতিক ক্রুসেডার এবং নাগরিক অধিকার কর্মী ছাড়াও শর্মিলা কবিও। তিনি তার কবিতাসংগ্রহ ‘ফ্রাগরেন্স অব পিস’ প্রকাশ করেছেন ২০১০ সালে। এতে তার ১২টি কবিতা স্থান পেয়েছে। কবিতাগুলো তার মাতৃভাষা মেইতেইলনে লেখা হয়েছিল। তার কবিতায় আবেগ, প্রতিবাদ আর আশার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। তিনি ২০০৭ সালে মানবাধিকারের জন্য গৌয়াঞ্জু পুরস্কার এবং ২০১০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন।।

(ওয়ানইন্ডিয়া অনলাইন থেকে)