Home » রাজনীতি » এসেছে শঙ্কা আর আতঙ্কের দিন

এসেছে শঙ্কা আর আতঙ্কের দিন

আবীর হাসান

politicsগত সপ্তাহের ছুটির দিনগুলো স্বস্তিতে কাটেনি মোটেই। হরতালের ঘোষণা মাথায় নিয়ে ঈদ পালন। ছুটতে ছুটতে যাওয়াআসা আর আশঙ্কায় থাকা কি হয় না হয় করে ফুৎকারে যেন উড়ে গেল ছুটির দিনগুলো। অন্যরা কী করবে তার চেয়ে এদেশের মানুষের বেশি চিন্তা খোদ রাষ্ট্রটাকে নিয়েই। অর্থাৎ রাষ্ট্র যারা চালাচ্ছেন তারা কখন কি করে বসেন সেটাই মানুষকে চিন্তায় ফেলেছে বেশি, বিরোধীদের চেয়ে। ঈদের ছুটির শেষ মুহূর্তে গ্রেফতার হলেন মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের মহাসচিব আদিলুর রহমান খান। রাষ্ট্রীয় ভাষায় বলা হচ্ছে – ‘তিনি তথ্য প্রযুক্তি নীতিমালা ভঙ্গের অপরাধ করেছেন।’ ডিজিটাল ভাষায় বলা যায় সাইবার ক্রাইম’। কিন্তু একজন তথাকথিত তথ্য বিকৃতিকারী (!) যিনি পলাতকও ছিলেন না, আগে কোনো মামলাও হয়নি। অথচ তাকে সাদা পোশাকের পুলিশ দিয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় তুলে নিয়ে যাওয়া কেন? আগে মামলা করেও তো তাকে আদালতে হাজির করা যেত। করা যেত সমন জারি।

আসলে মনে হচ্ছে, মানবাধিকার রক্ষার জন্য বাকস্বাধীনতার জন্য, যারা কাজ করেন তাদেরকে হুশিয়ার করার জন্যই আদিলুর রহমান খানকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে রিমাণ্ডে নেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা কি হিতে বিপরীত হলো না? ভীতিকর দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেই কি সুশীল বালকের মতো অন্য সব পূর্ণ বয়স্ক মানবাধিকার কর্মী, সমাজকর্মী আর গণমাধ্যমের লোকজন মুখ গোমড়া করে নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকবেন? আরও মনে হচ্ছে রাষ্ট্রের দিক থেকেই একটা গোলমেলে পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা হচ্ছে। একরোখা অপরিনামদর্শী হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা। দেখতে দেখতে সেই দিনগুলো চলেই এসেছে। সেই দিনগুলো যেগুলোর আশঙ্কায় ছিল বাংলাদেশের মানুষ। কেউ কেউ ভেবেছিলেন অন্য রকম কিছু হবে, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় দিনগুলোকে এড়ানো যায়নি। আসলে একটু একটু করে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে তখন গভীর গাঢ় অন্ধকারের আশঙ্কা করে মানুষ। সাগরে যখন ঝড় দূর থেকে উপকূলের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে তখনও মানুষ একই রকম আতঙ্কিত হয়। কখনো কখনো ঝড় দুর্বল হয়ে উপকূল অতিক্রম করে কিন্তু মাঝে মাঝে আশঙ্কার চেয়ে বেশি তাণ্ডব চালায় ঝড় জলোচ্ছ্বাস। নিশ্চয়ই সিডর এবং আইলার স্মৃতি কেউ ভোলেননি। এ যেন সে রকম কোন ঝড়েরই দূরবর্তী পূর্বাভাস।

পৃথিবীর যে সব দেশে রাষ্ট্র একরোখা হয়ে উঠেছে সে সব দেশেও মানুষ ওই রকম আগে থেকে এক রকম আশঙ্কা করেছে কিন্তু ঘটেছে কল্পনার চেয়ে জঘন্য সব ঘটনা। রাষ্ট্র একরোখা হলে অকর্মণ্য হয়ে পড়ে অনিবার্য ভাবেই। কারণ ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যই সব মনোযোগ যখন সরকার দেয়, তখন অন্যসব জরুরি বিষয়গুলো হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণে থাকে না কিছুই। দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলে, বেকারত্ব বাড়ে,সবচেয়ে খারাপ হয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অঘটনের ঘনঘটা শুরু হয়ে যায়। আর মিথ্যাচার করতে থাকে সরকার। এক সময়ে এই দেশেই যে এরকমটা হয়েছে তাতো নয়, বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন ঘটনা ঘটেছে। মেয়াদের বাইরে ক্ষমতা ধরে রাখার লিপ্সা যখন সরকারকে পেয়ে বসে তখন বিরোধীদের মোকাবেলার ধরনটাও যেমন আর গণতান্ত্রিক থাকে না তেমনি জনগণের জন্য করণীয়গুলোও বেমালুম ভুলে যায় ক্ষমতাসীনরা। বছরের পর বছর ধরে পুরো ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে চলছে এই সমস্যা। বিংশ শতাব্দীতে ছিল পাল্টাপাল্টি সামরিক শাসকদের দাপট। একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখা যাচ্ছে নির্বাচিত সরকারগুলোর শীর্ষ নেতাদের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রতিযোগিতা। গত শতাব্দীতে আর্জেন্টিনা সামরিক শাসকদের বিদায় করতে পারেনি। আর এই শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে কির্চনার পরিবারের ‘গণতান্ত্রিক শাসন।’ ব্রাজিলে চলছে বামপন্থী নামধারীদের ধারাবাহিক শাসন। লুলা ডি সিলভার নেতৃত্বে প্রগতিশীল গণতন্ত্রীরা স্বৈরাচারের নামান্তর হয়ে উঠেছে। এখন বিশ্বকাপ ফুটবলের অজুহাতে ক্ষমতা টিকে আছে তাদের। কিন্তু এই টিকে থাকতে গিয়ে রাষ্ট্রকে গণবিরোধী করে তুলেছে ‘বামপন্থী গণতান্ত্রিকরা।’ ভেনেজুয়েলায় জাতীয়তাবাদী প্রগতিশীলরা শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারই কায়েম করলো! হুগো শ্যাভেজের পথটা বেশ কড়াকড়িই মেনে চলছেন তার উত্তরসূরি। নিকারাগুয়ায় ওর্তেগা আট বছর বাদে ফিরলেন নব্য স্বৈরাচার হয়ে। এক সময় যিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকার আধুনিক প্রগতিশীলতার পথিকৃত, তিনি এখন স্বৈরাচারের সার্বভৌম প্রতিভূ। বিরোধীরা কোণঠাসা। জনগণের জন্য ন্যায় ও ন্যায্যতা বলে কিছু নেই। সমাজ ভেঙে পড়েছে। ‘সবার সঙ্গে সবার যুদ্ধের’ উদ্ভট নীতিই এখন ল্যাটিন আমেরিকার জনগণ মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে। রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চাওয়াকে বোকামি বা হাস্যকর বলে মনে করে তারা। মেক্সিকো, পানামা, হন্ডুরাস, পেরু, চিলি, বলিভিয়ায় তো সরকারের চেয়ে ক্ষমতাধর ওয়ারলর্ডরা কোথাও কোথাও সন্ত্রাসবাদীরাও। রাজনৈতিক ক্ষমতায় কোন ব্যক্তি বা দল টিকে থাকার জন্য ওই সব গ্রুপগুলোকে ব্যবহার করে চলছে।

বাংলাদেশেও ওই রকম পরিস্থিতি সমুপস্থিত। রাষ্ট্র এখন আর জনগণের দিকে তাকাচ্ছে না। নির্মোহ নির্বিকারভাবে নিজের কাজ করে যাচ্ছে। এটাই এখন ক্ষমতাসীনদের জন্য জরুরি। রাস্তার বিলবোর্ডগুলো যা বলছে তার ধারাবাহিকতাও আর নেই। এই ক্ষমতাসীনরা আবার ক্ষমতায় যেতে পারে এটা হচ্ছে তারই শেষ চেষ্টা। মাঝখানের এই সময়টা তাই গোলমেলে হতে বাধ্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মাঝখানের এই সময়ের পর আর ভালো সময় আসবে? নাকি গোলমালটাই প্রলম্বিত হতে থাকবে ক্রমাগত।

এটাও তো মনগড়া কোন আশঙ্কা নয়। বেশি দূরে মেক্সিকো বা পেরুতে যাওয়ার দরকার নেই। পাকিস্তানই খুব কাছের উদাহরণ। সামরিক স্বৈরাচার জিয়াউল হক মুজাহিদীন নামের বিষ বৃক্ষের বীজ বপন করেছিল। আবার মুজাহিদীন মোকাবেলার জন্য গণতন্ত্রপন্থী নওয়াজ শরীফের আগের আমলে সৃষ্টি করা হয়েছিল তালেবান। সেই তালেবান এখন কেড়ে নিয়েছে পাকিস্তানিদের শান্তিস্বস্তি। নওয়াজ অনেকদিন ক্ষমতায় ছিলেন না কিন্তু ছিল তালেবান এখনো আছে। নির্বাচিত সরকারের আমলে থেকেও যে উদ্ভট কাণ্ড ঘটানো যায় তার উদাহরণ বাংলাদেশেও আছে। এখানে সুশীল হওয়া অপরাধ, মানবাধিকারের কথা বলা অন্যায়। অপমৃত্যুর হিসাব করা অপরাধ, দুর্নীতির জন্য দায়ীদের চিহিৃত করাও অপরাধ। এতো অপরাধীদের সামলাবে কি করে সরকার? আদিলুর রহমান খানের মতো করে লোকজনকে তুলে নিয়ে গিয়ে কি সুফল ফলাতে পারবেন তারা? তারা নির্যাতক বলেই তো বার বার প্রমাণিত হবেন। দেশে বিদেশে রটবে খবর…. আরও খবর।।