Home » শিল্প-সংস্কৃতি » নির্ঘুম টাকার গল্প

নির্ঘুম টাকার গল্প

ফ্লোরা সরকার

wall-streetপুঁজিবাদী অর্থনীতির শেয়ার বাজারের নির্ঘুম টাকার গল্প নিয়ে ওয়ালস্ট্রিট ছবিটি নির্মিত। টাকার এই অমিতশক্তির গল্পের শুরু বেশ আগে থেকে হলেও ১৯২৯৩০ এর দশকে মহামন্দার সময়ে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ লর্ড জে.এম.কেইনস এর হাত ধরে তার বিখ্যাত সুদ তত্ত্ব “স্পেকুলেটিভ ডিম্যান্ড ফর মানি” বা “ফাটকাকারবারীর উদ্দেশ্যে টাকার চাহিদা” জনিত সুদ তত্ত্বের মাধ্যমে তা আরও পূর্ণতা পায়। যে তত্ত্বের সার কথা হলো­­-মানুষের কাছে তার অর্থের চাহিদা শুধু লেনদেন আর সাবধানতার ওপরেই নির্ভর করে না।অর্থের চাহিদা ফাটকাকারবারের উদ্দেশ্যে বন্ডের দাম বা সুদের হারের পরিবর্তনের প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করে। ক্ল্যাসিকাল পন্ডিতেরা যেমন ফিশার এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদেরা অনিশ্চয়তার ওপর কোন গুরুত্ব দেননি বলে তারা শুধুমাত্র লেনদেন আর সাবধানতার উদ্দেশ্যে অর্থের চাহিদার কথাই বলে গেছেন। কিন্তু কেইনসযাকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্যতম ভাষ্যকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তিনি কিন্তু আরও একধাপ এগিয়ে অর্থের চাহিদাকে ফাটকা কারবারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেন।অর্থের চঞ্চল ও নির্মম গতিবিধির ওপর তার সজাগ দৃষ্টি থেকেই এই সুদ তত্ত্বের অবতারণা। আর তাই ‘ওয়ালস্ট্রিট’ ছবির শুরুতেই আমরা দেখি মানুষ ব্যস্ত হয়ে যার যার কর্মস্থলে যাচ্ছে। কারোর কোনদিকে তাকাবার এতটুকু সময় নেই। পুঁজিবাদ কাউকে কোন দিকে তাকাবার সুযোগ দেয় না। ছবির গতি তাই কখনো, কোন এক মুহূর্তের জন্যেও থেমে থাকে না। ছবির প্রথম দৃশ্যের দ্বিতীয় শটে আমরা দুটো বড় মাছের ক্লোজ দৃশ্য দেখি। মৃত ঐ মাছের চোখের মতো মানুষগুলো যেন ভাবলেশহীন ভাবে কর্মস্থলে যাচ্ছে। পুঁজিবাদ মানুষকে ভাবলেশহীন হতে শেখায়। যা ছবির গল্প যত এগিয়ে যায় আমরা ধীরে ধীরে তা আবিষ্কার করি।

ওয়ালস্ট্রিট’ ছবির সময়কাল বেছে নেয়া হয়েছে ১৯৮৫ সাল। যে সময়ে কর্পোরেট পৃথিবীর অর্থগৃধ্নুতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। মাৎসন্যায়ের মতো বড় বড় কোম্পানি ক্রমেই ছোট ছোট কোম্পানিকে গ্রাস করে ফেলছিলো। বিশ্বায়নের নামে দরিদ্র দেশগুলোকে ধনী দেশগুলো বানিজ্যিক লোলুপতায় দখলদারিত্ব শুরু হচ্ছিলো। ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছে বাড ফক্স নামক একটি উচ্চাকাঙ্খী, উদ্যোমী তরুণকে কেন্দ্র করে, যে ওয়ালস্ট্রিটে ব্রোকার হিসেবে কর্মরত। ১৯৮০ দশকে মুক্তবাণিজ্য আর কর্পোরেট পৃথিবীর রোষানলে পড়ে শেয়ার বাজারের লাগামহীন আর্থিকস্ফিতি মানুষকে ক্রমেই লোভ আর লালসার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলো। যে কারণে এই ছবির কোন কোন সমালোচনায় শেয়ার বাজারের এই লাগাম হীন উত্থানপতনকে ‘রটেন টমেটো’ বা ‘পচনশীল টমেটো’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। বাড ফক্স এর সঙ্গে গর্ডন গ্যাকো নামে মেফিস্টোফিলিস সদৃশ আরেক সিনিয়র ব্রোকারের দেখা হয়। যে বাড কে ব্রোকারির মাধ্যমে কোটিপতি হবার স্বপ্ন দেখায়। উচ্চাকঙ্খী বাড বুঝতে পারে গ্যাকোর ছায়াতলে ব্রোকারি করলে সেও একদিন তার মতো কোটিপতি হতে পারবে। ছবির শুরুতেই তাই দেখি বাড যখন টেলিফোনে কোন এক কোটিপতির সঙ্গে কথারত অবস্থায় সে তার বন্ধুকে বলে – “আমি টেলিফোনের অপর পাশে বসে থাকা লোকটির মতো হতে চাই”। বাড সুযোগ খুঁজতে থাকে গ্যাকোর সঙ্গে দেখা করার জন্যে। এবং সুযোগ তার হাতের নাগালে আসে যখন বাড অনলাইনে দেখে গ্যাকোর জন্মদিন আসন্ন প্রায়। উপলক্ষ্য জন্মদিন হলেও বাড তার লক্ষ্য নিয়ে গ্যাকোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গ্যাকোর ছায়াতলে থেকে বাড বুঝতে পারে শেয়ার বাজারে কি করে তথ্যের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থাকলে ফাটকা কারবারে অল্প দিনে অনেক টাকা আয় করা যায়। যে জন্যে বাড এর বাবা যখন বাডকে বলে – “তুমি তো বিক্রেতা ছাড়া আর কিছু না। তুমি অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা করো। অথচ তুমি ভালো ডাক্তার বা বিচারক হতে পারতে”। বাড তখন তার বাবাকে উত্তরে বলে – “গরীব হয়ে থাকার ভেতর কোন অহঙ্কার নেই”। অর্থাৎ শেয়ার বাজারের একজন ব্রোকারকে সৎ পেশা অপেক্ষা দালালির মতো অসৎ পেশাকে অনেক বেশি উৎসাহিত করে। তাই গ্যাকো যখন বাডকে বলে -“প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্র হচ্ছে যুদ্ধ করার আগেই জয় করে নেয়ার মতো। —– আমার দরকার গরীব, স্মার্ট, ক্ষুধার্ত এবং অনুভূতিহীন মানুষ। —- তোমার যদি বন্ধুর দরকার হয় কুকুর পালো”। গ্যাকোর উপদেশে বাড মুগ্ধ। কর্পোরেট পৃথিবীর অন্যতম বৈশিষ্ট কাউকে নিজের বশে আনার আগে তাকে প্রথমেই অর্থ এবং নারী দ্বারা প্রলুব্ধ করা। আর মেসিস্টোফেলিস রূপি গ্যাকো ঠিক এই কাজটা দিয়েই বাডকে দখলে আনে। প্রথমেই তাকে বিশাল অংকের টাকার একটি চেক ধরিয়ে দেয় সঙ্গে গ্যাকোর রক্ষিতা ইন্টেরিয়োর ডিজাইনার ড্যারিয়েন। কাহিনীর এক পর্যায়ে ড্যারিয়েন বাডের প্রতি দুর্বল হলে গ্যাকো তাকে সতর্ক করে। কারণ কর্পোরেট পৃথিবীতে প্রেম নামক কোন শব্দ নেই। হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের লেনদেন নয়, অর্থের সঙ্গে অর্থের লেনদেন হয়। প্রেম নয়, টাকাই স্বপ্ন। তাই একদিন গভীর রাতে গ্যাকো যখন বাডকে ফোন করে, বাড ঘুম ঘুম চোখে ফোন ধরলে গ্যাকো তাকে বলে – “মানি নেভার স্লিপস বাড, গেট আপ”। গ্যাকো সমুদ্রের ধারে ভাবলেশহীন ভাবে বাডকে ফোনে বলে চলে -“কতদিন সমুদ্রের ধারে সূর্যোদয় দেখিনি”। গ্যাকোর কাছে দীর্ঘকাল সুর্যোদয় না দেখার তথ্যটিই শুধু আছে, কিন্তু না দেখার কোন বেদনা আমরা তার অব্যক্তিতে দেখি না।

শুধু অর্থের আসক্তি ছাড়া আর কোনকিছুতেই আসক্তি নেই খোলা বাজারের ভেতরে। নেই আবেগের প্রশ্রয়। আর তাই ব্লুস্টার কম্পানি নিয়ে যখন বাড আর গ্যাকোর মাঝে তিক্ততা শুরু হয় তখন বাড আর ড্যারিয়েন দুজন দুজনের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লেও, টাকার প্রশ্নে কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। দুজনের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তেমনি বাড তার বাবাকেও ছেড়ে আসতে কুন্ঠাবোধ করে না। গ্যাকোকে একটা কম্পানির কনফারেন্সে ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বলতে শুনি। বাড বলে – “ —–ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহোদয়গণ বিষয়টা হচ্ছে অর্থগৃধ্নুতা। আরও ভালো ভাবে বললে বলতে হয় এই লালসা বিষয়টা খুব ভালো। লালসাই সঠিক। লালসা কাজ করে। লালসা সব সচ্ছ করে দেয়,এটা আবিষ্কারে উৎসাহ যোগায়। সব ধরণের লালসা জীবনের জন্য,অর্থের জন্য, ভালোবাসার জন্য, জ্ঞানের জন্য জীবনের সবকিছুর জন্য শুধু লোভ আর লালসা প্রয়োজন”। অর্থ্যাৎ কর্পোরেট পৃথিবী মানুষকে শুধু একটা শিক্ষাই দেয় অর্থগৃধ্লুতা। এই লোভের শিক্ষায় বাড এমনভাবে শিক্ষিত হয় আগেই বলা হয়ে সে তার প্রেয়সি আর বাবাকে ছেড়ে দিতেও কুন্ঠা বোধ করে না। অভিজ্ঞ গ্যাকো বাডকে বলে -“ —আমরা (শেয়ার বাজরের ক্রেতাবিক্রেতা, দালাল ইত্যাদি) তো কিছুই করি না। আমরা শুধু স্টক আর রিয়েল এস্টেট এর ফাটকা কারবার করি। আমরা কিছুই তৈরি করি না। শুধু ভোগ করি। আমরাই তৈরি করি আইন, তথ্য,যুদ্ধ,শান্তি,দুর্ভিক্ষ এসব। তুমি আরও ভাবো। আমরা গণতান্ত্রিক জগতে বাস করছি। বাস করছি মুক্ত বাজারে। তুমি তারই একটা অংশ”। কিন্তু শেয়ার বাজারের অর্থ এমনই এক শক্তিধর বস্তু, যে শক্তিবলে মানুষের সঙ্গে মানুষের শেয়ারেরও বিচ্ছেদ ঘটায়। তাই কিছুদিন পরেই বোকা বাড বুঝতে পারে তার বোকামির কথা। তার ঘাড়ে কাঁঠাল রেখে গ্যাকো কিভাবে এতোদিন অর্থ ভেঙ্গে খেয়েছে। কিভাবে তার তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্লুস্টার কোম্পানির দালালির সিংহভাগ টাকা গ্যাকো হস্তগত করেছে। এই প্রথম বাড প্রতিবাদি হয়ে ওঠে। তার ভুল বুঝতে পারে। সে তখন তার অসুস্থ বাবার কাছে ছুটে যায়। প্রতিজ্ঞা করে সে ব্লুস্টারের শেয়ার হস্তগত করবে এবং তার বাবার এয়ারলাইনস কোম্পানিটি দাঁড় করাবে। অর্থ তখন অর্থেরও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দেখা দেয়। বাড গ্যাকোর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে সামনে দাঁড়ায়। তখন শেয়াবাজারে কর্মরত বাডের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্রোকার বাডকে বোঝয় – “অর্থ এমনই এক জিনিস, তুমি যা করতে না চাও সেটাই তোমাকে দিয়ে করায়”। দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অর্থ্যাৎ গ্যাকো আর বাডের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখে শেয়ার বাজারের ভগবান তখন অলক্ষ্যে মুচকি হাসে। কারণ সেই ভগবানের কোন হৃদয় নেই, নেই সামান্য অনুকম্পা আছে শুধু হঠকারিতা। আর তাই ফাটকাকাররের ফাঁদে দুজনই পড়ে যায়, মাঝখান থেকে তৃতীয় আরেকজন ব্লুস্টারের লাভের অংশ হস্তগত করে নেয়। গ্যাকো কিন্তু বাডকে ছেড়ে দেয় না। গোপন তথ্য পাচারের মামলায় বাডকে ফাঁসিয়ে দেয়। ছবির একেবারে শেষে বাড যখন শেষবারের মতো ওয়ালস্ট্রিটে যায়, তখনও সে খবরটা জানেনা। কিন্তু অফিসের লোকজনের থমথমে মুখ দেখে সে জিজ্ঞেস করে কেউ মারা গেছে কিনা। বাডের ঘনিষ্ঠ বন্ধটি বলে হ্যা কেউ মারা গেছে। বাড তখনও বুঝে উঠতে পারে না হঠাৎ কি হলো। তখন সেই বয়োজ্যেষ্ঠ ব্রোকার বাডকে বলে – “ মনে রাখবে মানুষের ধর্ম হচ্ছে ক্রমেই রসাতলের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সত্যি সত্যি সে যখন তার মুখোমখি হয়, তখন আর তার পেছনে ফেরার কোন উপায় থাকে না। আর ঠিক সেই মূহুর্তে সে নিজেকে আবিষ্কার করে। আর এই আবিষ্কারই তাকে পরবর্তিতে উচ্ছন্নে বা রসাতলে যেতে সাবধান করে”। বাড তার অফিসকক্ষে যেয়ে দেখে পুলিশ তার জন্যে অপেক্ষা করছে। অপমানিত বাড কাঁদতে কাঁদতে হাতকড়া হাতে পুলিশের সঙ্গে বের হয়ে আসে।

ছবির শেষ দৃশ্যে বাডের বাবা যখন বাডকে কোর্টে পৌঁছে দেয়ার জন্য গাড়িতে নিয়ে যায় তখন বাডকে বলে -“ —–বেচা কেনা করার চেয়ে কিছু সৃষ্টি করতে শেখো”। বাড ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নেমে কোর্টের দিকে এগিয়ে যায়। দর্শক স্তম্ভিত চোখে চেয়ে থাকে শেয়ার বাজারের শেষ পরিণতির দিকে। আমাদের তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে শেয়ার বাজারের বিশৃঙ্খল জালে যতটা পরিশ্রম দেয়া হয় তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়।

পরিচালক অসাধারণ দক্ষতায় শেয়ার বাজারের গতির সঙ্গে ছবির গতির সামনঞ্জস্যতা বজায় রাখেন। টাকার পেছনে মানুষের এই ছোটার গতি ছবির দ্রুত গতির সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। ক্যামেরার গতি একটা মূহুর্তের জন্যের আমরা স্থির হতে দেখি না। গল্পের গতি যেমন তীব্র বেগে ছুটে চলে, ছবির চরিত্রগুলোও তেমনি তীব্র বেগে ছুটে চলে কেবল টাকার পেছনে। ছবির প্রধান দুই চরিত্রের একজন গর্ডন গ্যাকো রূপী বিখ্যাত অভিনেতা মিশেল ডগলাস এর অনবদ্য অভিনয় শেয়ার বাজারের বৃহৎ ব্রোকারের চরিত্রটি নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তোলে। মুল নায়ক বাড ফক্স রূপী চার্লি শিনের শিশুসুলোভ আর প্রশ্নবোধক মুখটি সারা ছবিতে একই ভাবে ফুটে উঠতে দেখা যায়। বাডের মতো কত কত তরুন এই শেয়ার বাজারের ফাঁদে পা তাদের মেধা, মননের ক্ষতি করছে তা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয় না। আর তখন ছবির বাড শুধু একজন বাড হয়ে ফক্স থাকে না, অনেক বাড ফক্সের কাহিনী হয়ে যায়। কর্পোরেট পৃথিবীর নির্লজ্জ্ব চরিত্র আমাদের বুঝিয়ে দেয় শেয়ার বাজারের কয়েক মূহুর্তের কোটি কোটি টাকার লেনদেন সারা পৃথিবীর অর্থনীতিতে ধস নামাতেও কয়েক মূহুর্তও দেরি করে না। ছবিটি তখন আমাদের চিন্তিত করে। অর্থনীতির নীতি কোন পথে যাবে ভবিষ্যতে।।