Home » অর্থনীতি » ভারত তিস্তা চুক্তি করবে না

ভারত তিস্তা চুক্তি করবে না

. ইনামুল হক

testaতিস্তার পানিবন্টন চুক্তি শেষ পর্যন্ত হবেই না বলেই ধারণা করা যায়। ক্ষমতাসীন সরকার শেষ চাওয়া হিসেবে তিস্তার পানিবন্টন এবং সীমান্ত সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করেছিল ভারতের সঙ্গে। কিন্তু ভারত তিস্তার পানিবন্টন প্রশ্নে বলতে গেলে নাই বলে দিয়েছে। আর সীমান্ত সমস্যা নিয়ে সমাধানের যে সম্ভাবনাটুকু ছিল তাও ভারতীয় রাজনীতির যথারীতি মারপ্যাচে আটকে গেছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বার বার এই আশ্বাসবাণী শোনানো হচ্ছিল যে, তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি হবেই। কিন্তু যখন ভারতের পক্ষ থেকে একের পর এক বাহানা শুরু করা হলো তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মণি ভারত সফর করেছেন। দেখা করেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেকের সঙ্গেই। কিন্তু ওই সফরে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হলো সে পুরনো কথা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ ভারত করবে না। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। টিপাইমুখের ক্ষেত্রেও শোনানো হয়েছিল একই আশ্বাসবাণী। তিস্তার ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। ভারত তিস্তার পানিবন্টনে আগ্রহী না হলেও আন্তর্জাতিক এই নদীর উপর একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করেই চলছে। সিকিমে বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে একাধিক বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য মতে, ভারত তিস্তার নদীর উপরে অচিরেই আরো আট থেকে দশটি বাঁধ নির্মাণ করবে।

বিগত ১৮১৯ জুন ২০১৩ ঢাকায় যৌথ নদী কমিশনের ৩৮তম বৈঠক হবার কথা ছিলো। বলাবলি হচ্ছিলো, এই বৈঠকে তিস্তার নদীর পানি বন্টন চুক্তি হযে যাবে। ১৬ তারিখ রাতে বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশচন্দ্র রায়ের কাছে ভারতের পানি সম্পদ মন্ত্রী হরিশ রাওয়াত এর একটি পত্র পৌছায় যাতে বলা হয় তিনি আসতে পারছেন না। বৈঠকটি শেষ মুহুর্তে আবার পিছিয়ে গেলো। এতোদিন মমতা ইস্যু দিয়ে তিস্তার পানিবন্টনের বিষয়টি ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। এবার সরাসরি ভারতের পক্ষ থেকে নাই বলে দেয়া হলো।

ভারত ১৯৮২ সালে গজলডোবার কাছে তিস্তা নদীর উপর ব্যারেজ নির্মাণ করে ও ডাইভারশন খাল কেটে মহানন্দা নদীতে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। তা’ছাড়া উত্তরবঙ্গের কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ জেলার ৯.২২ লক্ষ হেক্টর জমিতে তিস্তার পানি দিয়ে সেচ দেবার জন্য ভারতের বিশাল পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে দোয়ানীর কাছে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করেছে যার আওতায় বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার ৬.৩২ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ দেবার পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশে নির্মিত তিস্তা ব্যারেজের কাছে ঐতিহাসিকভাবে তিস্তা নদীর সর্বাধিক গড় প্রবাহ ছিলো দুই লাখ ৮০ হাজার কিউসেক এবং সর্বনিম্ন গড় প্রবাহ ছিলো দশ হাজার কিউসেক। এর উজানে ক্রমবৃদ্ধি হারে পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে বাংলাদেশে এর প্রবাহ এখন এক হাজার কিউসেকে এসে দাড়িয়েছে, এমনকি খরার সময় তা’ পাঁচশ কিউসেক হয়ে যায়। ঐতিহাসিকভাবে, তিস্তার পানি আসে হিমালয়ের হিমবাহগুলো থেকে যার সঙ্গে যোগ দেয় এর গতিপথের ঝর্ণা ও উপনদীগুলির প্রবাহ। এই প্রবাহ বসন্ত আসার সাথে বাড়তে থাকে যখন তাপবৃদ্ধির কারণে তুষার ও হিমবাহ গলতে শুরু করে। বর্ষার অতিবৃষ্টি (সারা সিকিমে বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ২৭৪০ মিলিমিটার) অনেক সময় ভাটির ডুয়ার্স সমতলে বন্যা সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪ টি নদী আন্তর্দেশীয় বা অভিন্ন নদী হিসাবে চিহ্নিত আছে। তবে বৃটিশ আমল থেকেই গঙ্গা নদীর উপনদীগুলোতে সেচের পানি সরিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে ব্যারেজ নির্মাণ শুরু হয়। তিস্তা নদীর পানি বন্টন বিষয়ে ১৯৫২ সাল থেকে আলোচনা শুরু হলেও ষাটের দশকে গঙ্গা নদীর পানি বন্টনের বিষয়টি চলে আসায় তা’ পিছিয়ে যায়। পাকিস্তান আমলের শুরুতে হার্ডিঞ্জ সেতুর কাছে শুকনা মৌসুমে গঙ্গা নদীর ঐতিহাসিক গড় প্রবাহ ছিলো প্রায় এক লাখ কিউসেক। ১৯৭৫ সাল নাগাদ উজানে অতিমাত্রায় পানি প্রত্যাহারের ফলে ফারাক্কার কাছে পানি প্রবাহ প্রায় পঞ্চাশ হাজার কিউসেকের কাছাকাছি নেমে আসে। ভারত ১৯৭৫ সালে গঙ্গার উপরে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করে। এরপর গঙ্গার প্রবাহ এর মূল শাখা পদ্মাতে যেতে না দিয়ে ভারত এর সিংহভাগ ভাগিরথীতে চালান করা শুরু করে। এর ফলে শুকনা মৌসুমে গঙ্গা নদীর ভাটিতে পানি কমতে থাকে ও বাংলাদেশের ভেতরে বড়াল, ইছামতী, মাথাভাঙ্গা, ইত্যাদি বড় বড় শাখানদীগুলি মরতে থাকে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৭ সালে প্রথম গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ন্যুনতম চৌত্রিশ হাজার পাঁচশ কিউসেক পানি সরবরাহের গ্যারান্টি ছিলো। কিন্তু ১৯৮২ সালের পর কোন চুক্তি না থাকায় ফারাক্কা দিয়ে পানি আসা কমে যায়। এরপর ১৯৮২ এবং ১৯৮৫ সালে দু’টি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বটে কিন্তু তাতে কোন গ্যারান্টি ক্লজ ছিলো না। ঐসময় ভারতের প্রস্তাব ছিলো বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে একটি খাল কেটে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফারাক্কার উজানে ফেলে পানির ঘাটতি মেটাতে হবে। কিন্তু এতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঘড়বাড়ী থেকে উচ্ছেদ করতে হতো এবং পরিবেশ বিপর্যয় হতো। বাংলাদেশ এই প্রস্ত—াবে সায় দেয়নি। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায় এবং ১৯৯৬ পর্যন্ত কোন নতুন চুক্তি হয়নি। ১৯৯৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রবাহ দশ হাজার কিউসেকেরও নিচে নেমে আসে। ১৯৯৬ সালে যে চুক্তি হয় তাতে সর্বনিু ২৭,৬৩৩ কিউসেক পানির কথা বলা হয় কিন্তু কোন গ্যারান্টি না থাকায় প্রায় বছরই এই চুক্তির কোন সুফল পাওয়া যায় না।

দুই হাজার সাল পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে অভিন্ন নদীর পানি বন্টন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কথা ছিলো, নদীকে বাঁচানো দরকার। সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে অধিক খাদ্য ফলানোর নামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যারেজ নির্মাণ করে নদীর অধিকাংশ প্রবাহ সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যারেজের ভাটিতে মূল নদীর প্রবাহে কিছুই অবশিষ্ট থাকছে না। এর ফলে নদী নির্ভর ভাটি অঞ্চলের জলজ জীব, মানুষ, পশু ও গাছপালা অস্তিত্বের হুমকির মধ্যে পড়ছে। তাই বলা হলো নদীর পানি যাইই সরিয়ে নেয়া হোক না কেন, শুকনো মৌসুমে ২০ শতাংশ প্রবাহ নদীর প্রাণ হিসেবে বিবেচনা করে তা’তে কেউ হাত দেবে না। বলা হলো তিস্তা নদীর চুক্তিতে এই বিষয়টি যুক্ত করে বাকী ৮০ শতাংশ প্রবাহ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমানে ভাগ করা হোক। এর ফলে বাংলাদেশ বাস্তবে পেতে পারে ৬০ শতাংশ এবং ভারত পাবে ৪০ শতাংশ পানি। ১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানি বন্টনের দ্বিতীয় চুক্তির সময় তিস্তা নদীর পানি সহ ধরলা, দুধকুমার, মনু, খোয়াই, গোমতী, মুহুরী এবং অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বন্টনের বিষয়ও উঠে আসে।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, গজলডোবা ব্যারেজের কাছে আসা তিন হাজার পাঁচশ থেকে চার হাজার কিউসেক পানি কোথায় যাচ্ছে? কারণ ভাটিতে দোয়ানীর কাছে আমরা মাত্র এক হাজার থেকে চারশ কিউসেক পানি পাচ্ছি। এর উত্তর পেতে আমাদেরকে তেতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা সড়কে যেতে হবে, যার পাশ দিয়ে মহানন্দা নদী প্রবাহিত। তিস্তার পানি এই নদী দিয়ে সরিয়ে ভারত নিয়ে যাচ্ছে বিহারের মেচী নদীতে, সেখান থেকে ফুলহার নদের মাধ্যমে ফারাক্কার উজানে। ভারত মেচী নদীতে একটি ব্যারেজ নির্মাণ করছে, যার ফলে উত্তরবঙ্গ ও বিহারে তার আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।

প্রতিবেশী দু’টি দেশের মধ্যে কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি হলে বিবেচ্য হবে উভয় দেশের জনগণের স্বার্থ। ভারত ও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলির ঋতুভিত্তিক ঐতিহাসিক গড় প্রবাহের উপর নির্ভর করেই এই অববাহিকার জীবজীবন, কৃষি ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। তিস্তার প্রবাহ পরিমাপের জন্য চুক্তি হলে এই নদীতে ঐতিহাসিকভাবে কি পরিমান পানি প্রবাহিত হতো, সেটা নির্ণয় করে সেই প্রবাহ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একটি নদীর ঐতিহাসিক প্রবাহ ঐ নদী তীরবর্তী মানুষের ঐতিহাসিক অধিকার।।