Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান

সাক্ষাৎকার – অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান

একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও লড়াইকে জোরদার করা

adilur-rahmanআদিলুর রহমান খান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’এর মহাসচিব। র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং তথাকথিত ক্রসফায়ার, এক্ষেত্রে সরকার এবং সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি গত ৫ আগস্ট নেয়া।

আমাদের বুধবার: র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তথাকথিত ক্রসফায়ারের ঘটনা একের পর এক ঘটিয়েই যাচ্ছে। এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

আদিলুর রহমান খান: স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত এই ৪২ বছরে কোনো সরকারই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন কায়েম করায় কখনই অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল না। সে জন্যই আমরা দেখেছি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, আইনী হেফাজতে নিয়ে মৃত্যু ও নির্যাতন করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। আর এটা করা হয় ভিন্নমতাবলম্বীদের ক্ষেত্রে। স্বাধীনতার পর জাতীয় রক্ষী বাহিনীর হাতে ব্যাপকভাবে বামপন্থী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরসহ সাধারণ মানুষকে নির্যাতননিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। এর পর সামরিক শাসনামলগুলোতেও মানুষ ব্যাপক মাত্রায় অত্যাচারিত হয়েছে এবং ১৯৯০এর পর একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সুবাতাস বইবে বলে মানুষ আকাঙ্খা করেছিল। মানুষ আশা করেছিল এরপরে হয়তো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি হয়নি, আর হয়নি বলেই আমরা গণতান্ত্রিক সরকার পাইনি, পেয়েছি নিছক নির্বাচিত সরকার। সেই নির্বাচিত সরকারের আমলে এসে আমরা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নানাবিধ নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে দেখছি। এসব হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে প্রতিহত করার জন্য একটি গণতান্ত্রিক শক্তির উন্মেষ ঘটানোর প্রয়োজন ছিল। তাও কিন্তু যারা বিকল্প চিন্তা করেন, তারা পারেননি। গণতান্ত্রিক শক্তির উন্মেষ ঘটাতে বা বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার ব্যর্থতার কারণেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, নিপীড়নের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এছাড়া দেশে ফৌজদারীসহ বিচার ব্যবস্থায় ব্যাপক ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। আর সে কারণেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার ব্যবস্থা যতোটুকু যথাযথ ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বরং তারা নানা সময়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করে থাকে। আর এ জন্যই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম বা রাজনৈতিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটছে।

আমাদের বুধবার: সরকারের ভূমিকাকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

আদিলুর রহমান খান: আসল কথা হচ্ছে সরকারই এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। সরকার নিরপেক্ষ কোনো ঘটনা ঘটে না। সরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম বা নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলো ঘটায়। যখন রাষ্ট্রটি নিজেই সন্ত্রাসী হয়ে পড়ে, যখন সরকার নির্বাচিত হয়েও আচরণে ও কার্যকলাপে অগণতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করে তখনই তারা নির্যাতননিপীড়নের পথটিকেই বেছে নেয়। বিভিন্ন দেশে এমনটা আমরা দেখেছি এবং দেখছি। এর বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইকে জোরদার করা।

আমাদের বুধবার: কিন্তু এ ধরনের প্রচেষ্টা তো আমাদের দেশে দৃশ্যমাণ নয়। কেন?

আদিলুর রহমান খান: আমাদের দেশে এই প্রচেষ্টা স্বাধীনতার পরে ছিল। কিন্তু ব্যাপক নির্যাতননিপীড়নের কারণে সে প্রচেষ্টাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং যারা এক সময় এসব প্রচেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা অনেকেই তাদের নীতি বিসর্জন দিয়ে আজকে শোষকগোষ্ঠী বা নিয়ন্ত্রণকারী শক্তির পক্ষে শামিল হয়েছেন, তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। সে জন্য সমাজে ওই প্রচেষ্টাটি দুর্বল হয়েছে সত্যি কিন্তু যেহেতু সমাজে সেই ধরনেরই নির্যাতননিপীড়ন আছে এবং সমাজ যেহেতু এখনো গণতান্ত্রিক হয়ে উঠেনি, যেহেতু রাষ্ট্র এখনও নিপীড়নমূলক, যেহেতু রাষ্ট্র জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, অত্যাচারনির্যাতন চালাচ্ছে, সে কারণেই ছোট শক্তি হলেও, দুর্বল শক্তি হলেও জনগণের মধ্যে আকাঙ্খাটা যেহেতু প্রবল এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, সে জন্যই এর বিরুদ্ধে প্রবল লড়াইসংগ্রাম গড়ে উঠবেই। নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র অবশ্যই মোকাবেলা করবে জনগণের লড়াইসংগ্রামকে, জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবেই।

আমাদের বুধবার: কিন্তু এর কোনো আলামত কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন?

আদিলুর রহমান খান: আলামত নেই তা আমি বলবো না। এখনও তো আপন আপন এলাকায় ও স্থানীক পর্যায়ে কিছু কিছু ঘটনা তো জনগণ নিজস্ব উদ্যোগেই প্রতিহত করছে, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলছে। রূপগঞ্জ, আড়িয়াল বিল, সিলেট, সুন্দরবনের রামপালে আমরা জনগণের আন্দোলন তো দেখছি। সেই আন্দোলনকে একসূত্রে গেঁথে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার জায়গা সৃষ্টির ঘটনাটি তো এখনো ঘটেনি। কিন্তু জনগণ কিন্তু প্রস্তুত অন্যায়, অনাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য। তবে যথাযথ নেতৃত্ব এখনো গড়ে উঠেনি। আবার একথাও তো সত্য, নেতৃত্ব আকাশ থেকে নেমে আসবে না, নেতৃত্ব জনগণের মধ্য থেকেই তৈরি হয়।

আমাদের বুধবার: রাষ্ট্রীয় নিপীড়ননির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর ব্যাপারে সুশীল সমাজের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

আদিলুর রহমান খান: আমাদের দেশে তথাকথিত সুশীল সমাজ ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাশালীদের উচ্ছিষ্টভোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভাড়াটে হিসেবেই তারা কাজ করে। জনগণের মূল যে সংগ্রামআন্দোলন, জনগণের জীবনজীবিকার প্রশ্নে তার নিয়ত ঘাতপ্রতিঘাতের সঙ্গে তথাকথিত সুশীল সমাজের কোনোই সম্পর্ক নেই। তাদের এই সম্পর্কহীনতার কারণে বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক সরকার আসতে বা নির্বাচিত সরকারগুলো অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ করলে, তাদের লেজুড় হিসেবে এই তথাকথিত সুশীল সমাজ ওই শক্তির সাফাই গাইবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সুশীল সমাজের কিন্তু বাস্তবিক অর্থে জনগণের মধ্যে কাজ করার কোনো জায়গা নেই। কাজেই রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে লড়াইসংগ্রাম, আন্দোলনপ্রতিবাদ করার পাশাপাশি এই সুশীল সমাজকেও মোকাবেলা ও প্রতিহত করতে হবে।

আমাদের বুধবার: সর্বসাম্প্রতিক একটি ঘটনার প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ঢাকায়ই যুবলীগের এক নেতাকে হত্যা এবং প্রধান সন্দেহভাজনকে র‌্যাব তথাকথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করে। এই ঘটনাটিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

আদিলুর রহমান খান: যুবলীগের ঘটনাটি হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের ভেতরকার কোন্দল ও ক্ষমতার সুযোগ সুবিধার ভাগবাটোয়ারা এবং এ নিয়ে প্রতিযোগিতার বহিঃপ্রকাশ। এটা সামনে চলে এসেছে যে ক্ষমতাসীনদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রতিফলনে যে ক্রসফায়ারের ঘটনাটি ঘটেছে, তা না ঘটলে অনেকের নাম কিন্তু প্রকাশ হয়ে পড়তো। র‌্যাবের ভূমিকা নিয়ে এখানে নতুন করে বলার কিছু নেই। অসংখ্য ত্যাগী বাম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যেমন মোফাখখারুল ইসলাম চৌধুরী, কামরুল মাস্টার থেকে শুরু করে অসংখ্য ক্রসফায়ারের ঘটনায় র‌্যাব অভিযুক্ত। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীও একই দায়ে অভিযুক্ত।

আমাদের বুধবার: সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনেও অঙ্গীকার করেছিলেন কয়েক দফায়। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার মধ্যে ফারাক কতোটুকু?

আদিলুর রহমান খান: তারা যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা কখনও কার্যকরি করেন না। আবার তারা যে বলেন তা অধিকাংশই অসত্য। তাই আমরা মনে করি, তাদের অসত্য কথাবার্তা বা অঙ্গীকারের উপরে আমরা আস্থাশীল থাকতে পারি না বলেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সমস্ত জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব করতে গেলে এটি অপরিহার্য।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।