Home » অর্থনীতি » ৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৬)

৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৬)

আইয়ুব দশকের সংস্কার

আনু মুহাম্মদ

60_sজেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান সামন্ত পরিবার থেকে আসেননি, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে তাদের প্রতিনিধিত্বও করেননি। তিনি সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দক্ষ এবং টেকসই প্রতিনিধি ছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা বরাবর পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক বৃহৎ পুঁজির পক্ষেই ছিল। ১৯৬১ সালের ‘পারিবারিক আইন’ অধ্যাদেশ এবং ১৯৬১৬২ সালে ভুমি সংস্কার সামন্তপ্রভুদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যকে আঘাত করে। ভূমি সংস্কার যেভাবে করা হয় তার প্রভাব পুরো পাকিস্তানের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল সুদূরপ্রসারী। যেভাবে পূর্ব ও পশ্চিম অংশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোতে এই ভূমি সংস্কার করা হয় সেটাও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বদরুদ্দীন উমর তাঁর ‘আইয়ুব খান আমলে বাংলাদেশের কৃষক’ শিরোনামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ভুমি সংস্কারে দুই অঞ্চলে ফলাফল হয় ভিন্ন ভিন্ন। ১৯৫০ সালে পূর্ব বাংলায় জমিদারী প্রথা বিলোপ করে যে ভূমি সংস্কার হয় তাতে ভূমি মালিকানার সিলিং ধরা হয়েছিল ১০০ বিঘা। আইয়ুব খান ভূমি সংস্কারে এই অঞ্চলের সিলিং নির্ধারণ করেন ১২৫ একর বা মোটামুটি ৩৭৫ বিঘা। ভুমি মালিকানার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি, কিংবা বেআইনী ভূমিদখল বৈধ করবার এই কর্মসূচি কৃষি থেকে শিল্পে পুঁজি প্রবাহ উৎসাহিত করবার বদলে উল্টোটাই করে।

অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ঘটনা ঘটে বিপরীত। এর আগে সেখানে কোন ভূমি সংস্কারই করা হয়নি। আগে পাঞ্জাবে একবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বটে, তবে তা পরে বাতিল করা হয়। ১৯৬১ সালের সংস্কারে এই অঞ্চলে ভুমির সিলিং ধরা হয় ৫০০ একর। কিন্তু ঐ অঞ্চলে বড় বড় জোতে ছিল হাজার হাজার একর জমি। আইয়ুব খান তাঁর ফ্রেইন্ডস নট মাস্টার্স এ পলিটিক্যাল অটোবায়োগ্রাফি গ্রন্থে বলছেন, ‘পাঞ্জাবে ব্যবহারযোগ্য জমির শতকরা ৫০ ভাগ, উত্তরপশ্চিমসীমান্ত প্রদেশে শতকরা ৫০ ভাগের কিছু কম এবং সিন্ধুতে শতকরা ৮০ ভাগেরও উপর জমি কয়েক সহস্র অনুপস্থিত জমিদারদের দখলে ছিল।’ এবং এই বৃহৎ জোতদার ভূস্বামীরাই পাকিস্তানের অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতো। ভূমি সংস্কারের ফলে এদের এই আধিপত্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তা হলেও এই ভূমি সংস্কার যে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি তা এখনও সেখানে হাজার হাজার একর জমির মালিকানা দেখে বোঝা যায়। ভুট্টো পরিবার, নওয়াজ শরীফ কিংবা লেঘারী পরিবার এখনও এরকম বিশাল জোতদার।

তবে যতটুকু বাস্তবায়ন হয়, তাতেই এই সংস্কার পশ্চিম পাকিস্তান বিশেষত পাঞ্জাব অঞ্চলে শিল্পপুঁজি গঠন এবং শিল্পখাতে পুঁজি প্রবাহে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এই ভূমি সংস্কারের শর্তাবলী যা ছিল তাতে বলা হল, ৫০০ একর রেখে আর হাজার হাজার একর জমি সরকার বাজেয়াফত করে ক্ষতিপূরণ দেবে, তবে তা সর্বাধিক হবে যদি তা শিল্পখাতে বিনিয়োজিত হয়। এইভাবে কৃষি থেকে শিল্পের দিকে পুঁজি প্রবাহের একটা ক্ষেত্র তৈরি হল, তাকে উৎসাহিত করবার জন্য রাষ্ট্র নানাবিধ প্রণোদনার ব্যবস্থা করলো। আর পূর্ব বাংলায় প্রথম থেকেই বিপরীত গতি উৎসাহিত করা হয়েছে। এখানে উৎসাহ দেয়া হল উদীয়মান শিল্প ব্যবসা থেকে আইনীভাবেই কৃষিতে পুঁজি প্রবাহকে। ৬০ দশক পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে বাঙালী পাওয়া যায় হাতে গোণা। শিল্প প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ মালিকানা ছিল পাকিস্তানী বৃহৎ পুঁজিপতিদের। বাংলাদেশ আমলে সেগুলোই পরিত্যক্ত হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব হল।

৬০ দশকে পাকিস্তান উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড গ্রুপ এবং বিশ্বব্যাংক। শুধু সামরিক খাতেই যে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের বশ্যরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল তাই নয়, উন্নয়ন ক্ষেত্রেও পাকিস্তান হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই অঞ্চলে তাদের টেস্টকেস। সবুজ বিপ্লবের নামে উফশী, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, যান্ত্রিক সেচ এর উপর নির্ভরশীল আমদানিকৃত কৃষির পত্তন হয়, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কৃষির উপর বহুজাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা সম্প্রসারিত হয়। অবকাঠামো উন্নয়ন হিসেবে এবং ইউনিয়ন কাউন্সিলগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জেলা সদর ও আরও কিছু ভেতরে এবং বেশকিছু থানা পর্যন্ত রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়। ‘সবুজ বিপ্লব’ ও অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্য দিয়ে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণও ত্বরান্বিত হয়।

৬০ দশকে পশ্চিম পাকিস্তান বিশেষত পাঞ্জাব কেন্দ্রিক কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন ক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হয়। সারা পাকিস্তানের তুলনায় পাঞ্জাবে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। আর পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় সামগ্রিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়বরাদ্দ অনুপাত অনেক বেশি ছিল। পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রধান রফতানি পণ্য ছিল পাট। পাট থেকেই পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ আসতো। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তান বা পাঞ্জাব কেন্দ্রিক উন্নয়ন তৎপরতায়। এছাড়াও পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরকার যে রাজস্ব আয় করতো তার তুলনায় অনেক কম ব্যয় হতো এখানকার উন্নয়ন কর্মসূচিতে। আর অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের আয়ের তুলনায় ব্যয় হতো অনেক বেশি। সরকারি ব্যয়ের প্রধান ভাগীদার ছিল সামরিক বেসামরিক প্রশাসন সেখানে আবার ছিল অবাঙালী, বিশেষত পাঞ্জাবীদের আধিক্য।

আইয়ুব খান তাঁর আমলের শুরুতেই ‘ব্যুরো অব রিকন্সট্রাকশন’ (বিএনআর) গঠন করে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানমুখী সাংস্কৃতিক ‘পুনর্গঠন’এর উদ্যোগ নিতে থাকেন। এর রেকর্ড দেখলে বোঝা যায় যে, এই অঞ্চলের বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকে দালাল সংগ্রহ করা অন্তত দশকের প্রথম দিকে বেশ সহজই ছিল।।