Home » আন্তর্জাতিক » ক্ষমতালিপ্সা, বিরোধী নির্মূল দমন পীড়ন এবং বিভক্তির ফলাফল

ক্ষমতালিপ্সা, বিরোধী নির্মূল দমন পীড়ন এবং বিভক্তির ফলাফল

আবীর হাসান

egyptবিভক্তি আর অনৈক্যে ঝাঁঝরা কোন দেশের উদাহরণ বর্তমান বিশ্বে দিতে হলে যে নামটি উচ্চারিত হবে সেটি হলো মিশর। ইতিহাসঐতিহ্যসংস্কৃতিতে সমুজ্জ্বল দেশটির এই হতশ্রী দশা কেন হল এ প্রশ্ন অনেকেই করেন। কেউ কেউ প্রশ্ন করেন কী দরকার ছিল আরব বসন্তের ফুল ফোটানোর চেষ্টা করে? গণতন্ত্রের ফুল চাইতে গিয়ে কেন ফুটল বিষবৃক্ষের ফুল? এ প্রশ্নের একটিই উত্তর ঘটেছে কপট নেতৃত্বের কারণে। মোহাম্মদ মুরসী নামীয় এক বছরের প্রেসিডেন্ট গণতন্ত্রের মাজেজা বোঝেননি। বুঝেছিলেন সার্বভৌম ক্ষমতার অপব্যবহার করে দলীয়করণ তথা জঙ্গীবাদী রাষ্ট্র কায়েমের বিষয়টি। এ জন্য তিনি নিজের ক্ষমতা এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যা হোসনি মোবারকেরও কল্পনার বাইরে ছিল।

শুরুটা মুরসি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার দিন থেকেই। ওই দিনই তিনি বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ করেন নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নেন ডিক্রি জারি করে। বেশ ক’জন বিচারককে বরখাস্ত করেন এবং ব্রাদারহুডের অনুসারী নতুন বিচারক নিয়োগ দেন।

এরপর শুরু করেন সম্প্রীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এক সপ্তাহের মধ্যে তার অনুসারীরা কায়রোআলেকজান্দ্রিয়াসহ বেশ কটি শহর ও অন্যান্য অঞ্চলে সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের ওপর চড়াও হয়, গির্জা পুড়িয়ে দেয়। মুরসী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মানবিক পদক্ষেপও নেননি।

বিষয়টা এখানে শেষ হলেই ভালো হতো। কিন্তু মুরসি মিশর রাষ্ট্রের ধারণা ও মতাদর্শই বদলে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বিস্মৃত হয়েছিলেন তিনি ইসলামী কট্টরপন্থী হলেও নির্বাচিত হয়েছেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। তিনি পুরো মিশরীয় জনগোষ্ঠীর প্রেসিডেন্ট তো হয়ে উঠতে পারেনইনি বরং তিনি তার অনুসারী ও সমর্থকদের প্রেসিডেন্টই ছিলেন। আর চেয়েছিলেন ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। ফলে মিশরের আবহমান সংস্কৃতি, দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কাঠামো আর সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন তিনি। ব্রাদারহুডের সমর্থক নয় এমন সব ধর্মীয় গোষ্ঠীকেও ডাক দিয়েছিলেন তিনি উদারপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থীদের ‘নির্মূল’ করতে। প্রতিরোধ বা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা নয় একেবারে নির্মূল করারই ডাক দিয়েছিলেন তিনি এবং এমনকি ডেকে আনতে উদ্যোগী হয়েছিলেন অন্যান্য আরব দেশগুলোতে অবস্থানকারী ইসলামী গোষ্ঠীগুলোকেও।

বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ৬০টিরও বেশি দেশের ইসলামী কট্টরপন্থী সংগঠনকে আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছিলেন মুরসি। মিশরকে মুরসী ইসলামী সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে ক্লিন করতে চেয়েছিলেন মিশরকে যেখানে গণতন্ত্রী উদারনৈতিক কিংবা সেক্যুলার অথবা বিধর্মীরা থাকবে না। আর এটা তিনি গোপনে না করে প্রকাশ্যেই করতে চেয়েছিলেন। ডিক্রি জারি করে করে বাড়িয়ে চলেছিলেন নিজের ক্ষমতাকে আর জনগণের বাকস্বাধীনতা আর আইনি অধিকারকেও সীমিত করে ফেলেছিলেন। সেক্যুলার ২টি টেলিভিশন ও তিনটি পত্রিকা বন্ধ করে ৩টি নতুন টেলিভিশন চ্যানেল ও ২টি নতুন দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করে ব্রাদারহুড। একটি টেলিভিশন চ্যানেল তুলে দেয়া হয় আল কায়দার হাতেও। সেনাবাহিনীর সমন্তরালে জঙ্গি বাহিনী গড়ে তোলার জন্য যখন তিনি গাজা উপত্যাকার হামাসকে ডেকে আনেন এবং ট্রেনিং সেন্টার খোলার ব্যবস্থা করেন তখনই আসলে টনক নড়ে পশ্চিমা বিশ্বের।

কিন্তু ততোদিনে দেশের জনগণকে পুরোপুরি বিভক্ত করে ফেলেছে মুরসি। ব্রাদারহুডের সঙ্গে অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনগুলো মিলে সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্মূল করার কার্যক্রম শুরু করে। একেবারে দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায় মিশরীয় জনগণ। নিরুপায় হয়ে গত ৩০ জুলাই তামারোর আন্দোলনের ডাক দেয় মধ্যপন্থী বিরোধী মোর্চা।

গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করলে কী ভয়াবহ পরিণতি হয় তা প্রমাণ করলেন মুরসী। অবিশ্বাস, অনাস্থা আর অনিশ্চয়তাই এক বছরের মাথায় মিশরীয় জনসাধারণকে আবার রাজপথে নামিয়েছে। ঠেলে দিয়েছে সংঘাতের দিকে। এখনকার মিশরের পরিস্থিতিকে নাজুক বলা অত্যুক্তি নয়। কারণ বিভক্তির কারণে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছিল বিনিয়োগ আমদানি এবং পর্যটন শিল্পে। ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। কারণ সর্বত্রই ছিল মুরসী সমর্থকদের দাপট। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যবসা হাতিয়ে নেয়া, আদি ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ ও নির্যাতন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এমনকি তৃণমূল পর্যায়ের হস্তশিল্পী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও মুরসী সমর্থকদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। আর কেন্দ্রীয়ভাবে মুরসী চালাচ্ছিলেন দমনপীড়ন।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষমতাসীনদের এ রকম আচরণ একেবারে নতুন বা বিচিত্র নয়। কিন্তু অন্যান্য দেশে যা অনেক শাসক সময় নিয়ে করেন, মুরসী তা করেছেন স্বল্পতম সময়ে। এটা একটা রেকর্ড হিসেবে গণ্য হতে পারে। সর্বোপরি একটি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির জাতিকে বিভক্ত করে সংঘাতের পথে নিয়ে যাওয়াটাও একটা বিশেষ ব্যাপার। আর মুরসীর ক্ষমতাচ্যুতির একটা শিক্ষা নিঃসন্দেহে। শিক্ষাটা সেই সব শাসক ও তাদের মোসাহেবদের জন্য যারা ক্ষমতালিপ্সু এবং জাতিকে বিভক্ত করে, বিরোধীদের নির্মূল করে, স্বার্থোদ্ধার করতে চায়।

জাতিকে বিভক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে এরা জাতীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোলেও বিনষ্ট করে নয়, দ্বন্দ্বে জড়ায় আর নয়তো টুটি টিপে ধরে নিজেদের কাজ করার। অর্থ দিয়ে কিনে নিতে চায় ন্যায় ও ন্যায্যতাকে। এই ভীতি আর ‘পুরস্কার’ ব্যক্তি বা কতিপয়কে স্বল্পসময়ের জন্যই শাসককে স্বস্তি দিতে পারে। দিনের পর দিন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার প্রধান বা সর্বোপরি বংশবদ অধীনস্থ থাকে না। দ্বন্দ্ব লাগেই আর সেই দ্বন্দ্বের ফলে ক্ষীণ হয়ে আসে ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা। এর সঙ্গে জাতিগত বিভক্তি মিশরের মতো ‘তামারোর’ (বিদ্রোহ)-এর সৃষ্টি করে। যা প্রতিরোধের কক্ষমতা আর শাসকদের থাকে না। শেষের দিকে মুরসী যেমন দেশের কথা, দেশপ্রেমের কথা বলেছিলেন তেমনি অন্যসব শাসকও একই কথা বলেন, দাবি করেন উন্নয়ন ও শ্ঙ্খৃলা রক্ষার। কিন্তু বিভেদের যাঁতাকলে থাকা মানুষ সে সব আর বিশ্বাস করে না। ক্ষমতার ঘিমাখন খাওয়া সমর্থকরা তাদের স্বার্থ বাঁচাতে তৎপর হয়ে উঠলেও সেই প্রয়াস সফল হয় না। যে সব দেশের স্বৈরাচার নিজেদের বাঁচানোর জন্য অনুসারীদের পথে নামিয়েছিল কিংবা অনুসারীরা নিজের স্বার্থে পথে নেমেছে তারা নিস্ফলা ক্রোধই দেখিয়েছে। এই পরিণতিটা ক্ষমতালিপ্সুরা বুঝতে পারেন না। অথচ সাম্প্রতিককালে এ রকম উদাহরণ অনেক সৃষ্টি হয়েছে এবং হয়ে চলেছে। মিশরের তাহরির স্কয়ার আরব বসন্ত আন্দোলন থেকে নিয়ে এই সাম্প্রতিক তামারোর ঘটনাবলী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক সবিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিভক্ত একটি জাতির ঐক্য ফিরিয়ে আনা কঠিন। তবে যদি সফল হয় তাহলেলই ভালো। যতো দ্রুত এটা ভেঙেছে ততো দ্রুত যে ঐক্য ফিরবে না তা বলাই বাহুল্য। মিশরের পশ্চিমা মিত্ররা এখনো মুখ ফিরিয়েই আছে।।