Home » আন্তর্জাতিক » চমস্কির ওপরও নজরদারি

চমস্কির ওপরও নজরদারি

ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন থেকে ভাষান্তর

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Noam-Chomskyবারবার মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল প্রখ্যাত ভিন্নামতালম্বী এমআইটি অধ্যাপক নোয়াম চমস্কির ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে কি না। প্রতিবারই সংস্থাটি অস্বীকার করে আসছিল। কিন্তু অবশেষে সরকারের প্রকাশ করা নতুন একটি গোপন তারবার্তায় (ক্যাবল) প্রথমবারের মতো জানা গেল, সেই ১৯৭০এর দশকে যুদ্ধবিরোধী অবস্থা যখন তুঙ্গে ছিল, তখনই তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিল। কারণ চমস্কি ছিলেন ওই যুদ্ধের ঘোরতর বিরোধী। এতে আরো জানা গেছে, ল্যাঙলির আর্কাইভ ঝেড়ে ফেলার সময় চমস্কির নাম সিআইএ’র ফাইলে ঢুকে পড়ে। ফলে প্রশ্ন ওঠেছে, কখন ফাইলটি নষ্ট করা হয়েছিল বা কার হুকুমে তা করা হয়েছিল?

চমস্কির ওপর সিআইএ’র নজরদারির এই বিষয়টি জানা গেল ফ্রিডম অব ইনফরমেশন অ্যাক্টের (এফওআইএ) আওতায় ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) কাছে অনুরোধ করার প্রেক্ষাপটে। এই অ্যাক্টের আওতায় আগে কয়েকবারই সিআইএ’র কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংস্থাটির জবাব ছিল বরাবরই এক ও অভিন্ন: ‘আপনারা যা জানতে চেয়েছেন, তার কোনো হদিশ আমরা পাচ্ছি না।’ সিআইএ’র এই জবাব কখনো বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। কারণ ১৯৬০ ও ১৯৭০এর দশকে চমস্কি খোলাখুলিভাবে যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে চাচ্ছিলেন। আর ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সিআইএ যে ব্যাপকভাবে মার্কিনিদের ওপর গুপ্তচরবৃদ্ধি চালিয়ে চাচ্ছিল, তা সবার জানা ছিল। কিন্তু তবুও সংস্থাটি অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে যাওয়ায় অনেকে তাদের কথা বিশ্বাসও করেছিল।

এবার চমস্কির জীবনীকার ফ্রেড্রিক ম্যাক্সওয়েল সিআইএ ও এফবিআইয়ের মধ্যকার তারবার্তা বিনিময়ের রেকর্ডের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে এফবিআই নিশ্চিত করে যে সিআইএ’র ফাইলে চমস্কির অস্তিত্ব ছিল।

১৯৭০ সালের ৮ জুন তারিখ দেওয়া মেমোটিতে চমস্কির যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করে যুদ্ধবিরোধী অ্যাক্টিভিস্টদের আসন্ন উত্তর ভিয়েতনাম সফর সম্পর্কে এফবিআইয়ের কাছে আরো তথ্য চাওয়া হয়েছিল। সিআইএ’র জনৈক কর্মকর্তার লিখিত ওই মেমোতে বলা হয়েছিল, সফরটিতে ‘নোয়াম চমস্কির পৃষ্ঠপোষকতা’ রয়েছে। এতে এই সফরের সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকজন সম্পর্কে ‘যেকোনো তথ্য’ প্রদানের অনুরোধ করা হয়েছিল।

তারবার্তাটি পাওয়ার পর সেটি পাঠানো হয় মারকুইট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমারিটাস এবং এফবিআইসিআই সহযোগিতা ও তথ্য সংগ্রহবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যাথান থিওহারিসের কাছে।

তিনি বলেন, ‘১৯৭০ সালের জুনের যোগাযোগ নিশ্চিত করে যে সিআইএ চমস্কিকে নিয়ে একটি ফাইল খুলেছিল। ওই ফাইলে এফবিআইয়ের কাছে পাঠানো সংস্থাটির বার্তার একটি কপি এবং তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে চমস্কির ওপর এফবিআইয়ের প্রস্তুত করা রিপোর্টটি অন্তত ছিল।’

থিওহারিস বলেন, তারবার্তাটি এও প্রমাণ করে যে চমেস্কির ফাইলটি নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। তিনি জানান, ‘এফওআইএ’র আওতায় করা অনুরোধের জবাবে সিআইএ’র চমেস্কির ওপর কোনো ফাইল না থাকার কথা বলাটা নিশ্চিত করে যে কোনো এক অজ্ঞাত সময়ে চমস্কির ফাইলটি ধবংস করা হয়েছিল।’ এটাও উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে নথিপত্র ধবংস করা আইনগতভাবে বিশ্বাসঘাতকতার কাজ। ১৯৫০ সালের ফেডারেল রেকর্ডস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কোনো ধরনের নথিপত্র নষ্ট করার আগে জাতীয় আর্কাইভের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। সিআইএ’র দায়িত্ব হলো ‘ঐতিহাসিক মূল্যবান’ নথিপত্র সংরক্ষণ করা। থিওহারিস বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে চমেস্কির ওপর সিআইএর এক বা একাধিক ফাইল এই ধারার মধ্যে পড়ে।’ সিআইএ বিধি মেনেই চমস্কির ফাইল ধবংস করেছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হয়নি সংস্থাটি।

চমস্কি কি চিন্তা করছেন? তার কাছে যখন তার সিআইএ ফাইলের প্রমাণ উপস্থাপন করা হলো, তখন এই প্রখ্যাত ভাষাবিদ তার চিরচেনা নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বললেন, ‘অনেক সময় বোঝা যায় যে ক্ষমতার ব্যবস্থা তারা যেভাবে চিন্তা করে সেভাবেই তাদের ক্ষমতাকে সম্প্রসারণের চেষ্টা করে।’ যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো তিনি কি এখনকার গুপ্তচরবৃত্তি (সর্বশেষ এনএসএ ফাঁসের প্রেক্ষাপটে) কার্যক্রমে বিরক্ত নাকি ১৯৭০এর দশকের ব্যাপারে বেশি ভুগেছিলেন? তিনি এই বলে উড়িয়ে দিলেন যে আপেল আর কমলালেবুর মধ্যে তুলনা করার কোনো মানে নেই।

তিনি বলেন, “১৯৬০এর দশক এবং ১৯৭০এর দশকের প্রথমভাগে গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে যতটা না ভীতি ছিল তার চেয়ে বেশি আতঙ্ক ছিল স্থানীয় সন্ত্রাসী কার্যক্রম ‘কয়েনটালপ্রো’ নিয়ে। আর এগুলো প্রকাশ হওয়ার পর আগ্রহও উবে গেছে।” উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে এফবিআই অনুপ্রবেশ করে অন্তর্ঘাতীয় কার্যক্রম চালিয়ে সেগুলোর সর্বনাশ করত। এর নাম ছিল কয়েনটালপ্রো।

যাই হোক, সিআইএ চমেস্কির ফাইল ধবংস করায় বরং আরো জটিল প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে: ল্যাংসলির আর্কাইভ থেকে কে ফাইল গায়েব করেছিল? সিআইএ ইতিহাসের আর কোন কোন অধ্যায় অজানা থেকে গেল?

থিওহারিস বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কখন সিআইএ চমস্কির ফাইল ধবংস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং তারা কেন সেটা ধবংস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সিআইএ কেবল চমস্কির ফাইলই ধ্বংস করেনি। আর কতজনের ফাইল তারা ধ্বংস করেছে?’