Home » প্রচ্ছদ কথা » ‘প্রধানমন্ত্রী এক চুলও নড়বেন না’ – কিন্তু কার স্বার্থে

‘প্রধানমন্ত্রী এক চুলও নড়বেন না’ – কিন্তু কার স্বার্থে

হায়দার আকবর খান রনো

sheikh-hasinaপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বেন না। যেন এটি তার বিশ্বাসের অঙ্গ, আদর্শের অংশ। অবশ্য বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস বা আদর্শের কথা শুনলে হাসি পায়। যে সংবিধানের প্রতি তার এতো গভীর অবিচল আস্থার কথা তিনি ঘোষণা করছেন, সেই সংবিধান কিন্তু তিনি নিজেই কাটাছেড়া, সংযোজন বর্জন করেছেন। যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জোর গলায় বলছেন যে, তার প্রধানমন্ত্রীত্বের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেই সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারাটি কিন্তু তিনি নিজেই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাদ দিয়েছিলেন। নিজের হাতে বাদ দেয়া জিনিস যদি তিনি এখন আবার নিজের হাতে আবার জোড়া দিয়ে দেন, তাহলেই তো সমস্যার সমাধান এক মুহূর্তে হয়ে যায়। কিন্তু সে পথে তিনি যে যাবেন না, এ কথা তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন। অতএব রাজনৈতিক সঙ্কট যে হবেই তা বোঝাই যাচ্ছে। নির্বাচন যতো ঘনিয়ে আসবে, সঙ্কট ততো তীব্র ও ঘনীভূত হবে। তার পরিণাম কতোটা ভয়াবহ হতে পারে সে কথা প্রধানমন্ত্রী অনুমান করতে না পারলেও আমরা ঠিকই অনুধাবন করতে পারছি। যে অন্ধকারের শক্তির কথা তিনি বলছেন তার নিজেরই এমন ভূমিকা সেই অন্ধকারের শক্তিকেই আমন্ত্রণ জানাতে পারে বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ইস্যু হলো নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৯৯৬ সালে সংবিধানে এটি যুক্ত হয়েছিল। তখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। মাগুরার একটি উপনির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, এই অভিযোগের ভিত্তিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। সেদিন সেই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের মিত্র ছিল জামায়াতে ইসলাম। সেদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষেবিপক্ষে প্রচুর যুক্তি পাল্টা যুক্তি উঠেছিল। তর্কবিতর্ক জমে উঠেছিল। ভাবতে অবাক লাগে, সেদিন বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে যে সকল যুক্তি দিয়েছিল এখন আওয়ামী লীগ সেই গুলিই ব্যবহার করছে। আর সেদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে আওয়ামী লীগ যে সকল যুক্তি হাজির করেছিল এখন বিএনপির জন্য সেগুলিই হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। চমৎকার। এই সকল দলের ভোল পাল্টাতে বেশি সময় লাগে না, আর অতীতকে (এবং তাও খুব বেশি অতীত নয়) ভুলে যেতে, ভুলিয়ে দিতেও বিন্দুমাত্র বাধে না।

শেখ হাসিনা সংবিধান ও সংসদের দোহাই পেড়েছেন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই যা খুশি করা যায় না। হয়তো আপাতত আইনসিদ্ধ হতে পারে। কিন্তু ন্যায়নীতির বিচারে তা টেকে না। জনতার রায়েও তা বাতিল হতে পারে। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে জনতার রায়ই আসল। ধরা যাক, চতুর্থ সংশোধনীর কথা। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে সংবিধান মোতাবেকই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এটি পাস হয়েছিল। আইনগত দিক দিয়ে কোন ত্রুটি ছিল না। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনী ছিল গণতন্ত্র বিরোধী। তাই টেকেনি। এখন ১৫তম সংশোধনী যেভাবে পাস হয়েছে তাও গণতন্ত্র বিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। এটাও যে শেষ পর্যন্ত টিকবে না তাও নিশ্চিতভাবে বলা চলে। অতএব ১৫তম সংশোধনীর পরবর্তী সংবিধান নিয়ে জেদ ধরা এবং তাকে বিশ্বাস ও আদর্শের জায়গায় নিয়ে গিয়ে সগর্ব উচ্চারণ (‘এক চুলও নড়বো না’) জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনাবোধের জায়গায় কোনো দাগই কাটতে পাড়ে না। বরং মনে হয় যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় আকড়ে থাকার জন্য তিনি যেন অজুহাত খাড়া করছেন।

১৫তম সংশোধনী তিনটি কারণে গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত. এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের পরিপন্থী। দ্বিতীয়ত. সংবিধানের ৭ () এবং ৭ () ধারায় বলা হয়েছে যে, সংবিধানের প্রায় অর্ধশত ধারা উপধারা চিরস্থায়ীভাবে অপরিবর্তনীয় (তার মধ্যে ‘ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম’ অন্যতম)। এমনকি পার্লামেন্টের সকল সদস্য এক সঙ্গে ভোট দিলেও অথবা গণভোটের মাধ্যমেও তা পরিবর্তন করা যাবে না। কেবলমাত্র ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থায় এমন বিধান থাকতে পারে। তৃতীয়ত. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি তুলে দেয়া।

আমরা আপাতত এই তৃতীয় পয়েন্ট সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলবো। প্রথমত. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করা হবে এমন কোনো অঙ্গীকার বা সামান্যতম কথাবার্তাও কখনো শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ বলেনি। নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল না। ১৫তম সংশোধনীর আগে সংশোধনীর জন্য সাজেদা চৌধুরীকে প্রধান করে যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, সেখানেও এমন প্রস্তাব কেউ দেননি। কোন দল, ব্যক্তি বা কোন মহল থেকে এমন দাবি কখনো উত্থাপিত হয়নি। হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগ নিজেই সংশোধনী এনেছিল এবং দ্রুততম সময়ে পাস করিয়ে নিয়েছিল। সম্ভবত জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে এটা টের পেয়ে আওয়ামী নেতৃত্ব নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ এড়িয়ে অন্য কোন ভাবে ক্ষমতায় ফিরে আসা যায় কিনা, এই পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে এই সংশোধনী এনেছিল। যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, দুটি কথা। এক. হাইকোর্টের রায়। দুই. ২০০৭২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা। দুইটির কোনটিই তার পক্ষে সাফাই হতে পারে না।

হাইকোর্টের রায়ের যে অংশটি প্রথমে ঘোষিত হয়েছিল তাতে বলা ছিল যে, আগামী দুটি নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রধান বিচারপতি অবসরে যাওয়ার অনেক পরে তিনি রায়ের যে পূর্ণাঙ্গ অংশ প্রকাশ করেন সেটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির রায় দেয়ার অধিকার থাকে না। আমরা মনে করি, আগামী দুটি নির্বাচন অন্তত দলীয় সরকারের অধীনে না হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া উচিত।

১৯৯৬ সাল এবং ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে মানতে চায়নি তখনকার প্রায় সকল বিরোধী দল। সেই সময় আওয়ামী লীগ তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ফলে ফখরুদ্দিনের সরকারের আবির্ভাব। শেখ হাাসিনার ভুলে গেলে চলবে না যে, তখন কিন্ত তিনিই ফখরুদ্দিনের সরকারকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘এই সরকার হচ্ছে আন্দোলনের ফসল।’

যখন যেমন তখন তেমন কথা বলার রোগটি আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদদের। শেখ হাসিনাও ব্যতিক্রম নন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দৃঢ়তার সঙ্গে বলছেন, ‘এক চুলও নড়বেন না’, তা কিন্তু সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে নেয়নি। এর মধ্যে অশুভ ইঙ্গিত তারা পেয়েছেন। এক তরফা নির্বাচনের কৌশল তিনি নিয়েছেন।

এতে কি সঙ্কটের সমাধান হবে? শেখ হাসিনা অবশ্য তুড়ি মেরে বলেছেন, কোন সঙ্কট নেই, কোন সঙ্কট হবে না। বাস্তবে একথা কেউ মেনে নেবে না। সঙ্কট আছে, ঘনীভূত হচ্ছে। শেখ হাাসিনার অনমনীয় মনোভাব সঙ্কটকে কোথায় নিয়ে যাবে তা আমরা জানি না। তবে তা যে গণতন্ত্রের জন্য মোটেও শুভ নয়, সে কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।।