Home » অর্থনীতি » বিনিয়োগের ব্যর্থতায় রিজার্ভের সাফল্য

বিনিয়োগের ব্যর্থতায় রিজার্ভের সাফল্য

শওকত হোসেন মাসুম

reserveসত্যি সত্যিই টাকা নিয়ে বসে আছে ব্যাংক। ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে। অথচ ঋণ নেওয়ার মতো উদ্যোক্তা নেই। দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। ঋণের চাহিদা নেই। উদ্যোক্তারা এখন ব্যাংকের পিছনে ছুটছেন না, ব্যাংক ছুটছে উদ্যোক্তার পিছনে।

মূলধনের কোনো অভাব নেই। অভাব বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও উৎসাহ। এরকম এক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিরাট এক সাফল্য প্রচার করলো। আর সেই সাফল্য হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৬শ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণত বলা হয়, ৩ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রিজার্ভ থাকাটা অর্থনীতির জন্য ভাল। কিন্তু এখন ৫ মাসেরও বেশি সময়ের রিজার্ভ আছে বাংলাদেশে। দক্ষিণ এশিয়ায় এর চেয়ে বেশি রিজার্ভ আছে একমাত্র ভারতের।

বরাবরই বাংলাদেশে কাঙ্খিত মাত্রার তুলনায় বিনিয়োগ কম হয়। তবে বর্তমান সময়ে বিনিয়োগ মন্দা অনেক তীব্র হয়েছে। বলা যায়, এই সরকারের পুরোটা সময় জুড়েই ছিল বিনিয়োগের মন্দার কাল। তবে সবচেয়ে দুরাবস্থা ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতি। এই দুরাবস্থা কাটাতে সরকারের কাছে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এর ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) আয়তন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবায়নের গুণগত মান নিয়ে সন্দেহের কোনো সুরাহা হয়নি।

বিলবোর্ডের নয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান বলে, গত সাত বছরের মধ্যে দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এখন সর্বনিম্ন। ২০১২১৩ অর্থবছরের হিসাবে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ১৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এর আগে এর চেয়ে কম বিনিয়োগ ছিল ২০০৫০৬ অর্থবছরে, ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

আগেই বলেছি, দেশের বিনিয়োগ পরিসংখ্যানকে কোনো রকম ঠেকা দিয়ে রেখেছে, সরকারি বিনিয়োগ। এডিপির বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন বাড়িয়ে জাতীয় বিনিয়োগের পরিসংখ্যানকে ঠিক রাখা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেশের জাতীয় বিনিয়োগ এখন ২৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি বিনিয়োগের হার ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

অথচ বেসরকারি খাত নির্ভর প্রবৃদ্ধি অর্জন হচ্ছে সরকারের ঘোষিত নীতি। ৬ষ্ঠ পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় এই লক্ষ্যের কথা বলা আছে। বর্তমান শিল্প নীতিতেও বেসরকারি খাত নির্ভর শিল্পায়নের কথা বলা আছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ সরকারের সময়ে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে।

এখন কেউ যদি বিনিয়োগ নেই আর রিজার্ভ বৃদ্ধির তথ্যের মধ্যে একটা মিল খুঁজে পান তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। যদিও রিজার্ভ বাড়ার তথ্য বিলবোর্ডে দেখা গেছে, কিন্তু বিনিয়োগ কমার তথ্য অর্থনৈতিক সমীক্ষার মধ্যেই থেকে গেছে।

২০০৯ সালে প্রথম বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির কথা তিনি প্রথম বাজেট বক্তৃতায়ও উল্লেখ করেছেন। বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই তিনি ২০০৯ সালের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তাবায়ন অংশে বলেছেন, ‘বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি, তখনকার স্থবির ২৪ শতাংশ থেকে অন্তত ৩০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া।’ কিন্তু কেন বিনিয়োগ এই পর্যায়ে বাড়লো না তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা অর্থমন্ত্রী বাজেটে দেননি। তবে বর্তমানে বিনিয়োগ কেন কমছে তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান বছরে নির্বাচনী হাওয়ার কারণে বেসকারি বিনিয়োগকারীরা কিছুটা ইতস্তত করছে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ হয়তো কিছুটা হ্রাস পাবে।’ এই একটি লাইন বলেই অর্থমন্ত্রীর বিনিয়োগ ব্যর্থতার দায় সেরেছেন।

এবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রসঙ্গ। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও জমছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ। এই সাফল্য এসেছে মূলত ব্যর্থতা থেকে। চারটি উৎস থেকে একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয় হয়। যেমন, রপ্তানি, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক সাহায্য। চারটি উৎসের মধ্যে গত অর্থ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২২ শতাংশ, রেমিট্যান্স বেড়েছে সাড়ে ১২ শতাংশের বেশি, বেড়েছে সাহায্য এবং বিদেশি বিনিয়োগ। অন্যদিকে গত অর্থবছরে আমদানি বেড়েছে মাত্র দশমিক ৮৮ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে পুঁজি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অথচ এর আগের অর্থবছরেই আমদানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫২ শতাংশ। বস্তুত এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কোনো চাহিদাই নেই।

বিনিয়োগ নেই, আমদানি নেই, অলস টাকার পাহাড় গড়ছে ব্যাংকগুলোএ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। প্রশ্ন হচ্ছে কেন বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহ পাচ্ছেন না। সরকারের শুরুর দিকে অবকাঠামো, বিশেষ করে গ্যাস সংকটকে বিনিয়োগের বড় বাধা বলে মনে করা হচ্ছিল। এর বাইরে নীতির ধারাবাহিকতার অভাবকে সবসময়ই দায়ী করা হয়ে থাকে।

তবে এখন বিনিয়োগকারীরা হাত গুটিয়ে আছেন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে। সামনে অনিশ্চিত সময়। কি হবে কেউ জানে না। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংঘাত ও সংঘর্ষের কারণে ব্যবসা বাণিজ্যের গতি এমনিতেই কমে গেছে। বিশেষ করে নানা ধরণের ভোগ্য পণ্যের খুচরা ব্যবসায়ীরা পণ্য সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল। অনেকেরই বিক্রি কমে গেছে। তখনই সবাই জানতেন সামনে আরও দুর্দিন। ফলে হাত গুটিয়ে নিতে খুব বেশি সময় নিতে হয়নি অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের।

অনিশ্চয়তা নির্বাচন নিয়ে, অনিশ্চয়তা ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে। এরকম এক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগে কেউ এগিয়ে আসবেন না এটাই স্বাভাবিক। তার উপর সবার স্মৃতিতেই আছে সামরিক বাহিনী সমর্থিত সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার স্মৃতি। এর ফলে বিনিয়োগে আগ্রহীর সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার কথা। পাশাপাশি আরও একটি শঙ্কা আছে। সেটি হচ্ছে বাইরে অর্থ চলে যাওয়া। মালয়েশিয়া বা কানাডায় কত টাকা ডলার হয়ে চলে যাচ্ছে সে হিসাব কারো কাছেই নেই। কিন্তু সবাই জানেন কানাডায় কারা গেছেন, এর মালয়েশিয়ায় কে গিয়েছিলেন। দুই বছর যদি পালিয়ে থাকতে হয়, তাহলে একটা ব্যবস্থা করে রাখাই তো ভাল।।

১টি মন্তব্য

  1. দুই বছর যদি পালিয়ে থাকতে হয়, তাহলে একটা ব্যবস্থা করে রাখাই তো ভাল।
    শেষের বাক্যটা অসাধারন হইছে মাসুম ভাই।