Home » শিল্প-সংস্কৃতি » বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড

বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড

তারুণ্য আর মেধার অপূর্ব সমন্বয়

আদর রহমান

beasts-of-the-southern-wildবড় বাজেট, ধুন্ধুমার অ্যাকশন, বিরাট স্টার কাস্ট, কিংবদন্তি নির্মাতা কিংবা জটিল পলিটিক্যাল ড্রামা ঘারানার গল্প কিছুই ছিল না এ ছবিতে। তবুও বছর শেষে দেখা গেল বাঘা বাঘা নির্মাতাদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে নবীন পরিচালক বেন জেটলিনের ‘বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড’ ছবিটি। তেমন বিশেষ কিছুই না থাকলেও এ ছবিতে ছিল কাঁচা হাতের কিছু দৃষ্টিনন্দন নৈপুন্যযা মুগ্ধ করেছে সবাইকে। ব্যবসায়িক পরিভাষায়, লিংকন, আর্গো, লাইফ অব পাই কিংবা সিলভার লাইনিংস প্লেবুকের মতো আর্থিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি ছবিটি। কিন্তু বাজেটের হিসেবে এ ছবির আয় দেখলে বোঝা যায়, এটা সাফল্য পেয়েছে নিঃসন্দেহে। আর্থিক সাফল্যের দিকটা বিবেচনায় পরে আনলে বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ডের মতো সফলতা গেল বছর পায়নি কোনো ছবিই। কিন্তু কিভাবে? এসব জানার আগে জেনে নেয়া যাক এ ছবির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো।

বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড’ ছবিটি নির্মাণের পেছনে নেই কোনো গুরুগম্ভীর তত্ত্ব। লুসি অ্যালিবারের লেখা ছোটগল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই লেখা হয় এ ছবির চিত্রনাট্য। লেখিকা লুসি অ্যালিবার এবং নির্মাতা বেন জেটলিন লেখেন এ ছবির চিত্রনাট্য। পুরো ছবির গল্প লেখা হয়েছে ৬ বছর বয়সী হাশপাপিস এবং তার বদমেজাজী বাবা উইঙ্ককে নিয়ে। তাদের জীবনের নানা সংগ্রাম, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকা, ছোট্ট হাশপাপিসের স্বপ্নের দুনিয়া সবকিছু এ ছবিতে দেখানো হয়েছে খুবই সহজভাবে। উপস্থাপনে সহজতা ছিল, কিন্তু এর সঙ্গে মেশান ছিল অন্য রকম এক শৈল্পিকতা। এ শৈল্পিকতাকে নির্মাতা কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার করে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেননি। ছবিতে নির্মাতা তার শৈল্পিকতাকে স্বপ্নের মতো এঁকেছেন। বাজেটের সীমাবদ্ধতা থাকার পরও নিজের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সমঝোতা করেননি বেন জেটলিন। অনেক নির্মাতাই আছেন, যারা নিজের প্রথম ছবিতে এতটা দুঃসাহস দেখানোর কথা কল্পনাও করতে পারেননি। সেখানে ব্যতিক্রম বেন জেটলিন। নতুন হওয়া সত্ত্বেও কোনো দক্ষ অভিনেতাঅভিনেত্রীর নেমভ্যালু ব্যবহার করতে নারাজ ছিলেন তিনি। তাই শত বারণ সত্ত্বেও নিয়ম ভেঙে নিজের মতো করেই নিজের স্বপ্ন বোনা শুরু করলেন। আর নিয়ম ভাঙার দলে ভিড়লে যা হয়, তাই হলো জেটলিনের সঙ্গে। বিশ্ব তাকে চিনলো এক ‘পাগলা’ নির্মাতা হিসেবে। তা না হলে প্রথম ছবি দিয়েই গতানুগতিক ধারা ভেঙে অস্কার আসরে পৌঁছে যাওয়া তো সহজ কথা নয়।

এবারের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড আসরে সেরা ছবির তালিকায় মনোনীত হয়েছিল বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড। এ ছবিকে লড়াই করতে হয়েছে বিগ বাজেটের নিখুঁত ছবি ‘লাইফ অব পাই’, পলিটিক্যাল থ্রিলার ‘আর্গো’, ‘জিরো ডার্ক থাটি’, বড় স্টার কাস্টসমৃদ্ধ ছবি ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’ ‘লে মিজারেবলস’, বর্ষীয়ান নির্মাতা মিকায়েল হ্যানেকের ‘আমার’ আর ব্যাপক আর্থিক সফলতা পাওয়া ছবি ‘জ্যাঙ্গো আনচেইল্ড’র সঙ্গে। শেষমেশ ছবিটি অস্কার জিততে না পারলেও নবীন হিসেবে স্টিভেন স্পিলবার্গ, কুয়েন্টিন টারান্টিনো, অ্যাং লি, ক্যাথেরিন বিগেলো, মিকায়েল হ্যানেকের সঙ্গে লড়াই করার যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, তা তাকে বোদ্ধাদের দৃষ্টিতে সব হিসাবের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে।

শুধু নির্মাতার গুণকীর্তনেই শেষ নয়। এ ছবির শিল্পীদের যে দুর্দান্ত অভিনয়, তাকে ব্যাখ্যা করার সঠিক ভাষা ছিল না বড় বড় চলচ্চিত্র সমালোচকের কাছেও। হাশপাপিস চরিত্রের জন্য ৬ থেকে ৯ বছরের মধ্যে এক মেয়ের খোঁজ করছিলেন নির্মাতা বেন জেটলিন। সময়টা তখন ২০০৮ সাল। সে সময় কয়েক হাজার শিশুর ভেতর থেকে জেটলিনের নজর কাড়ে কুভেনঝানেই ওয়ালিস। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৫। কিন্তু এরপরও তুখোড় অভিনয় দক্ষতার গুণে সে বনে গেল হাশপাপিস। অভিনয় জীবন শুরু করতে না করতেই গড়ে ফেললো ওয়ার্ল্ড রেকর্ডও। অস্কার আসরে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়া সবচেয়ে কম বয়সী অভিনেত্রীর রেকর্ড গেল ওয়ালিসের কাছে। এরপর খোঁজ শুরু হলো হাশপাপিসের বাবা উইঙ্কের। এখানেও নতুন মুখ দরকার নির্মাতার। তাই অডিশন আবার শুরু। কিন্তু এবার আর অডিশনে কাজ হলো না। বেন জেটলিন উইঙ্ক হিসেবে বেছে নিলেন এক বেকারির মালিককে। ডিউইট হেনরির কোনো অভিনয় জ্ঞান ছিল না, ছিল না অভিনয়ের আগ্রহও। কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোর কারণেই উইঙ্ক চরিত্রে কাজ করা হেনরির। সান ডিয়াগো রিডারকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে অভিনয় প্রসঙ্গে হেনরি বলেন, ‘হ্যারিকেন ক্যাটরিনার সময় আমি গলা পানির মধ্যে ছিলাম। এ ছবিতে উইঙ্কের যে সংগ্রাম, তেমনটা আমি বাস্তব জীবনেও করেছি। আমার সেই অভিজ্ঞতাকে আমি যেমন এ চরিত্রের ভেতর ঢেলে দিয়েছি, আমার জায়গায় বাইরের কোনো অভিনেতা হয়তো এমনটা প্রকাশ করতে পারতো না।

এবার বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড ঘিরে বোদ্ধাদের আলোচনাসমালোচনায় আসা যাক। প্রতিটি ছবির মতো এটিকে ঘিরেও তর্কবিতর্কের অভাব ছিল না। কারো দৃষ্টিতে এ ছবি ছিল বছরের সেরা, কারো কাছে ছিল মেধার অপচয় মাত্র। রোটেন টম্যাটোস ওয়েবসাইটে বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড পেয়েছে ৮৬ শতাংশ ফ্রেশ রেটিংস। সেখানে জমা হওয়া ১৪৪টি রিভিউয়ের মধ্যে ১২২টি ছিল এ ছবির পক্ষে এবং বাকিগুলো নেতিবাচক রিভিউ। মেটাক্রিটিক তাদের ৪১টি রিভিউ পর্যবেক্ষণ করে এ ছবিকে ১০০তে দিয়েছে ৮৬। দ্য বিস্টস অব সাউদার্ন ওয়াইল্ডকে সবচেয়ে বড় সম্মাননা দিয়েছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। এ পত্রিকার চলচ্চিত্র সমালোচক এ ও স্কট ছবিটিকে ২০১২ সালের ক্রিটিকস পিক তালিকার শীর্ষে রেখেছে। বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড ছবিকে ডেনভার পোস্টের সমালোচক লিসা কেনেডে এ ন্যাচারাল মিস্ট্রি মিউজিয়াম বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর দ্য রিয়েল ডিলের স্যাম সেলস বলেছেন, বিস্টস হলো এমন একটি ছবি যা দেখতে এখনো মানুষ সিনেমা হলে যায়। তবে শিকাগো ট্রিবিউনের মাইকেল ফিলিপসের দৃষ্টিতে এ ছবি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ছবির চরিত্র এবং তাদের কঠিন জীবন দেখে বিনোদিত হওয়ার মতো কিছুই ছিল না। বরং ফিলিপসের মতে সিনেমা দেখতে গিয়ে ছোট্ট মেয়ে এবং তার বাবার জীবন সংগ্রাম দেখে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়েছে তার! একই কথা বলেছেন লেখক এবং অ্যাক্টিভিস্ট বেল হুকসও। তার ভাষায়, এক ধরনের পরোক্ষ দুর্ধর্ষতা আর নৃশংসতা ছিল এ ছবিতে, যা পীড়াদায়ক। তবে সব তকর্বিতর্ককে ছাপিয়ে গেছে একটি মন্তব্যই। পিপল ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ডকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন স্পেকটাক্যুলার বলে মন্তব্য করেছেন। তখনই বোঝা গেছে নবীন নির্মাতার চেষ্টা সফল হয়েছে।

মাত্র ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এ ছবি মুক্তি পায় গেল বছরের জুনে। প্রথমে ইউরোপআমেরিকার কয়েকটি রাজ্যে ছোট পরিসরে ছবিটিকে মুক্তি দেয়া হয়, এরপর আস্তে আস্তে বিশ্বব্যাপী মুক্তি পায় বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড। এ পযন্ত ছবিটি আয় করেছে ১৯ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গেল বছরের সেরা ছবিগুলোর মধ্যে বিস্টস অব সাউদার্ন ওয়াইল্ড’র আয় সবচেয়ে কম থাকলেও পদক আর সম্মাননা জেতার দিক থেকে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই এটি। কান ফেস্টিভ্যাল, ব্ল্যাক বিল অ্যাওয়ার্ড, লস অ্যাঞ্জেলস ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন আসর থেকে মোট ৮৩টি পদক জিতেছে ‘বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড।’ সব মিলিয়ে একঝাঁক নতুনের এই প্রথম প্রচেষ্টাকে দুঃসাহসই বলা হোক বা মেধার যথার্থ বহিঃপ্রকাশ দুটোই বেশ ভালো যায় ‘বিস্টস অব দ্য সাউদার্ন ওয়াইল্ড’র সঙ্গে।।

সৌজন্যে সিল্ক রুট