Home » রাজনীতি » মহা-আতঙ্ক সৃষ্টিকারী সরকারি অবস্থান

মহা-আতঙ্ক সৃষ্টিকারী সরকারি অবস্থান

আমীর খসরু

cartoon-1রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা আর তার আত্মীয়স্বজন ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কতো বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়’ শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ২০৯’

তড়িঘড়ি করে ১৮ আগস্টে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য থেকে দুটো বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। এক. সরকারই রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সঙ্কটের সমাধান চায় না। দুই. সামনের নির্বাচনটি তারা করতে চায় একক এবং মূলত একদলীয়। দুইয়ে মিলিয়ে যে সত্যটি বেরিয়ে এসেছে তাহলো সামনের দিনগুলো ভয়াবহ সংঘাত আর সঙ্কটের। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বেন না তিনি। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরা তাদের অবস্থানে অনঢ়। প্রধানমন্ত্রী এও বলেছেন, সংবিধানে যা যা লেখা আছে তাই তিনি করবেন।

তাহলে প্রশ্ন উঠে, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার যে বিধান ছিল তা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংশোধন করা হলো কেন? সংশোধনীর আগে তো সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ঠিকই ছিল। আওয়ামী লীগের গুটি কয়েক বাদে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে আমজনতা পর্যন্ত সবাই ওই সংশোধনীর আগে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া আগামী নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হতে পারে না। এমনকি মহাজোটের শরীক দলগুলোর অধিকাংশই তখন প্রধানমন্ত্রীর ওই সংবিধান সংশোধনীর বিরোধিতা করেছিল। তাছাড়া আদালতের যে রায়ের কথা প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষেত্রে হরহামেশা উচ্চারণ করেন সে রায়েও তো বলা হয়েছিল, আরো দুটো মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান রাখা যেতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় সব মানুষই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে।

প্রধানমন্ত্রী যে সংবিধানের কথা বলছেন, তা তো সংশোধিত সংবিধান। প্রধানমন্ত্রী এও বলছেন, জনগণ তাদের ভোট দিয়েছে, ম্যান্ডেট দিয়েছে। দিয়েছে এ কথা কেউ অস্বীকার করছে না। কিন্তু নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী কি এ কথা একটি বারের জন্যও উচ্চারণ করেছিলেন যে, তিনি নির্বাচিত হলে সংবিধানে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করবেন? তিনি কি বলেছিলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পুরো পথ পদ্ধতিকে লণ্ডভণ্ড করে দেবেন? তিনি কি বলেছিলেন, ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী ও পাকাপোক্ত করার মানসে যাবতীয় ব্যবস্থাদি গ্রহণ করবেন? তিনি কি এও বলেছিলেন, সংবিধানকে তিনি এমন ভাবে পরিবর্তন করবেন যাতে পুরো বিষয়টিই তার পক্ষে যায়? এর একটি কথাও তিনি তখন বলেননি। তিনি বরং যা বলেছিলেন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা ছিল দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, ঘরে ঘরে চাকরি ইত্যাদি নানা মন ভোলানো কথা। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে তখন সুস্পষ্টভাবে এও বলা হয়েছিল যে, (এর ৪ দফা) ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্ঠাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা হবে। একটি সর্বসম্মত আচরণবিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’

কিন্তু এখন যা বলা হচ্ছে এবং ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দিন থেকে ক্ষমতাসীন সরকার যেসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে তার সবগুলোই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সোজা কথায় ভোটারদের অর্থাৎ জনগণের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গের কাজগুলোই তারা করছেন।

দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিটেন্ডারবাজি, ছাত্রলীগযুবলীগের তাণ্ডব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের বিষয়গুলোর হালহকিকত জনগণ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছেন। আরো উপলব্ধি করতে পারছেন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভয়াল রূপ। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বিরোধী দলগুলোকে ছুঁয়ে এখন যারা স্বাধীনভাবে কথা বলেন এবং এর পক্ষে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন তাদেরও ছুঁয়েছে। ছুঁয়েছে সংবাদ মাধ্যমকে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে। কাকে, কোন পক্ষকে নয়? রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সাধারণ মানুষের জানমালে পর্যন্ত হাত দিয়েছে। পুলিশর‌্যাব এখন যাকে তাকে, যখন তখন বিনা কারণে আটক করছে, উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এক সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হতো, এরপর বলা হতে লাগলো তথাকথিত ক্রসফায়ারের কথা। এর সঙ্গে যুক্ত করেছে গুম নামক আতঙ্কের শব্দটি। এখন কেউ বাড়িতে দেরিতে ফিরলেই স্বজনরা এই দুশ্চিন্তা প্রথমই করেন স্বজন তার ফিরে আসবে কিনা? এমনই এক আতঙ্কের পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে আইন বহির্ভূত কর্মকাণ্ড করার জন্য। আর উদ্দেশ্য মহা আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে জনমনে এমন এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে কেউ আর সত্য কথাটি বলার সাহস না পায়।

আগে থেকেই পুরো সমাজ জুড়ে এক ধরনের শঙ্কা ছিল দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই শঙ্কা দ্রুতই আতঙ্কে রূপ নেয়। অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর উপরে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য মানুষকে আতঙ্কের শেষ সীমানায় পৌঁছে দিয়েছে। মানুষ শঙ্কিত, আতঙ্কিত তার প্রিয় মাতৃভূমির ভবিষ্যত আর প্রিয় সন্তানদের অনিশ্চয়তা নিয়ে।

আর এসবই করা হচ্ছে শুধুমাত্র ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদী এবং চিরস্থায়ী করার জন্য। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই প্রচেষ্টা আগেও অনেকে অনেকবার নিয়েছে। ইতিহাস জানান দিচ্ছে, ওই সব উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টাই শোচনীয় এবং করুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস এমনই যে কেউই ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না।।