Home » রাজনীতি » রাজনীতিতে চুল তত্ত্ব এবং নয়া দমন-পীড়নের অপেক্ষা

রাজনীতিতে চুল তত্ত্ব এবং নয়া দমন-পীড়নের অপেক্ষা

আবীর হাসান

chul-totwoপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার সোজাসুজি জানিয়ে দিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তিনি মেনে নেবেন না এবং সমঝোতার মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের পথেও তিনি যাবেন না। ১৮ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন। এটা যে ক্ষমতাসীনদের নতুন বক্তব্য তা নয়, কিন্তু এই বক্তব্যের মধ্যদিয়ে সমঝোতার আশা যারা করছিলেন তাদের আশার সে জায়গাটুকু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আবার বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ২৪ ঘন্টার মাথায় এসে তার জবাব দিলেন। তিনি বলেছেন, ‘আন্দোলনের বাতাসে চুল তো থাকবেই না, অস্তিত্বও যাবে।’ তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নেয়ার দাবি উত্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র আন্দোলনেরও হুমকি দিয়েছেন। এতোদিন নানা তত্ত্ব নিয়ে আলাপআলোচনার কথা সবাই শুনেছে। কিন্তু ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল চুল তত্ত্বে নেমে পড়েছেন। তারই সঙ্গে জনমনের শঙ্কা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। জনগণ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যদিয়ে এই সঙ্কেতই পেয়েছেন যে, সরকার এবার সীমাহীন দমনপীড়নের পথে যাবে।

১৬ আগস্ট ক্ষমতাসীন দলের ভাষ্য হচ্ছে: ‘ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নেবেন তা একাগ্রচিত্তে সবাইকে মেনে নিতে হবে।’’ আসন্ন নির্বাচন নিয়েই একথা বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একথা বলেন তিনি। আওয়ামী লীগের দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই ভালো বলেছেন তিনি। কিন্তু নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যারা তাদের চিত্তে তো এখন একাগ্রতা নেই। সবার জন্য সমান সুযোগের অবস্থা এবং ব্যবস্থা থাকলে ন্যায্য এবং ন্যায়ের ব্যাপারে সন্দেহ না থাকলে হয়তো বিরোধী দলীয়রা এবং তাদের সমর্থক জনসাধারণ একাগ্রচিত্তেই মেনে নিতো প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। তবে কেউ কেউ যে মানছে না তা নয়। মানছে নির্বাচন কমিশন। তবে নির্বাচন কমিশনই তো নির্বাচনের সর্বেসর্বা নয় (হতে পারত কিন্তু হয়নি)। তাদেরকে বলাও হচ্ছে না বলা হচ্ছে বিরোধী দলকে যারা সংশোধিত সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনে যেতে রাজি নয় এই সরকারকে সংসদকে বহাল রেখে অথবা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচিত (!) অন্তবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোট চাচ্ছে নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। ওই ব্যবস্থা না হলে তারা নির্বাচনে যাবেন না এবং নির্বাচন করতেও দেবেন না। বিরোধী দলীয় নেতারা বার বার একথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ক্ষমতাসীনদের বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছেন তারা। তবে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সর্বশেষ ভাষ্য হচ্ছে নির্বাচনে লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টির জন্য নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিলে আন্দোলন থেকে বিরত থাকবেন তারা। এটাও তিনি বলেছেন ১৩ আগস্ট তারপর ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে একাগ্রচিত্তে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত (অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন) মেনে নেয়ার নসিহত অবদমনের নতুন কার্যকারণ তৈরি করেছে।

কারণ প্রধানমন্ত্রী নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন। তিনি এবং তার দলের অন্যান্য নেতারা বলছেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আসতেই হবে। কিছুদিন আগে আলোচনার আহ্বান জানানো হতো এখন আর সে কথা ক্ষমতাসীনরা বলেন না, বলেন বিরোধী দলীয় নেতারা। ক্ষমতাসীনরা ১৫ আগস্টের পর বলেছেন, ‘যারা ওই দিন কেক কেটে আনন্দ করে তাদের সঙ্গে কোন আলোচনা নয়।’ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকেরই বক্তব্য এটা এবং তিনি আর বলেছেন, ‘কারোর জন্মদিন যদি ১৫ আগস্ট হয়ও তাও সংযতভাবে পালন করা উচিত।’

এ কথাকে ‘মেঠো বক্তব্য’ হিসেবে ধরে নেয়া যাচ্ছে না এ কারণে যে, একটা চরম পর্যায়ের কঠোর পথ ও মনোভাব বা ‘এক্সট্রিম হার্ডলাইনের’ প্রকাশ ঘটেছে এসব কথায় এবং যা একদলীয় সিদ্ধান্তেরই নামান্তর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী ২৫ অক্টোবর সংসদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আর তার আগে সংসদীয়ভাবে কোন দাবি কি সরকার মেনে নেবে না? তারা মানবেন না, একথা বলেই চলেছেন যদিও বিপরীতে বিরোধী দল কয়েকটি অপশন দিয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে যে আমলে নিল না সরকার পক্ষ তা পরিষ্কার হয়ে গেছে তাদের ওই এক কথায়।

এখান থেকেই তাহলে শুরু হচ্ছে নজিরবিহীন অবদমনের পর্ব। অবদমন? হ্যাঁ অবদমনই করতে হবে তাদের আর শিকার হবে বিরোধী দল এবং তাদের কথা একাগ্রচিত্তে মানতে যারা নারাজ তাদের। যদিও ক্ষমতাসীন দল হয়তো ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্ত দেনেওয়ালারা হয়তো অবদমন শব্দটির যথার্থ অর্থ বের করে কাজ করছেন বা করবেন না। করলে হয়তো তারা উল্টোটা করতেন। কারণ অভিধানে বলা হয়েছে, ‘নিজের অজ্ঞাতসারে অন্তরের কোনো স্বাভাবিক বাসনার দমন’, বিশেষণে অবদমিত। ‘অবদমন করা হইয়াছে এমন।’ এটা ২০০০ সালে প্রকাশিত বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের ভাষ্য যা ভারতীয় সংসদ বাংলা অভিধান (১৩৭৮ সন) থেকে হুবহু তুলে দেয়া। এতে উৎস হিসেবে বলা হয়েছে, সংস্কৃত অব+দমন যার ইংরেজি প্রতিশব্দ ৎবঢ়ৎবংংরড়হ ও ৎবঢ়ৎবংংবফ. অন্যদিকে এ টি দেবের Students Favourite Dictionary (Eng. to Bengali 1998)তে reprcssionএর বাংলা করা হয়েছে অবদমন দমন এবং ৎবঢ়ৎবংংএর বাংলা করা হয়েছে, দমন করা, নিবারণ করা, নিষ্পিষ্ট করা ইত্যাদি। আবার মনোবিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিজের মানসিক অভিলাষ ও বাসনাকে দমিয়ে রাখাই অবদমন নয়, অন্যকে ভৌতভাবে নিষ্পেষণ নিপীড়ন, দমন ও নিবারণ করাও অবদমন। আর পদার্থবিদ্যায় dampবা dampingএর অর্থও অবদমন ও দমন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার অর্থ আরও ব্যাপক, নিরুৎসাহিত করা, স্তিমিত করা, চাপিয়ে রাখার চেষ্টা করা। এই অর্থে স্তিমিতকরণ ও অবদমন সমার্থক হয়ে দাঁড়ায় এবং আরও ব্যাপক শব্দাবলীকে আত্তীকরণ করে যেমন জয় বা জেতা, বিপর্যস্ত পর্যুদস্ত করা, বিদমন করা পরাস্ত করা ইত্যাদি। অবদমিত, দমিত, প্রদমিত সবই সমার্থক। সঙ্গে সঙ্গে বিজিত পরাভূত পরাহত, দলিত ইত্যাদিও সমভাব সম্পন্ন শব্দ। এগুলো আসলে কার্যকারণ থেকে অবদমনের সমার্থক হয়ে উঠেছে।

এই শব্দার্থ সন্ধানে সময় ব্যয় -‘মেধার ক্ষয়’ ২৫ অক্টোবরের আগের দিনগুলোর অনিশ্চয়তার জন্যই। এ অনিশ্চয়তা খরা, মঙ্গা বা আকালের মতো নয়। রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকার যখন প্রকাশ্যেই দমন অবদমনের ঘোষণা দিচ্ছে তখন অনিশ্চয়তা অস্থিরতায় রূপান্তরিত হবে এ আর বিচিত্র কি? অর্থাৎ সরকার বিরোধী দলীয় দাবিকে স্তিমিত করবে! নিবারণ করবে! থামিয়ে দেবে!!

এটারও যদি নিশ্চয়তা পাওয়া যেত তাহলেও হয়তো সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেত কিন্তু বিষয়টা তেমন তো নয় নিশ্চয়ই নয়। কারণ বিভেদকে খুব বেশি বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। একতরফা ব্যাপার নয়, সব আমলেই বাড়তে দেয়া হয়েছে ক্রমাগত। ক্ষুদ্র একটা দেশে এককেন্দ্রীক রাষ্ট্রে জনগোষ্ঠীকে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একই অবস্থা। এমন নয় যে, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সহজ সরল কৃষক বা কৃষিভিত্তিক শ্রমজীবীরা এর বাইরে রয়েছে। কেউ এই বিভেদ প্রক্রিয়ার বাইরে নেই। কারণ দেশের আয়তনগত ক্ষুদ্রতা তো আছেই। স্থানীয় সরকার কাঠামোর রাজনীতিকরণ অতিমাত্রায় হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক বিভেদ এখন বলতে গেলে স্থায়ী বিভক্তিতে রূপ নিয়েছে যা সম্পূর্ণরূপে অবিশ্বাস এবং অনাস্থাজনিত বিদ্বেষে বিষাক্ত। কাজেই চার পাঁচটি নগরী এলাকায় গণবিক্ষোভ স্তিমিত এবং নিবারণ করার চেষ্টা করলেই সারাদেশ নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে এমন মনে করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।

আজকাল কোন দেশেই আসলে এ রকম ব্যাপার ঘটে না। বিভাজিত সমাজ কেমন অনিশ্চিত অস্থির আর দাঙ্গাপ্রবণ হয়ে ওঠে এ যুগে তার প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ হচ্ছে মিশর। বহুদিন ধরে হোসনি মোবারকের স্বৈরাচার মুসলিম মৌলবাদী খ্রিস্টান মৌলবাদীদের নিয়ে খেলেছে। তবে ব্যবসায়ীদের জন্য উদারনীতি মিশরীয় সমাজ কাঠামোকে একটা অর্থনৈতিক বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিল সামরিক শৃঙ্খলের সহায়তায়। কিন্তু সমাজটাও ক্রমাগত ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছিল বিভেদের বিষবাষ্পে। একটি মাত্র নির্বাচন সেই বিভেদকে সামলাতে পারেনি। ক্ষমতা থেকে নিবৃত্তকরণ প্রক্রিয়া যার বিরুদ্ধে গেছে সেই ফুঁসে উঠেছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের স্বৈরাচারে রূপান্তরিত হতে এক বছরও সময় লাগেনি। আবার জাতীয় ঐক্যের ‘অঙ্গীকার’ করে সামরিক স্বৈরাচারও ঠেকাতে পারছে না বিভক্ত হয়ে যাওয়া মৌলবাদী আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশকে। সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর সাধারণ নির্বাচনে মুরসি তথা ইসলামী ব্রাদারহুডের বিজয় এটাই প্রমাণ করেছিল যে, ওটা কেবল একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম নয়, একটি সামাজিক শক্তি। ফলে তার ক্ষমতায় থাকার ধরনটা প্রবল বিরোধিতার মুখে অবদমনমূল হয়ে উঠলো অনিবার্যভাবে। আর তাকে হটিয়ে আসা সামরিক শাসকদের রাজনৈতিক পুর্নগঠন প্রক্রিয়া এখন ভেস্তে যেতে বসেছে নিবৃত্তকর কৌশলের কারণে। দীর্ঘ একটা অস্থির সময় পার করছে মিশরবাসী।

বাংলাদেশের বিষয়টা এই নিরিখে এখন অন্য রকম নয় মোটেই। সরকার ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি পৃষ্ঠপোষকতায় গণজাগরণ মঞ্চ আর হেফাজতের সমাবেশ দুটি রাজনৈতিক নয় সামাজিক বিভক্তি তৈরি করেছে। এখন জাতীয়তাবাদ গৌন হয়ে গিয়ে সেই স্থান দখল করেছে ইসলামপন্থী ও বিরোধী মনোভাব। ‘পোশাক পাল্টে’ আগে যে রকম সহজে ‘জনসাধারণকে বিভক্ত করা যেতো এখন আর সে রকমটা সম্ভব নয়’। শীর্ষ নেতারা কে কয় ওয়াক্ত নামাজ পড়েন ব্যক্তিগত ওই সব বিষয়ও বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য নয় বিগত দুর্নীতি আর অনৈতিক আচরণ। সমাজের বিভক্তি এখন মোটা দাগে ধর্মপন্থী আর ধর্মনিরপেক্ষতার মাপকাঠিও নির্ধারিত হচ্ছে। টাকা পয়সার খেলা এবং পেশিশক্তিও কাজ করছে না সেভাবে। রাজনৈতিক আদর্শ অঙ্গীকার অসার ও মূল্যহীন জনসাধারণের কাছে। স্বাভাবিক লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে নির্বাচন হলে এগুলোকে মূল্য দিতে হবে।

কিন্তু শঙ্কা তার আগের সময়টা নিয়ে। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যুদস্ত করা আর দমনের প্রকাশ্যে হুমকি দেয়া হয়েছে, চাপিয়ে দেয়া হবেই বর্তমান সরকার প্রধানের সিদ্ধান্ত। এটা বিরোধীদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আলোচনা হবে না তাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তাহলে একটাই পথ খোলা তাদের জন্য, তাদের পক্ষের সামাজিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করতে হবে। যেহেতু অবদমনের নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে। সেই আন্দোলন সংগঠনে বিভক্ত সমাজের শক্তিকে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা ছাড়া গত্যন্তর থাকছে না কোন রাজনৈতিক পক্ষেরই। কাজেই সমঝোতা না হলে রাজধানীর রাজপথ শুধু নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনপদগুলোও রক্তাপ্লুত হয়ে উঠতে পারে। সত্যি বলতে কি, এ রকম পরিস্থিতি বাংলাদেশে আর কখনো আসেনি। কোনো স্বৈরাচারও এতো ধনুক ভাঙ্গা পণ করে বসে থাকেনি।।