Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – মেজর জেনারেল মুনীরুজ্জামান (অব.)

সাক্ষাৎকার – মেজর জেনারেল মুনীরুজ্জামান (অব.)

যখনই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অচলাবস্থা দেখা যায় তখনই জঙ্গি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে

gen. muniruzzamanমেজর জেনারেল মুনীরুজ্জামান (অব.) – প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। প্রভাবশালী বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস এ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস)-এর সভাপতি। বাংলাদেশে জঙ্গি সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম এবং তাদের বিরুদ্ধে নেয়া অভিযান সম্পর্কে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের পরিস্থিতি কেমন বলে আপনি মনে করছেন?

মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান: বেশ কিছুদিন ধরে দেখতে পাচ্ছি বৈশ্বিক পরিমন্ডলে যেভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তাতে বড় ধরনের বিকেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়া চলছে। যার কারণে কৌশলগত দিক দিয়ে তারা বড় বড় গোষ্ঠীতে কাজ না করে ছোট ছোট অংশে ভাগ হয়ে নতুন নতুন নামে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অর্থাৎ দেখা গেছে যে, আল কায়দা যখন আল কায়দা সেন্ট্রাল নামে পরিচিত ছিল, তারা সে সময়ের অপারেশনের ধরন বর্তমানে পরিবর্তন করে ছোট ছোট গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে শুধু আদর্শগত নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। একই ধারায় বাংলাদেশেও বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ছাড়াও ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা তাদের সন্ত্রাসী বা উগ্র মতবাদ প্রচার করার যে প্রয়াস নিয়েছে তারই প্রতিফলন আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের আশঙ্কা, যে দুই একটি দল ধরা পড়ছে তার বাইরেও বাংলাদেশে ছোট ছোট দল আছে, যা হয়তো এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী খুঁজে বের করতে পারেনি।

আমাদের বুধবার: কিন্তু সরকার এ কথা বারবার বলেছিল যে তারা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমন করতে পেরেছে। তাদের ওই দাবি কতোটা যৌক্তিক?

মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান: সরকারের এই দাবি যে যথাযথ ও যুক্তিযুক্ত ছিল না তা বর্তমান কর্মকাণ্ড থেকে প্রমাণিত হচ্ছে। তার প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় যখন বিশ্বব্যাপী অনেক দেশে মার্কিন দূতাবাসের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়, সে তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের নামও ছিল। অনেকে আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন যে, পাকিস্তানও সে তালিকার মধ্যে না থাকলেও বাংলাদেশের নাম সে তালিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমরা ইদানীংকালে যে বুঝতে পারছি এবং আমাদের বিশ্লেষণে যা উঠে আসছে তাতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কর্মকাণ্ড যেসব গোষ্ঠী পরিচালনা করছে বা পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখে, তারা বিগত কয়েক বছরে সংগঠিত হয়েছে। নতুন করে তারা সজ্জিত হয়েছে। একমাত্র যে কাজ তারা করেনি এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর নজরদারির জন্য হতে পারে বা প্রধানত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের কারণে হতে পারেতারা কোনো অপারেশনের যায়নি। তবে এ দিয়ে এটা প্রমাণ হয় না যে, তাদের ক্ষমতা বাংলাদেশ থেকে নির্মূল করা গেছে। বরং দেখা যাচ্ছে যে, তারা নতুন নতুন দল সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। এর এতে প্রমাণ মিলে তাদের কর্মকাণ্ড আগের থেকে অনেক বিস্তার লাভ করেছে। কাজেই সরকার যে দাবি করেছিল সেটা কোনোক্রমেই যুক্তিযুক্ত নয়।

আমাদের বুধবার: জঙ্গিদের গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং হচ্ছে

মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান: তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযান বাংলাদেশে পরিচালিত হচ্ছে সেটা একটা ছোট অংশ বা ক্ষুদ্র পরিসরে করা হয়ে থাকে। এটা মনে করা হয়, কোনো জঙ্গি বা সন্ত্রাসীকে ধরে নিয়ে জেলে দেয়ার মধ্যদিয়েই কাজ শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমরা বারবার বলে আসছি যে, জেলের ভেতরে যারা যাচ্ছে তাদের ভেতরে নতুন করে এই রোগ আরো ব্যাপক আকারে সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। তারা নতুন করে উগ্রবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং জেল থেকে যখন বেরিয়ে আসছে তখন তারা সংগঠিত হয়ে নতুন করে সংগঠন করে আবার কর্মকাণ্ড শুরু এবং নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সন্ত্রাস বিরোধী যে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে তাকে সমন্বিতভাবে পরিচালিত করতে হবে। যারা জেল থেকে বেরিয়ে আসছে তাদেরকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, বিসন্ত্রাসীকিকরণ পন্থাকে অবলম্বন করতে হবে। সেই ধরনের কোনো পদক্ষেপ সার্বিকভাবে বাংলাদেশে এখনো নেয়া হয়নি।

আমাদের বুধবার: সন্ত্রাস প্রশ্নে যে সব পদক্ষেপ নেয়া উচিত তা না নেয়ার কারণেই কি পরিস্থিতি এমন?

মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান: সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানের সার্বিক যে রূপরেখা দরকার তা না রেখে যদি আংশিক আকারে করার চেষ্টা করা হয় তাহলে স্বল্পমেয়াদে সুফল আসতে পারে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বা স্থায়ীভাবে কোনো কার্যকর কাজ হবে না। তারই প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়, মাঝে মধ্যেই বাংলাদেশে অনেক জঙ্গি বা সন্ত্রাসীকাজে জড়িতদের পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ধরছে, জেলে নিচ্ছে, কিন্তু তার পরে কি হচ্ছে সে ব্যাপারে কোনো খবর রাখার বন্দোবস্ত বা কোনোই পন্থা নেই। দেখা যাচ্ছে যে, এটা একটা রিভলভিং ডোরএর মতো। অর্থাৎ একদিকে তারা ঢুকছে ছোট সন্ত্রাসী হিসেবে, আবার বেরিয়ে হয়ে যাচ্ছে বড় ধরনের সন্ত্রাসী।

আমাদের বুধবার: জেএমবি বা হুজিকে নিষিদ্ধ করা হলো। এ ধরনের সংগঠন নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান: আমি মনে করি না এটাই একমাত্র বা শেষ প্রতিষেধক হতে পারে। এ কারণে যে, এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পথগুলো থাকে, সবগুলো পথকেই বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ যে ধরনের বিস্তার হয়ে গেছে, সে পথে যারা চলে গেছে তাদেরকে আবার সঠিক পথে নিয়ে আসতে হবে অর্থাৎ বিসন্ত্রাসীকিকরণ করতে হবে। যাকে জেলে দেয়া হচ্ছে সে তো আবার জেল থেকে বেরিয়ে সমাজে প্রবেশ করছে। সে যাতে ওই পুরনো পথ ও পন্থায় ফিরে যেতে না পারে তার জন্য প্রতিষেধক হিসেবে সঠিকভাবে পুনর্বাসিত করতে হবে, যাতে একজন স্বাভাবিক ব্যক্তি হিসেবে সে জীবনযাপন করতে পারে। এটা করতে না পারলে ক্ষুদ্র জঙ্গি জেলে গেলে বেরিয়ে আসে বড় সন্ত্রাসী হিসেবেই। তখন সে নেতৃত্ব দেয়ার, নিজেই সংগঠন গড়ে তোলার সক্ষমতা অর্জন করে। সন্ত্রাস নির্মূল করতে গেলে যদি সার্বিক ও সামগ্রিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া না হয় তাহলে রেডিওটেলিভিশনে সাফল্যে দেখানো যাবে কিন্তু আসল সাফল্য দেশ বা জাতি পাবে না।

আমাদের বুধবার: কিন্তু বাংলাদেশে তো কোনো সুসমন্বিত ও সামগ্রিক রূপরেখাই নেই।

মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান: না,এ রকমটা নেই। এখানে যা হচ্ছে তা হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপারেশন পরিচালনা করার চেষ্টা করা হচ্ছে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। এতে সাময়িকভাবে সাফল্য আসলেও সার্বিকভাবে সফলতা আসছে না। রাজনৈতিকভাবে দাবি করা হচ্ছে যে, তারা সম্পূর্ণভাবে সফল হচ্ছেন কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে সাফল্যের কাছাকাছিও বাংলাদেশ আসতে পারেনি।

আমাদের বুধবার: এই যে সাফল্যের দাবি করা হচ্ছে তা কি পুরো বিষয়টিকে রাজনীতিকিকরণ করা নয়?

মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান: আমার বিশ্লেষণে আমি মনে করি যে, সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানকে কখনই রাজনীতিকিকরণ করা উচিত নয়। অর্থাৎ আমাদের দুটো দলের মধ্যে যে রাজনৈতিক কোন্দল আছে তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে বিষয়টিকে দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে যখনই দোষারোপের রাজনীতির সঙ্গে একে যুক্ত করা হবে সেক্ষেত্রে যে ধরনের সুযোগ বা সুবিধার সৃষ্টি হয় জঙ্গি সংগঠনগুলো ওই সুযোগটি ভালো ভাবেই গ্রহণ করে। যখনই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অচল অবস্থা দেখা যায় তখনই জঙ্গি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। নতুন করে সংগঠিত হয়, কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। বাংলাদেশে যে অচল অবস্থার দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সেক্ষেত্রে এই ধরনের সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তারা সুযোগ খুজছে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।