Home » বিশেষ নিবন্ধ » অচল – সচল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

অচল – সচল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

দেলওয়ার হোসেন

JUজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষকরা শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে বৈঠকের পর আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন। উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়কে সচল করতে গত শনিবার বিকেল পৌনে ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর বাড়িতে এই বৈঠক হয়। পরে ক্যাম্পাসে ফিরে রাত ১২টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষকদের সংগঠন সাধারণ শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক হানিফ আলী জানান, শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় চারটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন অভিযোগ আমলে নেয়া হবে, উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি কমিটি করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল, তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিট তুলে নেয়ার ব্যবস্থা করা এবং সব বিষয় বিবেচনায় ১৫ দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় উপাচার্য আনোয়ার হোসেন এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আশা করছি শিক্ষকদের এই কর্মসূচি স্থগিতের সিদ্ধান্ত স্থায়ী হবে।

দেড় বছর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামূল কবিরের বিরুদ্ধে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা একযোগে আন্দোলন গড়ে তুললে তখনো শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগে এই ধরনের একটি বৈঠক হয়েছিল। অধ্যাপক শরীফ এনামূল কবির পদত্যাগ করলে গত বছর ১৭ মে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনোয়ার হোসেনকে। পরবর্তীতে তিনি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে স্থায়ী হন। অধ্যাপক আনোয়ার বিরোধী আন্দোলনে অধ্যাপক শরীফ এনামূল কবির সমর্থকদের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছেন বিএনপি সমর্থক শিক্ষকরাও।

২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি ছাত্রলীগের কতিপয় ক্যাডারের হামলায় ইংরেজির ছাত্র সানি নিহত হওয়ার পরই শুরু হয় আন্দোলন। সেই শুরু। এরপর এখন পর্যন্ত নানা কারণে আন্দোলন চলে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। সর্বশেষ বিগত ৬ মাস ধরে বিভিন্ন দাবিতে উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন শিক্ষকরা। শিক্ষক সমিতির দাবির মুখে এ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি আনোয়ার হোসেন পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে ওইদিন রাতেই আবার তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। এরপর গত ২১ এপ্রিল থেকে উপাচার্যের বিরুদ্ধে ১২টি ক্যাটাগরিতে অসংখ্য অভিযোগ এনে শিক্ষক সমিতি অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এরপর ২৭ এপ্রিল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক কর্মবিরতির ডাক দেয় শিক্ষক সমিতি। ফলে বন্ধ হয়ে যায় ক্লাস পরীক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রম। এক মাসেরও বেশি সময় কর্মবিরতি পালনের পর ১৯ জুন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। আবারও ভেঙে পড়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম। শিক্ষকদের বাধার মুখে অফিস করতে পারেননি উপাচার্য। ফলে পণ্ড হয়ে যায় ২১ জুনের বার্ষিক সিনেট অধিবেশন, যা এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর দিনের পর দিন উপাচার্যকে তার অফিস করতে দেয়নি শিক্ষক সমিতি। তবে হাইকোর্টের রিটের মাধ্যমে দীর্ঘ ৪০ দিন পর ২৯ জুলাই সচল হয় জাবির প্রশাসনিক কার্যক্রম। কিন্তু শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে হাইকোর্টে নিষেধাজ্ঞা থাকায় নাম পরিবর্তন করে সাধারণ শিক্ষক ফোরাম নামের নতুন ব্যানারে উপাচার্য বিরোধী আন্দোলন শুরু করে শিক্ষকদের একটি অংশ। শিক্ষক ফোরামের বাধার কারণে গত ৩০ জুলাইয়ের সিন্ডিকেট পণ্ড হয়ে যায়। এরপর ঈদের ছুটিতেও চলে শিক্ষক ফোরামের আন্দোলন। সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর গত ১৯ আগস্ট ধর্মঘটের ডাক দেন আন্দোলনকারী শিক্ষকরা। কিন্তু উপাচার্য শিক্ষকদের ধর্মঘট উপেক্ষা করে অফিসে প্রবেশ করলে শিক্ষক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা তার অফিস রুমের সামনে অবস্থান নিয়ে তাকে সেখানে অবরুদ্ধ করেন।

এদিকে, আন্দোলনকে ঘিরে শিক্ষার্থীরা যেমন ক্ষুব্ধ তেমনি শিক্ষকদের দ্বিধাবিভক্তি এখন রূপ নিয়েছে প্রকাশ্যে। খোদ শিক্ষকদের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে তিনটি ধারা। একটি অংশ উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে, অপর অংশটি পদত্যাগ দাবির বিরোধিতা করে উপাচার্যকে তিন মাস সময় বেঁধে দিয়ে সমস্যা সমাধানের পক্ষে। আর উপাচার্যের অনুসারী অংশ আন্দোলনের বিরোধিতা করে কর্মসূচি থেকে সরে আসতে আহবান জানিয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষকদের। সাধারণ শিক্ষক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের অনুসারীদের দুটি উপদল ও আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের তিনটি উপদল অংশ নিচ্ছে এ কর্মসূচিতে। উপাচার্যের অনুসারী আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের একাংশ চলমান আন্দোলনকে বলছেন অযৌক্তিক ও অনৈতিক। অবস্থান ও ধর্মঘট কর্মসূচির বিরোধিতা করে তারা মাঠে নেমেছেন। গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন জনমত। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবির বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র অবস্থান নেয়া প্রগতিশীল শিক্ষকেরা অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষক মঞ্চের ব্যানারে। সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইনের নেতৃত্বে শিক্ষকদের এ অংশটি আন্দোলনকে ক্ষমতার ও স্বার্থের আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ধর্মঘটে অচল শিক্ষা কার্যক্রম। ক্লাস না হওয়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ক্ষোভ প্রকাশ করে নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাসিন বলেন, ‘‘শিক্ষকদের মুখোমুখি অবস্থানে আমাদের শিক্ষাজীবন আজ দুর্বিষহ, এখন জরুরি প্রয়োজন সমাধান।’’ এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী দুই ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট সঙ্কট নিরসনে বিবৃতি দিয়েছে। সংকট নিরসনের তাগিদ দিয়েছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। সংগঠনটির একজন নেতা বলেছেন, প্রায় ছ’মাস ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যাহয়ে বিভিন্ন ব্যানারে নানা কর্মসূচীর ফলে কখনো একাডেমিক কখনও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে পড়েছে। বাড়ছে সেশনজট, অনিশ্চয়তায় পড়েছে প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। সংকট দূরীভূত হবার পরিবর্তে ঘনীভূত হয়েছে।

প্রসঙ্গত গণমাধ্যমে ছাত্র ও শিক্ষকদের সম্পর্কে ‘অনাকাঙ্খিত’ বক্তব্য প্রদান, গত বছরের ১ ও ২ আগস্ট সন্ত্রাসী হামলা এবং ১২ ফেব্রুয়ারি একজন ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ভাঙচুরের বিচার না হওয়াসহ ১২টি অভিযোগে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি করে শিক্ষক সমিতি। দাবি বাস্তবায়নে গত ২০ জুন থেকে প্রশাসনিক ভবন অবরোধ শুরু করেন তারা। প্রশাসনিক ভবন অবরোধের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থার সমাধান চেয়ে ৭ জুলাই হাইকোর্টে রিট করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষকসহ একজন শিক্ষার্থী। ২৪ জুলাই হাইকোর্ট প্রশাসনিক ভবন সচল করার নির্দেশ দিয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য রুল জারি করেন। শিক্ষকদের আন্দোলনের এক পর্যায়ে হাই কোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীলতা রক্ষার নির্দেশনা দেয়ায় ৩০ জুলাই থেকে শিক্ষক সমিতি প্রশাসনিক ভবনের অবস্থান তুলে নেয়। এরপর কৌশল পাল্টে শুরু হয় সাধারণ শিক্ষক ফোরামের আন্দোলন, যাতে সাবেক উপাচার্য সমর্থকদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক শিক্ষকরাও সক্রিয় হন।

বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক শাকিলা শারমিন বলেন, “শিক্ষকদের রাজনীতি বুঝতে চাই না। শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষা চালুর মাধ্যমে সেশনজট না বাড়লেই হলো।” এমতাবস্থায় গভীর উদ্বেগ পকাশ করে মঈনুল ইসলাম রাকিব নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের এহেন পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তার পথে হাঁটছি। জানি না এ গভীর সঙ্কট কবে কাটবে বা এর পেছনে দায়ী কারা।”