Home » প্রচ্ছদ কথা » কোনটি জয়ী হবে – জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগ না প্রধানমন্ত্রীর অনঢ় অবস্থান

কোনটি জয়ী হবে – জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগ না প্রধানমন্ত্রীর অনঢ় অবস্থান

আমীর খসরু

hasina-moonতত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের হরতাল অবরোধসহ নানাবিধ কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে দেশে যখন অরাজক এক পরিস্থিতি চলছিল তখন ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে অস্ট্রেলীয় সাবেক বিচারপতি স্যার নিনিয়ান স্টিফেনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। উদ্দেশ্যে ছিল তখনকার সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা। আওয়ামী লীগ তখন একা আন্দোলন করছিল না, জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ওই আন্দোলন চলছিল। নিনিয়ান স্টিফেন ঢাকায় এলেন, দফায় দফায় বৈঠক করলেন। কখনো দুই দলকে টেবিলের দু’পাশে রেখে, আবার কখনো আলাদা আলাদাভাবে। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। স্যার নিনিয়ান বাংলাদেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের গোয়ার্তুমি দেখে অবাকই হয়েছিলেন। এরপরে নানাবিধ পন্থায় আওয়ামী লীগ জামায়াত আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং ওই সময়ের বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে এতোটাই সোচ্চার ছিলেন যে, বিভিন্ন সভা সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলনে এমন একটা ধারণা দিতেন যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেই সব মুশকিলের আসান হয়ে যাবে। তিনি তখন বলতেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলে চিরদিনের জন্য এবং স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে। তিনি এমনও বলতেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ফলে যে সরকারটি প্রতিষ্ঠিত হবে তার মাধ্যমে জনগণ এমনভাবে উপকৃত হবে যাতে কিনা জনগণের ভাত কাপড়, সব অধিকারের নিশ্চয়তা মিলবে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নেয়ার লক্ষ্যে একদিনের জন্য সংসদ অধিবেশন আহ্বান করে যে সংসদটি কিনা বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগও ১৯৯৬ এর নির্বাচনে জয়লাভ করে। এর ফলে আওয়ামী লীগের এবং এর নেত্রীর পক্ষে সুক্ষ্ম বা স্থূল কারচুপি জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতে হয়নি। আওয়ামী লীগ এরপরে বিভিন্ন সভা সমাবেশে শেখ হাসিনাকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকার’ বলেও পরিচয় দিয়েছে। দীর্ঘকাল এটা করা হয়েছে, বন্ধ হয়েছে এই যাত্রায় ক্ষমতায় আসার পরে। ২০০৮ এর নির্বাচনটিও অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। শেখ হাসিনা নির্বাচিত হলে ওই সরকারটি বৈধতা দিবেন বলেও নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। ওই সময়ও বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। এমনকি আকারে ইঙ্গিতেও জনগণকে জানান দেয়া হয়নি যে, ক্ষমতায় এলে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জাতীয় সংসদে বিল এনে তড়িঘড়ি বাতিল করবেন। নির্বাচনী ইশতেহারের বিশাল যে দলিল একটি পাঁচতারা হোটেলে বসে সাংবাদিকদের সামনে প্রকাশ করা হয়েছিল সে দলিলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল প্রশ্নে একটি বিন্দু বিসর্গ পর্যন্ত নেই।

কিন্তু ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক সময়ের রূপকার পরিণত হলেন ঠিক তার বিপরীত একজন ব্যক্তিতে যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অপকারিতা, এর দোষ ত্রুটি বলতে শুরু করলেন। ওই ব্যবস্থাটি গণতন্ত্রের জন্য যে কতোটা খারাপ, বিনাশী এবং নানাবিধ দোষে আক্রান্ত এমন কথামালার রূপকারে পরিণত হলেন তিনি। ১৯৯৬ এর সময়ের যুক্তি এই দফায় এসে পরিণত হলো পুরোপুরি অযৌক্তিক বিষয়ে। তাজ্জব ব্যাপার সন্দেহ নেই।

ক্ষমতায় আসার পরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি একে একে ভঙ্গ করে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী ও পাকাপোক্ত করার দিকে আওয়ামী লীগ যতোটা মনোযোগী হয়েছে, মানুষ ততোটাই হয়েছে বিরক্ত। সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে জনপ্রিয়তা। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা সরকারগুলো বরাবরই প্রথমদিকে ধারণাই করতে পারে না যে, তারা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, তাদের জনপ্রিয়তায় ধস নামছে। কিন্তু যখন বুঝতে পারে তখন তাদের হাতে একটি পথ খোলা থাকে আর তা হচ্ছে আরো কঠিন কঠোর পথ গ্রহণ করা। জনগণের উপরে, বিরোধী দল ও মতের উপরে নির্যাতন নিপীড়নের মাত্রা দিনকে দিন বাড়তে থাকে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে যেন ঠিক তাই ঘটেছে। এখানে ইতিহাস আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার তত্ত্ব ও পথ পদ্ধতির পুরোটা এক ও অভিন্ন থেকেছে, থেকেছে অক্ষুণ্ন। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বলা প্রয়োজন, যখন কোনো সরকার জনপ্রিয়তা হারায় তখন তারা সবসময়ই একটি ভীতির মধ্যে থাকে। এই ভীতি হচ্ছে ক্ষমতা হারালে পরিণতি কি হবে। সে ভীতির কারণে তারা ‘ক্ষমতা নেই’ এটা চিন্তা করতেও রাজি থাকে না।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক বাতিল সে কারণে একদিকে যেমন ভীতি দ্বারা সৃষ্ট অন্যদিকে এই ভীতির কারণে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্যোগেরই ফলাফল। কাজেই শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি মানুষ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে, নিজেরা বাদে অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী ও অন্যান্য সামাজিক শক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে তখন ভীতির মাত্রাটা এবং নানাবিধ শঙ্কা হাজার গুণে বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আর বেড়ে যায় বলেই শেষ পর্যন্ত একদলীয় একটি নির্বাচনের পথে হাটতে শুরু করেছে বর্তমান সরকার। অথচ এই আওয়ামী লীগই কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন নিয়ে বহু কথা বলেছে, তারা জানে এই ধরনের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিণতি কি হয়। আওয়ামী লীগ এটা ভালো করেই জানে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে শুধু অংশ নিলেও তার পরিণতি কি হতে পারে। এতো কিছু জানার পরেও কেন তাহলে সে ভয়ঙ্কর পথে, কানাগুলির দিকে এই অনিশ্চিত যাত্রা?

এই ধরনের এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব এবার নিজে উদ্যোগ নিয়েছেন সঙ্কট সমাধানের এবং সমঝোতার। ইতোমধ্যে দেশী বিদেশী সব পক্ষই সমঝোতার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা সবাই এ কথা বলছেন যে, নির্বাচনকালীন সময়ে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য সরকার ব্যবস্থার অধীনে আগামী নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি। এমনকি যে চীন সহজে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলে না সে চীনও বাংলাদেশের এই সঙ্কট নিয়ে মুখ খুলেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব এসব জানেন নিশ্চয়ই। তিনি এর আগেও একজন বিশেষ দূত পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু দু’দফায় আসার পরেও তিনি সফল হননি। এবার জাতিসংঘ মহাসচিব আবার একজন বিশেষ দূত পাঠাচ্ছেন।

কিন্তু জাতিসংঘ মহাসচিবের এই উদ্যোগে কি সফলতা আসবে, তৈরি হবে কি সমঝোতার পথ? এখানেও সন্দেহ আর অবিশ্বাস। অবিশ্বাস আর সন্দেহ সৃষ্টি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে ফোনালাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া বা সংবিধানে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। ওই সব সূত্র বলছে, সরকারের সৃষ্ট অন্তবর্তী সরকারের অধীনে বিএনপি যেন অংশ নেয় এমন কথাই তিনি বান কি মুনকে জানিয়ে দিয়েছেন। সরকারের সব শেষ অবস্থান হচ্ছে তারা তাদের অবস্থান থেকে নড়বেন না। প্রধানমন্ত্রী এর আগেই অর্থাৎ ১৮ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিয়েছেন – ‘তিনি এক চুলও নড়বেন না’। কাজেই সে অবস্থায়ই যদি তিনি অনঢ় থাকেন তাহলে জাতিসংঘ মহাসচিবের এই উদ্যোগের পরিণতি কি হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের কথা বলছেন। অথচ সংবিধান পরিবর্তন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান পুনঃস্থাপন কিংবা সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন একটি সরকার ব্যবস্থায় ফিরে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কাজেই পুরো বিষয়টিই প্রধানমন্ত্রীর উপরেই নির্ভর করছে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগের প্রতি বিরোধী দল বিএনপিসহ দেশী প্রায় সব পক্ষই সমর্থন জানিয়েছে। বিদেশীদের সমর্থনও এই উদ্যোগের প্রতি রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কাজেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারটি একদিকে যেমন আগে থেকেই জনপ্রিয়তা হারিয়ে বসে আছে, অন্যদিকে বন্ধুহীন অবস্থা আরো প্রকট হচ্ছে। সরকারের অনঢ় অবস্থানটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

মনে রাখা প্রয়োজন যে, জাতিসংঘের সমঝোতার উদ্যোগ ব্যর্থ হলে নির্ঘাত যে সংঘাতের মধ্যে দেশটি পড়বে তখন পরিণতি হবে ভয়াবহ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ব্লু হেলমেট বা শান্তি রক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি ওই সব দেশগুলোর যতোটা না উপকার করেছে তার চেয়েও অনিষ্ঠ হয়েছে বহু গুণে বেশি। আশা করছি, প্রার্থনা থাকলো ওই অবস্থার দিকে বাংলাদেশ যেন না যায়। তবে নিজেরা নিজেদের সঙ্কট মেটাতে না পারা এবং অনঢ় অবস্থার কারণে দেশের ইমেজ বা ভাবমূর্তি আরো বড় ধরনের সঙ্কটের পড়েছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বিদেশীদের দূতিয়ালি যে জাতীয় লজ্জা এটা উপলব্ধি করার বোধ বুদ্ধিটুকুও যেন লোপ পেয়েছে। সার্বিকভাবে দেশের যে সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে তা ই সামাল দেয়া কঠিন হবে। আর ভবিষ্যতের ক্ষতির কথা না হয় বাদই দিলাম।

প্রভু, ওদের জ্ঞান দাও, বুদ্ধি দাও, বিবেক দাও, ভালো মন্দ বিবেচনার শক্তিটুকু দাও। ১৬ কোটি মানুষের এই অভাগা দেশটিকে বাঁচাও। আমীন।।