Home » রাজনীতি » পুলিশ দিয়ে সরকার বান্ধব তথ্য প্রযুক্তি

পুলিশ দিয়ে সরকার বান্ধব তথ্য প্রযুক্তি

আবীর হাসান

digital-focusডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে সেই তথ্য প্রযুক্তিকে টুটি চেপে ধরার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। আর পুলিশ দিয়ে এই তথ্য প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে সরকার। এটা অভাবীত। বোঝাই যাচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপারে অভিজ্ঞতা ভালো নয় সরকারের। সর্বাধুনিক বিষয়গুলোকেই সরকারের বশংবদ ব্যক্তিরা এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে সরকার বেকায়দায় পড়ে গেছে। বিশেষ করে স্কাইপির ব্যবহার এবং ব্লগারদের কর্মকাণ্ড সরকার হজম করতে পারেনি। এর বিপরীতে বিরোধী কিছু সংবাদপত্র এবং ব্লগার যা করেছে তাও ছিল তাদের জন্য অস্বস্তিকর এবং উষ্মা জাগানোর কারণ।

এই অস্বস্তি এবং উষ্মা থেকেই যে সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনকে কড়া এবং নিবর্তনমূলক করে তুলতে চাচ্ছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। বিশেষ করে ৫৭ ধারার ১ উপধারাটি। যেটি জন্মলগ্নেই ছিল অশুদ্ধ সংবিধানে দেয়া মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। ২০০৬ সালে গতানুগতিক অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নাগরিক স্বার্থবিরোধী আইনটি করেছিল বিএনপি সরকার। সেই হিসেবেও এই আইনটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন ছিল এই সরকারের জন্য। এতে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা অন্য কোন ইলেকট্্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ করলে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা এ ধরনের তথ্যের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয় তাহলে তার এই কাজ হবে একটি অপরাধ।’

এই বিধানটি নিজেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রশ্নে জন্ম দেয় এই কারণে, যে সরকার ক্ষমতাসীন থাকবে তার বিপক্ষে গেলেই তো এই আইনের অপপ্রয়োগ হবে। কোন নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ এটা নির্ধারণ করবে? সরকারের এই পুলিশ? বর্তমান সরকার আমার দেশ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং অধিকার এর মহাসচিব আদিলুর রহমানের বিরুদ্ধে এই ধারায় অভিযোগ এনেছে। এ জন্যই হয়তো সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের মনে হচ্ছে এ আইন আওয়ামী বান্ধব। আর তাই একে আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। ‘শুনলেও অপরাধ’ বলে গণ্য হবে এমন একটা আইনের সঙ্গে পুলিশের জন্য আমলযোগ্য এবং অজামিনযোগ্য করা হয়েছে। কেবল ৫৭ ধারা নয়, ৫৪, ৫৬ ও ৬১ ধারার ব্যাপারেও ঢালাওভাবে অপরাধকে আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য তো বলা হয়েছেই, শাস্তির মেয়াদ ১০ বছর থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৪ বছর। পরওয়ানা ছাড়ায় গ্রেফতার করতে পারবে পুলিশ। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যক্তিরা নন পুলিশ মনে করলেই যথেষ্ট। সে পুলিশ ওসিই হোক বা এএসআই হোক।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অপরাধ এবং সেই অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার নিয়ে বিশ্বের অনেক দেশেই বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকমাস আগে ভারতেও তথ্য প্রযুক্তি আইন নিয়ে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতের তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৬৬ () ধারায় আপত্তিকর মন্তব্য করার জন্য গ্রেফতারের বিধান আছে। কিন্তু প্রবল সমালোচনার মুখে কেন্দ্রীয় সরকার গত ৯ জানুয়ারি রাজ্য সরকারগুলোকে নির্দেশ দেয় সামাজিক ওয়েবসাইটে আপত্তিকর মন্তব্যের জন্যে কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে তা কোন থানার পুলিশ আমলে নিতে পারবে না, যাচাই করে দেখবেন শহরাঞ্চলে হলে আইজিপি এবং জেলায় হলে ডেপুটি কমিশনার।

কিন্তু তারপরেও ফেসবুকে মন্তব্য করার জন্য গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছিল। গত এপ্রিল মাসে তামিলনাড়ু রাজ্যের গভর্নর কে রোজাইয়াহ এবং কংগ্রেসের বিধায়ক আমঞ্চি কৃষ্ণমোহনকে নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য করেছিলেন এক নারী। ওই দুই ব্যক্তির কাছে মন্তব্যটি আপত্তিকর মনে হওয়ায় তারা থানার পুলিশ দিয়ে তাকে ধরিয়ে এনে দ্রুত বিচার আইনে বিচার করান এবং সাজাও হয়ে যায় তার। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং জামিন পান ওই নারী। কিন্তু আন্দোলন সংগঠিত করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় জয়া বিনদয়াল নামের এক মানবাধিকার কর্মীকে। এরপর ঘটনাটি ওঠে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টে। সুপ্রিমকোর্ট তাদের পর্যবেক্ষণে বলে ভারতীয় তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৬৬ ক ধারার জন্য সামাজিক ওয়েবসাইটে মন্তব্যের কারণে গ্রেফতার করার বিধান নিষিদ্ধ করাও যাচ্ছে না ওই ধারার জন্য। কিন্তু সে ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলোকে দেয়া কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ মেনে চলতে বলা হয়।

অর্থাৎ সব পুলিশকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়া নয় বরং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অপরাধের জন্য বিষয়টা বুঝতে সক্ষম এমন পুলিশ অফিসারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর বাংলাদেশে জামিনের বিধান ছাড়া কথিত গণতান্ত্রিক সরকার কোন আইন করতে পারে! ‘শোনাও অপরাধ’ এমন বিধান থাকতে পারে এটাও অভাবনীয়। এটাকে ‘প্রকট সমস্যা’ এবং ‘ছেড়ে দিয়ে তাড়িয়ে ধরার’ মতো কঠিন প্রক্রিয়া বলে মনে করছে সরকার। সে কারণেই সুবিধা দিয়েও তা প্রত্যাহার করার মতো অগণতান্ত্রিক পথে হাটছে সরকার। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন বিষয়ও বলবৎ করতে চাচ্ছেন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা। কারণটা হয়তো এই যে নির্বাচনের সময়টায় যেন কোন অপপ্রচার না হয় কিংবা কেউ আকস্মিক কোনো জটিলতা সৃষ্টি না করে।

এই বিষয়গুলো আসলে মূল্যহীন কেননা জনসাধারণ যে সুবিধাগুলোকে নতুন পরিস্থিতিতে ভোগ করছে, সেগুলো কোন গণতান্ত্রিক সরকার প্রত্যাহার করতে পারে না। এটা যদি করা যেত তাহলে মার্কিন প্রশাসন মাইকেল এ্যাসাঞ্জ ও স্লোডেনের মতো অন্যান্য ‘অপরাধীদের’ ধরতে চাওয়ার আগে তথ্য প্রযুক্তি আইন কঠোর করতে চাইতো যেখানে মার্কিন গোপন নথি ও গোয়েন্দা রিপোর্টে ফাঁস হয়েছিল।

তথ্য প্রযুক্তি আইনের সংশোধনীর খসড়া ১৯ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়ার পর এখন ভেটিং বা পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। অথচ আর কদিন পরই ১২ সেপ্টেম্বর বসছে সংসদ অধিবেশন। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্য দেখাচ্ছে না সরকার। তদুপরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিচার বহির্ভূতভাবে আটক রাখার বিষয়টিও খুবই গোলমেলে। অজামিনযোগ্যতার এই বিষয়টি নিয়ে আরও সাত পাঁচ ভাবা উচিত সরকারের। নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে মানুষকে নিবৃত্ত করার বিষয়টাকে ব্যক্তি পর্যায়ে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মই ভালোভাবে দেখছে না। এই আইন কার্যকরের পর সামাজিক ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীরা হয়রানির শিকার হলে সৃষ্টি হবে আরো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির।।