Home » রাজনীতি » বিদেশীদের উদ্বেগ আর সরকারের অবস্থান

বিদেশীদের উদ্বেগ আর সরকারের অবস্থান

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

foreign-deligatesগল্পটি পড়েছিলাম গত শতকের আশির দশকে রিডার্স ডাইজেষ্টে। হুবহু না হলেও উদ্বৃত্ত করার চেষ্টা করছি। বিখ্যাত এক আফ্রিকান শিকারী গল্প করছিলেন নবীশ এক দঙ্গল শিকারীর সঙ্গে। বুঝলে হে রসিয়ে রসিয়ে বলছিলেন তিনি, সাভানা তৃণভূমি পেরোচ্ছিলাম যখন গা ছম ছম করছিল। হাত দেড়হাত লম্বা ঘাস ছাড়া কোন গাছপালা নেই। গুলি ফুরিয়ে রাইফেলটা পরিনত হয়েছে জঞ্জালে। তো, সিংহটা যখন তাড়া করলো আর কি, – কি করলেন তখন? অনেকগুলো উদ্বিগ্ন উত্তেজিত কন্ঠ! কি আর করা, সবচেয়ে কাছের গাছটায় উঠে পড়লাম নির্বিকার শিকারীর কন্ঠ! তা আপনিই তো বলছিলেন, কাছে পিঠে কোন গাছ ছিল না নবীন শিকারীদের ফেটে পড়া কৌতুহল! ঝানু অভিজ্ঞ শিকারীর কন্ঠ আরো নিরুদ্বেগ গাছ তো একটা থাকতে হবে, নইলে বাঁচবো কি করে!

গল্পটি মনে পড়লো এই কারনে যে, বাঁচার জন্য বাংলাদেশের অসহায় আতংকিত জনগনের জন্য দরকার একটি গাছ! যে গাছ তাদের দেবে সুশীতল ছায়া, বাঁচার জন্য নূন্যতম নিশ্চয়তা। নির্মম নিষ্ঠুর অবহেলায় করে তুলবে না আতংকিত দিশেহারা। গত ৪২ বছর ধরে বাঁচার জন্য এরকম একটি গাছ খুঁজে ফিরছে বাংলাদেশের আপামর জনগণ। এই জন্য সে বারবার আওয়ামী লীগ, বিএনপি নামক গাছের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে ঘুরে ফিরে, কিন্তু কাঁটাওয়ালা এই গাছ নির্মমতায় তাদের করেছে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত। মাঝখান থেকে অগণতান্ত্রিক শক্তি অনেকটা সময় জুড়ে ত্রাতা সেজে গাছ হওয়ার নামে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছে জনগনের আশা আকাঙ্খা!

গত ৪২ বছরে তাড়া খাওয়া দিশেহারা বাঙালী বাঁচার আশায় গাছ খুঁজতে খুঁজতে কি নিজেদের এখন নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়েছেন? সমস্ত রকম প্রতিকূলতা মোকাবেলা করা এই জাতি জানে বাঁচার জন্য গাছ তো কোথাও না কোথাও একটা থাকতে হবে। না থাকুক, নিদেনপক্ষে সে গাছের অঙ্কুরোদগম তো হয়েছে। পানি ঢেলে, মাটি দিয়ে, পরম যতনে পরিচর্চা করে তাকে তো বাঁচার জন্য মহীরুহে পরিনত করতে হবে। এবং, অবশ্যই সেটি করতে হবে এদেশের জনগণকেই। বাইরে থেকে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান গাছের বেশ ধরে ত্রানকর্তা সেজে সেটি কেউ করে দিয়ে যাবে, এমনকি কস্মিনকালেও ভাবার যো নেই।

এ দেশের নির্বাচনমূখী গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতার কামড়া কামড়িতে যে সর্বগ্রাসী সংকটের পাঁকে রাজনীতিবিদরা জড়িয়ে পড়েছেন, জনগণকে করে তুলেন অসহায় আতংকিত, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সকল পথ ক্রমশ: তারাই রুদ্ধ করে ফেলছেন। তারা প্রত্যেকেই অনড় রয়েছেন তাদের অবস্থানে। যদি বা কেউ একটু ছাড় দিচ্ছেন, নড়ে চড়ে বসছেন, তখনই অপরপক্ষ হয় দিচ্ছেন আল্টিমেটাম, না হয় বলছেন নট নড়ন চড়নের কথা। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের দায় দায়িত্ব, আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি, সমঝোতার ক্ষেত্র তৈরীতে ভূমিকা সবচেয়ে বেশি থাকার কথা থাকলেও তাদের অবস্থান সবচেয়ে বেশি অনড়। কারন হিসেবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগ অনেকটাই মানসিকভাবে হেরে বসে আছেন। সে কারনেই ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করা থেকে এক চুলও নড়তে রাজি হচ্ছে না। অন্যদিকে ৫ সিটি কর্পোরেশনে বিজয়ী ভাঙাচোরা বিরোধী দল অনেকটাই চাঙ্গা ফুরফুরে এবং আগামি নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত। সেজন্য তারা আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে এবং কিছুটা ছাড় দিতে রাজি আছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের টেলিফোন সমস্যা সমাধানে কতোটা প্রভাব বিস্তার করবে তারও একটি আভাস ইতিমধ্যে মিলেছে। এক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী তাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামি নির্বাচনটি হবে সংবিধান অনুযায়ী। যে সংবিধানে ইতিমধ্যে ‘ব্রুট মেজোরিটির’ জোরে পঞ্চদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে নির্বাচনমূখী গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে বড় আশংকার জন্ম দিয়ে বসে আছেন। রাজনৈতিক সমস্যাকে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের দিকে না নিয়ে অচলাবস্থার দিকে নিয়ে গেলে কি পরিনতি হয়, তা নিশ্চয়ই নেতা নেত্রীদের স্মরনে রয়েছে।

গত মে মাসে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ মাথায় অদৃশ্যমান ‘ব্লু হেলমেট’ (জাতিসংঘের শান্তি মিশন রক্ষীদের কখনও কখনও নীল বেরেট বা নীল হেলমেট নামে অভিহিত করা হয়) পরেই কি মাস ছয়েকের ব্যবধানে দ্বিতীয় বারের মতো ঢাকায় অবতরন করেছিলেন? বাংলাদেশ কি তখন থেকেই জাতিসংঘের অকথিত শান্তিরক্ষা মিশনের আওতায় চলে গিয়েছিল? জানাই আছে বাংলাদেশের সংঘাতময় পরিস্থিতি, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে জাতিসংঘ উদ্বিগ্ন। সন্দেহ নেই আমাদের, ফার্নান্দেজ যেমনটি বলেছিলেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্বকে খুবই গুরুত্ব দেয়। তিনি এমত আশা প্রকাশ করেছেন, সরকার ও বিরোধী দল সফল আলোচনার মাধ্যমে স্বচ্ছ ও সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য একটি নির্বাচন করতে সক্ষম হবে। তিনি এও মনে করছেন যে, উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের বিকল্প নেই এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জোরদার করতে আগামি সংসদ নির্বাচনের পূর্বেই একটি সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

জানা রয়েছে, কোন দেশের দ্বন্দ্ব সংঘাত যদি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রনের বাইরে গিয়ে ‘যুদ্ধাবস্থার’ মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাহলে ‘ডিপার্টমেন্ট অব পিস কিপিং অপারেশনস’ বিভাগের মাধ্যমে শান্তি ফিরিয়ে আনায় জাতিসংঘ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পিস কিপিং বাহিনী নিয়োগের আগে জাতিসংঘ বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখে। অত:পর যে দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজমান সেখানকার সরকারের অনুমোদনক্রমে বাহিনী নিয়োগ করে। এক্ষেত্রে এই নিয়োগে অবশ্যই নিরাপত্তা পরিষদের এবং যে দু’দল সংঘাতে অবতীর্ণ তাদের অনুমোদন থাকতে হয়। প্রশ্নটি এখানেই যে, এরকম কোন পরিস্থিতি বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে কিনা? একেবারেই সরকারের নিয়ন্ত্রনের বাইরে সংঘাতময় পরিস্থিতি দুই দলের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করেছে কিনা? কিংবা সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আর কোন অবস্থায় নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না। যে কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা পাঠক একমত হবেন যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনো সেরকম নয় যে জাতিসংঘের ‘পিস কিপিং মিশন’র প্রক্রিয়া এখানে শুরু হতে পারে।

ফার্নান্দেজ সফর শেষ করে যাবার পরে পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া তো দুরে থাকুক অবনতির দিকে এগিয়েছে আরো অনেকটাই। নির্বাচনের আগে এ ধরনের পরিস্থিতি যেন বাংলাদেশে রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে যেমন নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, এখনও সেই একই অনিশ্চয়তা। সেই অচলাবস্থা দেশকে নিয়ে গিয়েছিল চরম সংঘাত সহিংসতার দিকে। এর শেষ পরিনতি সকলেরই জানা আছে। সফরকালে ফানার্ন্দেজ বলেছিলেন, সময় চলে যাচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব সংলাপ শুরু করতে হবে। সংলাপ শুরু করলে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হবে। সংকট উত্তরনে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি আশংকা প্রকাশ করে এও বলেছিলেন, অবাধ, সুষ্ঠ, বিশ্বাসযোগ্য ও সবার কাছে গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে সমঝোতা না হওয়ার ফল কি হতে পারে সে সম্পর্কে সব রাজনৈতিক নেতারই ধারনা আছে।

ফলে এখন এই প্রশ্নে নতুন করে যখন সংলাপের কথা হচ্ছে, তখন সকল মহলের কাছ থেকে এই বক্তব্য আসা উচিত যে, কোন্ কোন্ পর্যায়ে সংস্কারসহ তত্বাবধায়ক নাকি অন্তবর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা বহাল করা যেতে পারে। নতুবা দেশের সুশীল সমাজসহ সকল মানুষ, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহল দুই প্রধান দলের মধ্যে সংলাপ সংলাপ করে আহাজারি করুন না কেন তাতে কতোটা ফল হবে সেরকম নজিরও জনগনের জানা আছে। আর এরকম ব্যর্থ সংলাপের পরিনতি কি হতে পারে তাও সকলের জানা আছে। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ফলপ্রসু একটি সংলাপের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তবর্তীকালীন যাই হোক না কেন, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে কোন ধরনের সরকার পদ্ধতি প্রসঙ্গে তারা একমত হবেন, নাকি দীর্ঘস্থায়ী গভীর সংকটের কবলে দেশকে ঠেলে দেবেন!

চলতি বছরে দু দু’বার বিশেষ দূত পাঠিয়ে এবং সবশেষে নিজে টেলিফোন সংলাপের উদ্যোগ নিয়ে বিষয়টির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব সবিশেষ জাতিসংঘের পক্ষ থেকে মহাসচিব বুঝিয়ে দিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোন দেশের অভ্যন্তরীন সমস্যা যাই বলা হোক না কেন, কার্যত: অভ্যন্তরীন থাকে না, এর আন্তর্জাতিক প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের সামনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যে দেশের বাইরেও উদ্বেগ রয়েছে তার প্রমান সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগীদের সরব হয়ে ওঠা। সুতরাং জাতিসংঘের যে প্রচেষ্টা চলতি বছরে শুরু হয়েছে এবং যার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে, দেশীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এর ভবিষ্যত প্রভাব কতোটা পড়বে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

গোড়ায় ফিরে আসি। অস্কার ফার্নান্দেজ ফিরে গেছেন। অদৃশ্য নীল বেরেট পরে সম্ভবত: তিনি এসেছিলেন। দৃশ্যত: জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত হিসেবে। এর পরে জাতিসংঘ মহাসচিব নিজেই যে উদ্যোগটি গ্রহন করেছেন সেটি ফলপ্রসু না হলে আগামি দিনগুলোতে সংঘাত সহিংসতা কতোটা ভয়াবহ আকার ধারন করবে সেটি সকলেই অনুধাবন করতে পারছেন। দেশকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোন দিকে নিয়ে যাবেন সেটি এখন দেখার বিষয়। অন্যথায় ফার্নান্দেজ’র আশংকা সত্যি প্রমানিত হলে ভবিষ্যতে জাতিসংঘ’র সত্যি সত্যিই বাংলাদেশে পিস কিপিংয়ের ভূমিকায় অবতীর্ন হওয়ার মতো দুর্ভাগ্য যেন জাতির জীবনে না আসে।।