Home » মতামত » বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দলাদলি মর্মান্তিক

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দলাদলি মর্মান্তিক

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং অধ্যাপক আনিসুজ্জামানএর প্রতিক্রিয়া

university-movementবিশ্ববিদ্যালগুলোতে এমনিতেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাস, ভর্তি বাণিজ্য, চাঁদাবাজিসহ নানাবিধ কর্মকাণ্ডের কারণে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একশ্রেণীর শিক্ষকদের দলাদলি। এরও শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এই পরিস্থিতিতে পুরো শিক্ষার পরিবেশই হচ্ছে বিঘ্নিত। শিক্ষকদের এই দলাদলি সম্পর্কে দু’জন খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আমাদের বুধবার এর কাছে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা যা করছেন তা রাজনীতি নয়, নিছক দলাদলি। রাজনীতির মধ্যে মতাদর্শগত বিষয় থাকে। এখানে মতাদর্শগত কোনো ব্যাপার নেই। এখানে শিক্ষকরা যেটা করছেন তা হচ্ছে তারা নিজেদের বস্তুগত স্বার্থের জন্য, সুবিধার জন্য দলাদলি করছেন। এর এতে সমস্ত শিক্ষক সমাজ জড়িত তাও নয়। এখানে দলাদলি করছেন তারাই যারা সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন এবং পাবেন বলে আশা করেন। এতে অন্য শিক্ষকদের বদনাম হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যায়ে এটি বেশি দেখা যায়। অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এমন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না হলে যেমন সিট মেলে না ঠিক তেমনি সব শিক্ষক যুক্ত নন। কিন্তু যারা সুযোগ সুবিধার জন্য জড়িত তারা ওই সব প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিভক্ত করে ফেলেন। কাজেই এটাকে রাজনীতি না বলে দলাদলি বলাই সঙ্গত। শিক্ষকরা রাজনৈতিক সচেতন হবেন তাই বাঞ্ছনীয়। কেননা শিক্ষকরা শিক্ষত, তারা অগ্রসর। তাদের রাজনীতি সচেতনতা থাকবে। এটা অতীতেও ছিল এখনো থাকা দরকার। কিন্তু তারা দলাদলিতে যুক্ত হবেন না। ক্ষমতা লাভের পথ পদ্ধতিতে তারা যুক্ত হবেন না এটাই যুক্তিসঙ্গত। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য আর তা হচ্ছে সমাজের সকল পেশার মধ্যেই ক্ষমতার এই দলাদলি ও বিভাজন দেখা দিয়েছে। শিক্ষকরা এর বাইরে থাকা উচিত। চিকিৎসকদেরও এর বাইরে থাকা উচিত। চিকিৎসকরা মানুষের দৈহিক মানসিক চিকিৎসা করছেন, শিক্ষকরা তাদের ছাত্রদেরকে শিক্ষিত করছেন। কিন্তু সেই জায়গাটি প্রাধান্য না পেয়ে যদি স্বার্থ প্রাধান্য পায় তখন নানা রকম ঘটনা ঘটে। শিক্ষকদের মধ্যে দুর্নীতি দেখা দিয়েছে। স্কুলের শিক্ষকরা পর্যন্ত যৌন হয়রানি করছেন ছাত্রীদের। এসব বিকৃতি দেখা দিয়েছে। এ সমস্ত অধঃপতনটা কেবল ব্যক্তির নয়, সমাজে যে আদর্শ চলছে তার নাম পুঁজিবাদ। এবং পুঁজিবাদের যতো বিকৃতি সবই দেখা যাচ্ছে। মুনাফালোভীতা, নিজের স্বার্থ দেখা, অবৈধ সুযোগ গ্রহণ করা এগুলো সবই পুঁজিবাদী দৌরাত্মের প্রকোপ।

একথা বলা প্রয়োজন, শিক্ষকদের যে অংশ উচ্চাভিলাসী তারা মনে করছেন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে তাদের সুবিধা হবে। আবার ওদিকে রাজনৈতিক দলগুলোও শিক্ষকদের কাছে টানছে। তারাও চায়, তাদের দল ভারি হোক। তারা অন্যান্য পেশার মতো শিক্ষকদের মধ্যেও অনুগত ও আনুগত্যের সৃষ্টি করতে চায়।

বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্বশাসন প্রশ্নে বলা যায়, সরকার স্বায়ত্বশাসন দেয়নি। দাবি করে তা আদায় করা হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র কখনো স্বায়ত্বশাসন দিতে চায় না এবং বিশ্বাস করে না। কিন্তু এই স্বায়ত্বশাসনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তারা স্বায়ত্বশাসন চায় না। তারা চায় অনুগত শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সুবিধাবাদী শিক্ষকরাও এর সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। যে অধিকারটি আন্দোলন করে অর্জন করা হয়েছিল তা এখন বিকৃত হয়ে যাচ্ছে দু’দিন থেকেই। তবে শিক্ষকদের দায়িত্বটাই এখানে বেশি। কিন্তু সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য শিক্ষকরা দলাদলি করছেন তা মর্মান্তিক। কারণ শিক্ষকদের কাছে মানুষ দৃষ্টান্ত আশা করে। দলাদলির কারণে ছাত্ররা শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে পারছেন না। ছাত্রের শ্রদ্ধাবোধ বিচলিত হচ্ছে। একজন শিক্ষককে যদি একজন ছাত্র দলীয় লোক হিসেবে দেখে তাহলে তাকে ওই দলটির সমস্ত দুর্নাম অপকর্মের ভাগিদার হিসেবেই তাকে দেখা হয়। আবার এর ফলে শিক্ষা জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের প্রসঙ্গে এখানে বলা প্রয়োজন। আদর্শ সরকার হলে তারা এই দলাদলি নিরুৎসাহিত করবে। তারা শিক্ষকদের এসব থেকে দূরে রাখবে।

এক কথায় শিক্ষকদের দলাদলি চরম ভাবে নিন্দনীয়। কারণ শিক্ষকদের কাছে দলাদলি দেশের মানুষও আশা করেন না, শিক্ষার্থীরাও আশা করে না।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের দলাদলি বরাবরই ছিল। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু মুসলমান বা কংগ্রেস মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব, পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতীয়তার পক্ষে ও বিপক্ষে ইসলামভিত্তিক সমাজ যারা চাইতেন তারা ছিলেন। এই মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব একটি রুচিমান অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর প্রকাশ কখনই অশুভ ছিল না। লেখালেখিতে, সভা সমিতিতে মতান্তর হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যাতে পরস্পরের মর্যাদা নষ্ট হয় বা সাধারণভাবে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে নতুন যে আইন করা হলো যাতে শিক্ষকদের বহুদিনের কাক্সিক্ষত অর্থাৎ শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা থাকলে সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ওই আইনে প্রতিনিধিত্বের যে ব্যবস্থা থাকলো তা আমরা অপব্যবহার করলাম। সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নির্বাচন হতে পারতো। কিন্তু আমরা জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নিয়ে গেলাম নানা রকম দলাদলির পক্ষে। এবং জাতীয় সংসদে যেভাবে সরকারি দল বিরোধী দল থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সেভাবে হলে গেল। এর ফলে যেটা হচ্ছে, যারা বিরোধী দলে থাকেন তারা বলে থাকেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ দলের আনুগত্যের বিচারে হচ্ছে, যোগ্যতার বিচারে হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এবং শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকদের ভাবমূর্তি খুবই ক্ষুণ্ন হয়ে গেল। তারপরে আরো নানাভাবে শিক্ষকরা যে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন যেমন জাহাঙ্গীনগরে আমরা যেটা দেখছি, পরিস্থিতিটা এমন পর্যায়ে চলে গেল যে, সব ধরনের শালীনতা ও সঙ্গতির সীমা অতিক্রম করলো। আমরা নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করছি এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায়, আমার বিবেচনায়, শিক্ষকরা শিক্ষার ক্ষতি করছেন। আমি এ জন্য আইনের দোষ দেবো না। আইন যেভাবে ব্যবহার করেছি, প্রয়োগ করেছি তার দোষ দেবো। আমাদের সকলের চৈতন্য হওয়া উচিত। কারণ এভাবে চললে বিশ্ববিদ্যালয় তার মর্যাদা সমূলে হারাবে। এখন চেষ্টা করতে হবে মতপার্থক্য সত্ত্বেও এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্বার্থে। আমি একথাও বলবো, আমরা যে সব সময় জাতীয় রাজনীতির ভিত্তিতে বিভক্ত থেকেছি তা নয়, অনেক সময় ব্যক্তিগত স্বার্থও আমাদের মধ্যে কাজ করে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিছুকাল আগেও দেখলাম যে, একই দলের মধ্যে দু’ভাগ হয়ে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, শেষ পর্যন্ত যা আদালত পর্যন্ত গড়াল। এগুলো খুবই মর্মান্তিক।

আমি বলবো, দলাদলি সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে নষ্ট করছে। প্রায় সবক’টি বিশ্ববিদ্যালয়। সুতরাং আমাদের বিকল্প খুঁজতে হবে। আমি সরকারকে দায়ী করবো না। তবে এটা ঠিক যে, সরকার সব সময় তাদের অনুগত ব্যক্তিকে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দেখতে চায়। নিয়োগ হয় আগে পরে হয় নির্বাচন। এর ফলে যে ধরনের স্বাধীনতা থাকা উচিত সেই স্বাধীনতাও ক্ষুণ্ন হয়। কিন্তু আমরা প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যা করছি এর জন্য তো আমি সরকারকে দায়ী করতে পারি না।।