Home » আন্তর্জাতিক » ভারতে ভূমি সম্পদে করপোরেট থাবা

ভারতে ভূমি সম্পদে করপোরেট থাবা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ওয়েবসাইট অবলম্বনে

india-demonstrationকৃষিপ্রধান ভারতে কৃষির ওপরই বেশি জোর দেওয়ার কথা। আর এ জন্য প্রয়োজন নানামুখী সংস্কার কর্মসূচি। কিন্তু দেশটি এ দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। ভারতে এ পর্যন্ত কৃষকদের জন্য একটি কমিশনই গঠিত হয়েছে। প্রখ্যাত জিনতত্ত্ববিদ এম এস স্বামীনাথনের নেতৃত্বে ওই কমিশন দুই বছর পরিশ্রম করে তাদের পঞ্চম ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। এই প্রতিবেদনে ভারতের কৃষি ব্যবস্থার কিছু দিক এবং সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে ছিল: ‘ভারতীয় কৃষি সঙ্কটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: ভূমি সংস্কারে অসম্পন্ন এজেন্ডা, পানির মান ও পরিমাণ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সহজলভ্যতা, পর্যাপ্ততা ও সময়ানুগতা এবং নিশ্চিত ও মুনাফামূলক বিপণনের সুযোগের অভাব। এসব সমস্যার সঙ্গে যোগ হয় আবহাওয়াগত জটিলতা। কৃষকদেরকে ভূমি, পানি, জৈব সম্পদ, ঋণ ও বীমা, প্রযুক্তি এবং বিপণন ও ব্যবস্থাপনার জ্ঞানসহ মৌলিক সম্পদে প্রবেশাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রদান করা প্রয়োজন।’

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাত বছর কেটে গেছে। এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুপারিশগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে সযত্ন কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। তবে অতি সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রে এবং কয়েকটি রাজ্যে কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যুরোক্রেট ও টেকনোক্রেট কৃষিতে সরকারি বেসরকারি অংশীদারি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ তথা পিপিপি) ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কোমড় বেঁধে নেমে পড়েছেন। তারা এটাকেই সর্বরোগহর ওষুধ বিবেচনা করছেন। এই ব্যবস্থায় কৃষি পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে করপোরেট খাতের ভূমিকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শরদ পাওয়ার, ডজন খানেক রাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই নীতি গ্রহণ করেছেন। এমনকি কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিও এর পক্ষে রয়েছে। কৃষক কমিশনও পিপিপি’র প্রতি কিছুটা হলেও পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেছিল। তবে তাতে পিপিপির ভূমিকাটি কেবল ভূমি সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের মতো বিষয়ে ভর্তুতি দেয়ার ক্ষেত্রেই সীমিত ছিল। কিন্তু সরকার এবং করপোরেট খাত বর্তমানে যেভাবে পিপিপি নীতি গ্রহণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে তারা কেবল কমিশনের সুপারিশের ওপর থেমে থাকতে রাজি নয়। তথাকথিত এই সর্বরোগহর ওষুধটি বেশ কয়েকটি রাজ্যে কার্যকর করতে সর্বাত্মক প্রয়াস চালানো হচ্ছে।

পিপিপি কার্যকর করার কাজ সাবলীলভাবে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে কৃষিবিষয়ক এক জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেটা উদ্বোধন করেন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি। এতে পিপিপি’র মাধ্যমে ভারতে দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘোষণার ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল আরো কয়েক মাস আগে, আগস্টে। ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয় বেশ কিছু প্রকল্পে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এতে রাজ্য সরকারের তদারকিতে এবং জাতীয় পর্যায়ের সংস্থাগুলোর সহায়তায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দরজা খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

জাতীয় সম্মেলনের পর ২০১৩ সালের জানুয়ারিতেই ‘ক্ষুদ্র কৃষি ব্যবসা কনসোর্টিয়াম’ (এসএফএসি) – এর ভূমিকা নির্ধারণের জন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পিপিপি কাঠামোতে বলা হয়েছিল, কনসোর্টিয়াম রাজ্য ও করপোরেটগুলোকে কারিগরি সমর্থন ও সহায়তা দেবে।

এই কাঠামোতে বলা হয়েছে, ভারতের মোট ভূমির ৮৩ শতাংশ এখন প্রান্তিক বা ক্ষুদ্র আকারের। কৃষকদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব ভূমি জরুরি ভিত্তিতে অখণ্ড না করলে কাক্সিক্ষত কল্যাণ আসবে না।

পিপিপি কর্মসূচির একটি বিষয় হলো চুক্তিবদ্ধ কৃষি। বাস্তবে দেখা গেছে, এসব চুক্তি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলেই হয়ে থাকে। অন্ধ্রপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে এ নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার দেখা গেছে, এসব চুক্তি লেখা হয় ইংরেজিতে, যে ভাষাটি কৃষকেরা বোঝে না। ফলে চুক্তিটি কৃষকের কাছে অনেকটা অজ্ঞাতই থেকে যায়।

ইতোমধ্যে ১৭টি রাজ্যে সরকার পিপিপি স্কিম বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আর তাতে অন্তত ২৫টি করপোরেট প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। এসব করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে রিলায়েন্স, এসার, ভারতি এন্টারপ্রাইজ ডেল মন্টে প্যাসিফিক লি., দি আদানি গ্রুপ, আইটিসি, গোদরেজ, ম্যারিকো, টাটা ক্যামিকেলস ও নেসলে। এসব প্রতিষ্ঠান কনফেকশনারি শিল্পের জন্য আলু ও টমেটো চাষের দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া তামাক, সূর্যমুখি, তুলা ও দুগ্ধজাত সামগ্রীর দিকেও নজর দিচ্ছে। সার্বিকভাবে পিপিপি উদ্যোগে অতিপ্রয়োজনীয় শস্য উৎপাদনের দিকে উৎসাহ কম দেখা যাচ্ছে।

এসব নিয়ে যতই আশাবাদ ব্যক্ত করা হোক না কেন, বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। বিভিন্ন স্থানে এ নিয়ে ছোটখাট যেসব প্রকল্প এগিয়েছে, তাতে সুখকর ফল পাওয়া যায়নি। ১৯৯০ এর দশকের শেষ দিক থেকে ২০০০ এর দশকের প্রথম পর্যন্ত অন্ধ্রপ্রদেশের চিতোর জেলারকুকপামে প্রথম চুক্তিবদ্ধ খামার প্রকল্প চালু থাকে। এছাড়া বছর পাঁচেক আগে উত্তরপ্রদেশ ও পাঞ্জাবেও পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়। এতে দেখা যায়, পিপিপি’র মাধ্যমে কাজের কাজ যেটা হয়েছে সেটা হলো ভূমি দখল, কৃষকের জমি করপোরেটের করায়ত্ত হওয়া।

তৃণমূল পর্যায়ে যেসব বিশেষজ্ঞ হাতেকলমে কাজ করে কৃষিকে সমৃদ্ধ করতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তারা কিন্তু পিপিপি পদ্ধতির বিরোধী। তাদের মতে, পিপিপি’র আশ্রয় নেওয়া হলে সমাজের চাহিদা, টেকসই কৃষি এবং প্রকৃতির প্রতি সুবিচার করা হয় না। বরলং ইনস্টিটিউট ফর সাউথ এশিয়ার কৃষি বিজ্ঞানী রাজগুপ্তা বলেন, কৃষিকে পিপিপি’র কাছে ছেড়ে দেওয়া হলে তারা কেবল মুনাফার দৃষ্টিতে সবকিছু বিবেচনা করবে। অন্য কিছুই তারা ভাববে না।

উত্তর প্রদেশের গবেষক সুভাষ দেসওয়ালের অভিমতও অনেকটা একই রকমের। বড় বড় করপোরেট হাউজগুলো ভারতীয় পরিবেশে খামারমুখি কর্ম সংস্কৃতি প্রচলন করতে পারবে কি না তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তিনি বলেন, সরকার যদি কৃষকদের জন্য কিছু করতেই চায়, তবে সরকারের উচিত স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানানসই কৃষি অবকাঠামো নির্মাণ করা।

সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, পিপিপি মডেলের আওতায় কৃষি খাতকে করপোরেট নিয়ন্ত্রণে তুলে দেওয়া হলে তা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে। এর পরিণতিতে কৃষি সঙ্কট আরো বাড়তে পারে, সেইসঙ্গে ভূমিদস্যূদের তৎপরতাও বৃদ্ধি পাবে।।