Home » রাজনীতি » রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়মুক্তি

রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়মুক্তি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

political-consessionকাজ করতে গিয়ে এর বিপরীতটি করে বসা এদেশের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের জন্য নতুন নয়। আর সে সবের দায় অনিবার্যভাবে চাপে সরকার এবং সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রীর ওপর। সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসেও এই প্রবণতা একটুও কমেনি। সূচের মতো সুযোগ থাকলেও যে ফালের মতো সুযোগ তৈরি করতে পারেন, তা দেখালেন রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনায় করা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করতে গিয়ে। বর্তমান সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে হয়রানির উদ্দেশ্যে করা মামলা প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করতে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়, যার অধীনে ছিল বিভিন্ন জেলার কমিটি। কার্য পদ্ধতিতে বলা হয়েছিল জেলা কমিটিগুলো প্রাথমিক যাচাই বাছাই করে ২০০৯ সালের আগে করা মামলার তালিকা জাতীয় কমিটিতে পাঠাবে এবং জাতীয় কমিটি চূড়ান্ত যাচাই বাছাই করে সুপারিশ করবে মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য। গত বৃহস্পতিবারের আগে হয়েছিল ৩০টি বৈঠক আর বৃহস্পতিবার হলো ৩১তম ও শেষ বৈঠক এখানেই হলো চরম কাণ্ড। বৈঠক শেষে আইন প্রতিমন্ত্রী জানালেন, ২৭৭টি মামলা প্রত্যাহারের জন্য উত্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১৬৬টি নতুন এবং আগে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে, বাতিল হয়েছে এমন ১১টি মামলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নতুন মামলার মধ্যে ৪২টি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং ১১১টির মধ্যে ৩০টি আংশিক ও পুরোপুরি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।

এমনিতেই আগের ৩০টি বৈঠকে যে ৭ হাজার ১০১টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল তা নিয়েই বিতর্ক উঠেছিল। কারণ ওই রাজনৈতিক বিবেচনার মামলা প্রত্যাহারের সুযোগে খুন, ডাকাতি ও অগ্নিসংযোগের মতো অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও দলীয় বিবেচনায় মুক্তি পেয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও ছিল। তবে গত বৃহস্পতিবার ৩১তম বৈঠকটিতে হল অভাবনীয় এক কাণ্ড। আগে যাও জেলা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করেছিল জাতীয় কমিটি এবার অধিকাংশ মামলার ব্যাপারেই জেলা কমিটির সুপারিশ ছিল না। ১৬৬টি নতুন মামলার মধ্যে ১১২টির ব্যাপারেই জেলা কমিটির সুপারিশ ছিল না, যেগুলোর মধ্যে হত্যা মামলাই ছিল ৬০টি। এছাড়া ডাকাতি, ধর্ষণ, সরকারি টাকা আত্মসাত ঘুষ লেনদেন, অপহরণ, জালিয়াতি, অবৈধ অস্ত্র সংক্রান্ত মামলাও ছিল। জেলা কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোন মামলা জাতীয় কমিটিতে আসার কথার নয়। কিন্তু মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য আর প্রভাবশালী নেতাদের চাপে ৩১তম সভায় মামলাগুলো এসেছিল। এগুলোর মধ্যে ৩৬টির আবেদন ২০০৯ সালের ১২ জুলাই এর মধ্যে করা হয়নি, অথচ নিয়মে তাই ছিল। ফলে যা হয়েছে তা হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের এলাকার ১৬টি, এছাড়া কমিটির পক্ষ থেকে রাজশাহীর ২৫ বছরের পুরনো একটি খুনের মামলা এবং বর্তমান সংসদ সদস্য সুবিদ আলী ভূইয়া ও আমানুর রহমান খানের বিরুদ্ধে থাকা মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। এছাড়া টঙ্গী থানার ১টি ও সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের ১টি খুনের মামলা থেকে দুজন আসামির নাম প্রত্যাহারসহ মতিঝিল থানার তিনটি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় উদাহরণটি সৃষ্টি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর। নিয়ম মোতাবেক ২০০৯ সালের ১২ জুলাই এর মধ্যে আবেদন জেলা কমিটির মাধ্যমে পাঠানো কথা থাকলেও তিনি আবেদন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে দায়িত্ব প্রাপ্তির পর। অথচ তিনি আগে থেকেই সংসদ সদস্য ছিলেন।

মামলা প্রত্যাহারের সুযোগে কতো যে ঘটনা ঘটেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এই সুযোগেই লক্ষ্মীপুরের তাহের পুত্রকেও রেহাই দেয়া হয়। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, এসিড অপরাধের মামলার আসামিরাও রাজনৈতিক বিবেচনায় খালাস পেয়ে গেছে। সংগঠনটি বলছে, এডিস অপরাধের মামলা কিভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিবেচ্য হতে পারে?

২৫ বছর আগের একটি মামলাও প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে ৩১তম বৈঠক থেকে। রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় ১৯৮৮ সালে মামলাটি হয়েছিল শিবির নেতা আসলাম হত্যাকাণ্ড নিয়ে, ৩৩ জন ছিল আসামি। ১৪তম সভায় ৯ জনের নাম প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়। পরে এ বছরের জানুয়ারি মাসে আরও ২৪ জনের প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়।

বৃহস্পতিবারের সভা শেষে আইন প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, মাত্র ৭২টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন জেলা কমিটির সুপারিশ নেই এমন কোনো মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। মাদকের কোন মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। তবে কয়েকটি খুনের মামলা প্রত্যাহারের কথা স্বীকার করেন তিনি। বেশ জোর দিয়ে বলেন। ফেনীর সাংবাদিক টিপু সুলতানের নির্যাতনের ব্যাপারে জয়নাল হাজারির বিরুদ্ধে করা মামলাটি বহাল রাখা হয়েছে আগে যেটি প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও কয়েকটি প্রশ্ন তো উঠতেই পারে এক. নিজেদের তৈরি নিয়ম জেলা কমিটির দ্বারা সুপারিশের মাধ্যমে জাতীয় কমিটিতে সিদ্ধান্ত সেটা কেন মানা হলো না? দুই. খুন ধর্ষণ, ডাকাতি, অগ্নিসংযোগ, চুরি, অর্থ আত্মসাতের মতো মামলা কেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মামলার মধ্যে ফেলা হলো? তিন. কেন নির্ধারিত তারিখের পরের সুপারিশ আমলে নেয়া হলো? হত্যা ও ডাকাতি মামলার আসামিদের এই ছাড় দেয়ার অর্থ কি এই নয় যে, সামনের দিনগুলোতে ওই সব কাজগুলোর আরো প্রয়োজন পড়বে! রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পালিত সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা এদেশে নতুন ঘটনা যদিও নয় কিন্তু তার তো শেষ হওয়া প্রয়োজন।

সরকারের কর্তাব্যক্তি যারা এসব করেছেন তারা যুক্তি দেখাতে পারেন, এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। হ্যাঁ এর আগে বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের আমলে ৫ হাজার ৮৮৮টি মামলা সর্ম্পূণ প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং ৯৪৫টি মামলা থেকে বেশ কিছু আসামিকে খালাস দেয়া হয়েছিল। প্রবণতাটা নিঃসন্দেহে মারাত্মক। এবার সংখ্যাটা যে আরো বাড়ছে তা বলাই বাহুল্য। ইতোমধ্যেই আগের রেকর্ড ভেঙেছে আওয়ামী লীগ সরকার। ৩১তম সভা মিলিয়ে মোট মামলা প্রত্যাহারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ২৭৩টি। যা বিএনপির আমলের চেয়ে প্রায় ২ হাজার বেশি।

যুক্তি হয়তো এটাও হতে পারে আওয়ামী লীগ বড় দল এবং তার ওর মইনুদ্দিন ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে অত্যাধিক মামলার চাপাচাপি করা হয়েছিল। অবশ্যই এটা অনস্বীকার্য তবে এটাও তো ঠিক যে মইনুদ্দিন ফখরুদ্দীন আমলে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আরো বেশি হয়রানিমূলক মামলা দেয়া হয়েছিল। সেই মামলাগুলোর কটিকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে? হয়েছে বটে তবে তা মোট মামলার এক শতাংশও নয়।

যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশে এখন চলছে তাতে সমতাভিত্তিক কিছু আশা করাও বোকামি। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অবশ্যই রাজনৈতিক বিবেচনা গণতান্ত্রিক বিবেচনাও হওয়া উচিত। আর তাই যদি হয় তাহলে জনগণের নিরাপত্তা এবং আস্থা বৃদ্ধির জন্য মারাত্মক অপরাধীদের ব্যাপারে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্বটাও সরকারের। উল্টো সরকারই যদি খুনি ডাকাত দুর্বৃত্তদের ছেড়ে দেয় আর তাদের রাজনৈতিক পরিচিতি দেয়ার ব্যবস্থা করে ক্ষমতাসীন দল তাহলে জনসাধারণ নাচার। কী করবে তারা? দেখাই যাচ্ছে আগের আমলে ৭৩ হাজার অপরাধী অব্যাহতি পেয়েছিল এবারও যদি সমসংখ্যক অপরাধী অব্যহতি পায় আর তার অর্ধেকও সরকারের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত হয় তাহলে জনজীবনের শান্তি থাকবে কোথায়? পুলিশ এমনিতেই অভিযোগ করে দেশের অপরাধীর সংখ্যার তুলনায় পুলিশের জনবল কম। এর ওপর রাজনৈতিক বিবেচনায় খালাস পাওয়া অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেলে তাদের আর কিছু করার থাকবে না। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ডুববে।

জনসাধারণ এমনিতেই ঢুকে আছে অনিশ্চয়তার কফিনে তাতে শেষ পেরেকটি মারার সময় নির্বাচনটা খুব যুৎসই ই হয়েছে বলতে হবে ক্ষমতাসীনদের জন্য। ভীতিটা বিরোধী দলের জন্য নয়, এটা জনগণের জন্যই। যারা ব্যবসা বাণিজ্য করছেন অর্থনীতিকে সচল রাখছেন তারাই নিশ্চিত হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছেন। কারণ নির্বাচনমুখী পরিবেশে সবারই অর্থ লাগবে অতিরিক্ত অর্থ। আর এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা সেই অর্থ কামাবে বড় ব্যবসায়ী ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদন বিপননকারী আর পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। এই নৈরাজ্য ঠেকাবে কে? প্রধানমন্ত্রী কি পারবেন?