Home » অর্থনীতি » গতিহীন মন্থর অর্থনীতি

গতিহীন মন্থর অর্থনীতি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

economyদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ নতুন উচ্চতায় অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে সংরক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এই নিয়ে চলতি বছরে কয়েক দফায় শত কোটি ডলার রিজার্ভ বেড়েছে। মূলত, আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি রফতানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিপাচ্ছে। মুদ্রাবাজারে ডলারের তেমন চাহিদা নেই। টাকা দিন দিন হচ্ছে শক্তিশালী। মূল্যমান খোয়াচ্ছে মার্কিন ডলার। টাকা শক্তিশালী হওয়ায় প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) ও রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে শঙ্কা ব্যক্ত করছেন বিশেষজ্ঞরা। মধ্য মেয়াদে এই দুই পক্ষই নিরুৎসাহিত হচ্ছে। যে কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে ডলারের মূল্যমান ধরে রাখার একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে থাকে কেন্দ্রিয় ব্যাংক। বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটা তৎপরতা থাকে ডলারের মূল্য ধরে রাখার। ডলারের চাহিদা না থাকায মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ৭৭ দশমিক ৭৫ টাকা। এক বছর ব্যবধানে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকা ৭ শতাংশের বেশি মূল্যমান সঞ্চয় করেছে। এদিকে, বাজার থেকে ডলার কিনে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশী মুদ্রার রির্জাভ বাড়িয়ে চলেছে। অথচ আমদানি, বিনিয়োগ কমছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আইএমএফ থেকে পাওয়া বাণিজ্য ঘাটতি রোধে প্রতিশ্রুত সহায়তা। দেশের অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছেই পর্যাপ্ত ডলার রয়েছে। অতিরিক্ত ডলার থাকার কারণে কোন কোন ব্যাংক ডলার বিক্রি করছে। কিন্তু ক্রেতা কম থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা কিনে নিচ্ছে। অন্যদিকে আইডিবির কাছ থেকে প্রথমে ১০০ কোটি ডলারের একটা ঋণ সুবিধা পাওয়া গেলেও পরে তা ২৫০ কোটিতে উন্নীত হয়। এটিও রিজার্ভ বাড়ার অন্যতম কারণ। এর সাথে আইএমএফ থেকে সরকার যে ঋণ নিয়েছে তার তিনটি কিস্তিও রিজার্ভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন, একটি দেশের রিজার্ভ দিয়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের আমদানি করার ক্ষমতা থাকলে তাকে স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়। তাই এতো পরিমাণ রিজার্ভ অলস না রেখে বিনিয়োগে আনতে হবে। কিন্তু গভর্নর তাদের মতের বিরোধীতা করে বলেন, এ রিজার্ভেই আত্মতৃপ্ত হওয়া যাবে না। যে কোনো পরিস্থিতিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হতে পারে। তখন স্বভাবতই রির্জাভ কমে যাবে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। এতে ব্যবসায়ীরা শঙ্কিত। নির্বাচনের আগে বিনিয়োগ করে কেউ পুঁজির ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। তাই, বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড় জমছে। উচ্চ সুদের কারণে কেউ ঋণও নিতে চাইছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যাচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকিং খাতে ৭০ হাজার ছয়শ ৪৪ কোটি টাকা অলস পড়ে আছে (জুলাই ২০১৩)। এটি মোট তারল্যের (মোট নগদ মুদ্রা) প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। তাই, তারা হাত গুটিয়ে বসে আছেন। নগদ অর্থ যাদের কাছে আছে, তারা তা ব্যাংকে রেখে দিয়েছেন। তাই, ব্যাংকগুলোতে তারল্য (নগদ মুদ্রা) বাড়ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ব্যাংকিং খাতে অলস টাকা ছিল ৬০ হাজার কোটি। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৫৮ হাজার কোটি। ডিসেম্বরের পর থেকে প্রতি মাসেই ব্যাংকগুলোয় তারল্য বাড়ছে। তারল্য বাড়ার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকে অব্যবহৃত টাকা ছিল ৬১ কোটি ৭০ লাখ, মার্চে ৬৬ কোটি, এপ্রিলে ৬৯ কোটি, মে মাসে ৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সবশেষ জুনে তারল্য দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি ছয় শ’ ৪৪ লাখ টাকায়। প্রত্যেক তফসিলি ব্যাংকেই সব মিলিয়ে তার তলবি ও মেয়াদি দায়ের ১৯ শতাংশ তারল্য জমা রাখতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। কিন্তু, অতিরিক্ত তারল্য থাকার কারণে ব্যাংকগুলো তারল্য রেখেছে প্রায় ৩১ শতাংশ (জুলাই)। জানা যায়, মহাজোট সরকারের সাড়ে চার বছরের বেশিরভাগ সময়ই তারল্য সংকটে ভুগেছে ব্যাংকগুলো। এবারই প্রথম উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের পুরো সময়জুড়েই ছিল ঋণ সংকট। ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না ব্যাংকে। ব্যাংকে টাকার জন্য ঘুরে হতাশ হতে হয়েছে অনেক ব্যবসায়ীকেই।

বিনিয়োগ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে এফবিসিসিআই এর সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করবে কীভাবে? যেখানে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে ছাত্র সংগঠনগুলে। আমরা মনে করি না, বিনিয়োগের কোনো পরিবেশ বর্তমানে আছে। তাই, অলস টাকার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।’ এফবিসিসিআই এর সহ সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, এটি নির্বাচনী বছর। অপরদিকে, ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার। কীভাবে বিনিয়োগ করবো আমরা? এই অবস্থায় সম্ভব না। বিনিয়োগ করতে গেলে সে সম্পদ দেখিয়ে বিনিয়োগ করতে হয়, তা শেষ হয়ে যাবে। এটি কোনো ব্যবসায়ীই চায় না।’ হেলাল উদ্দিন জানান, ব্যাংকের সুদের হার ২০ থেকে ২২ শতাংশ। এ সুদে কেউ বিনিয়োগ যাবে। নির্বাচনী বছরে অনিশ্চয়তার কারণেও অনেকে বিনিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ তার মেয়াদের পুরো সময় প্রকাশ্যে ঋণ সংকটের কথা বলেছেন। এ নিয়ে তিনি দেন দরবারও করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে। কিন্তু, ২০১৩ সালের চিত্রটি পুরোপুরি উল্টো। ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের পেছনে ঘুরছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু, বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার ব্যবসায়ী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে, ব্যাংকিং খাতে জমেছে বিপুল অঙ্কের বাড়তি তারল্য।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্ট ড. আকবর আলি খান বলেন, রিজার্ভ স্বস্তিকর পর্যায়ে থাকুক এটা সবাই চায়। কিন্তু বাংলাদেশের রিজার্ভে রেকর্ডের অন্যতম কারণ হচ্ছে আমদানি কমে যাওয়া। এটি ইতিবাচক নয়। কারণ আমদানি কমে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রিজার্ভ বেড়ে যাবার প্রধান কারণ বিনিয়োগ কমে যাওয়া। বিনিয়োগ কম হবার ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এসব আমদানি কমেছে। তিনি বলেন, রিজার্ভ যদি কোন কাজে না আসে তাহলে তা যত বড় অংকেরই হোক অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল দেবে না। অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক নিুমুখী। এমন কি প্রবৃদ্ধিও কমছে। এক্ষেত্রে তিনি রিজার্ভকে বিনিয়োগে নিয়ে আসার জন্য সরকারকে কিছু প্রণোদনা নীতি ঘোষণার পরামর্শ দেন। তবে এ প্রণোদনা যাতে মূল্যস্ফীতিকে উস্কে না দেয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

দেশে বিনিয়োগ নিবন্ধনের ব্যাপক অবনতি হয়েছে ২০১২ ১৩ অর্থবছরে। গত অর্থবছরে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। স্থানীয় প্রস্তাবের পরিমাণও কমেছে ১০৮ কোটি ডলার। আগের বছরের তুলনায় উভয় ধরনের বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে ২৭৬টি।

উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বছরজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে হরতাল ও সহিংসতা এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসেননি। এ কারণে গত অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধনে স্থবিরতা দেখা গেছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ এবং অবকাঠামো সংকটের প্রভাবও পড়েছে নতুন বিনিয়োগে। তাদের মতে, রাজনৈতিক সংকটের অবসান না হলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি চাঙ্গা হওয়ার সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্টরা এসব কারণে গত অর্থবছর অন্য সময়ের তুলনায় নিবন্ধিত বিনিয়োগের বাস্তবায়ন হারও অনেক কম হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে কতকগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, সেটির সঠিক কোনো হিসাব বিনিয়োগ বোর্ডে (বিওআই) নেই। চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার মতো তথ্য নেই। বিওআই কর্মকর্তাদের মতে, স্বাভাবিক সময়ে নিবন্ধিত মোট বিনিয়োগের আনুমানিক ৭০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু এই সময়ের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।

বিওআইর ২০১২ ১৩ অর্থবছরের নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে ৫৬০ কোটি ডলারের। ২০১১ ১২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৬৭৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় নিবন্ধন কমেছে ১৬ শতাংশ। আগের বছরের ১ হাজার ৭৩৫টি নিবন্ধনের বিপরীতে গত অর্থবছরে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ১ হাজার ৪৫৭টিতে। অন্যদিকে শতভাগ বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ নিবন্ধনের চিত্র আরও ভয়াবহ। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭৩ কোটি ডলার। ২০১১ ১২ অর্থবছরে নিবন্ধন হয়েছিল ৪৪৭ কোটি ডলার। অর্থের হিসেবে এক বছরে নিবন্ধন কমেছে ৩৯ শতাংশ। বিওআইর তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ সংক্রান্ত সব ধরনের হিসেবেই ২০১২ ১৩ অর্থবছর বাজে সময় পার করেছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ার লক্ষণ প্রতিফলিত হয়েছে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির তথ্যেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, আলোচ্য অর্থবছরে মোট ৩ হাজার ৩৯৭ কোটি ডলারের সমপরিমাণ পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫৫২ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র বা এলসি নিষ্পত্তি কম হয়েছে ১৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল নিষ্পত্তি কমেছে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ, পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য ২ শতাংশ, শিল্পে ব্যবহৃত অন্যান্য মেশিনারি নিষ্পত্তি কমেছে ৪ দশমিক ২১ শতাংশ।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির জ্যেষ্ঠ ফেলো ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অন্তত ৫টি কারণে বিনিয়োগের এ পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। প্রধানত, নির্বাচনের বছরের হিসাব, হরতাল ও সহিংস রাজনীতির জের। ব্যাংকে অলস টাকা পড়ে থাকলেও সুদের হার না কমানো। তার মতে, মানুষের প্রকৃত আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে। এসব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন কোনো বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছেন না।

রফতানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন ইএবির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, দেশে বর্তমানে বিনিয়োগ পরিবেশ নেই। এ কারণে দেশি বিদেশি নতুন বিনিয়োগের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। এমনিতেই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সংকট এবং ব্যাংকের উচ্চ হারের সুদের কারণে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত। হরতাল ও সহিংস রাজনীতির কারণে নতুন করে বিনিয়োগ করতে চাইছেন না।।