Home » অর্থনীতি » তেল কোম্পানিগুলোর উন্মত্ত সন্ত্রাস

তেল কোম্পানিগুলোর উন্মত্ত সন্ত্রাস

এরা পৃথিবী ধ্বংসকারী ভূসন্ত্রাসী

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

oil terroismসচেতনভাবে বর্ণবাদী বা জাতিগত হত্যাযজ্ঞ পরিচালনাকে আমরা বলি গণহত্যা (জেনোসাইড)। আর সচেতনভাবে পরিবেশগত হত্যাযজ্ঞ পরিচালনাকে বলা হয় বাস্তুহত্যা (ইকোসাইড)। কিন্তু আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, সেটাকেই যদি সচেতনভাবে হত্যা করা হয়, সেটাকে কী বলা হবে জানি না। অবশ্য, পৃথিবী ধ্বংসের বিষয়টি কিছু দিন আগেও অজ্ঞাত ছিল। সবেমাত্র জানা গেছে। আমরা প্রতিনিয়ত যাদের কারণে ভয়াবহ যন্ত্রণার মুখোমুখি হচ্ছি, তাদেরকে বলি সন্ত্রাসী। এর সঙ্গে পৃথিবীর ল্যাতিন শব্দটি মিলিয়ে পৃথিবী ধ্বংসকারীদের বলা যায় ভূসন্ত্রাসী (টেরাসাইড)

আমরা তাদের যে নামেই ডাকি না কেন, আমাদের পৃথিবী ধ্বংসকারী এসব সন্ত্রাসী সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলা দরকার। হ্যাঁ, আমরা জানি, /১১ একটি ভয়াবহ ঘটনা। প্রায় তিন হাজার লোক নিহত হয়েছিল, বিশাল বিশাল টাওয়ার ভূপাতিত হয়েছিল। কেয়ামতের মতো বিষয়। সাম্প্রতিক বোস্টন ম্যারাথনে বোমা হামলাটাও সন্ত্রাসী কাজ। তবে উভয় ক্ষেত্রেই দায়ীদের তাদের কৃতকর্মের সাজা পেতে হচ্ছে বা হবে।

ভূসন্ত্রাসীদের কি কিছু হবে? এসমস্ত লোক এক্সনমোবিল, শেভরন, কনোকোফিলিপস, বিপি, শেল ইত্যাদি নামে বিশ্বের সবচেয়ে মুনাফামূলক করপোরেশনগুলো চালায়। আর তাদের মুনাফার শিকার হতে হবে আপনার ছেলেমেয়ে ও নাতিনাতনিদের। আপনি একটা বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন: পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ করা সত্ত্বেও একজন ভূসন্ত্রাসীকেও কখনো জেলে যেতে হবে না, যদিও তারা ভালোমতোই জানে তারা কী করছে।

পৃথিবী ধ্বংসের কথা শুনলে হয়তো আপনার গা গুলিয়ে যায়। কিন্তু এসব সন্ত্রাসীর বিবেক একটুও কাঁপে না। পুরো পৃথিবীকে নিংড়ে মুনাফা হাতিয়ে নিতে তাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধাগ্রস্ত দেখা যাবে না। যতই দিন যাচ্ছে, তারা আরো উন্মত্তভাবে এবং নির্মমতার সঙ্গে জীবাশ্ম তেল নিংড়ে তুলছে। আর এই তেল পোড়ানোর মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে রেকর্ড পরিমাণ কার্বনডাইঅক্সাইড ছাড়ছে। গত মে মাসেই মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রতি মিলিয়নে ৪০০ পার্টস। বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেক আগেই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, পৃথিবী যদি বর্তমান হারে উষ্ণ হতে থাকে, অর্থাৎ গড়ে তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে থাকে, তবে সমূহ বিপদ ঘনিয়ে আসবে সাগরের পানি বাড়ায় উপকূলীয় এলাকাগুলো ডুবে যাবে, তাপদাহ তীব্রতর হবে, আরো বেশি বেশি খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি আসবে।

টাকার খেলা

বিষয়টিতে কোনো রহস্য নেই। এটা বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে রয়েছে। নাসার বিজ্ঞানী জেমস হ্যানসেন ১৯৮৮ সালে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বাস্তবতা নিয়ে প্রথম কংগ্রেসকে লিখিতভাবে অবহিত করেন। মজার ব্যাপার হলো, এই প্রতিবেদনের জন্য ভূসন্ত্রাসীদেরও ভূমিকা ছিল।

যারা বড় জ্বালানি করপোরেশনগুলো পরিচালনা করে, তারা জানে তারা ঠিক কী করছে। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে কী লেখা হয়, সাধারণ মানুষের মতো তারাও সেগুলো পাঠ করে। আর তারপর তারা কি করে? তারা থিঙ্ক ট্যাংক, রাজনীতিবিদ, ফাউন্ডেশন, বিজ্ঞান সম্পর্কে দ্বিধার (যদিও আসল ঘটনা অস্বীকার করা যায় না) সৃষ্টিতে পারঙ্গম কর্মীদের পেছনে টাকা ঢালে। তারা ও তাদের মিত্ররা লুণ্ঠন করার কাজটি বিনা বাধায় অব্যাহতভাবে করে যেতে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম রাখতে চায়। তা যাতে নির্বিঘ্নে হয় সেজন্য তারা লবিস্ট নিয়োগ করে।

সর্বোচ্চ তেল আহরণকারীরা যখন অনেক বছর আগেই বলেছিল যে,তাদের উৎপাদন অল্প সময়ের মধ্যেই চরম সীমায় পৌঁছে যাবে, তারপর তা হ্রাস পেতে থাকবে, তখন তারা ভুল বলেনি। তারা প্রচলিত কিংবা ঐতিহ্যবাহী মজুতক্ষেত্র থেকে জ্বালানি আহরণের কথা বলেছিল। কিন্তু তারপর তারা দুর্গম খনি থেকে জ্বালানি সংগ্রহের দিকে মনোনিবেশন করে। এজন্য তারা বিপুল অর্থ ও জনশক্তি নিয়োগ করেছে। এর ফলে তারা এখন গভীর সমুদ্র, আলকাতরা বালু থেকেও তেল সংগ্রহ করতে পারছে।

এসব জ্বালানিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মাইকেল ক্লার ‘চরম’ বা ‘কঠিন’ জ্বালানি হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিপুল শক্তি, সম্পদ ও রাসায়নিক ব্যবহার করে তারা এই জ্বালানি ব্যবহারযোগ্য করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব তেল অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ তেলের চেয়ে বেশি কার্বনডাইঅক্সাইড নিঃসৃত করে। আগে যেসব জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়নি, সেগুলো করায়ত্ত করার মাধ্যমে এসব কোম্পানি জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা পালন করছে। মুনাফার জন্য পৃথিবীকে পুরোপুরি গলিয়ে দিতেও তাদের সমস্যা নেই।

ওসামা বিন লাদেনের ৯/১১ কিংবা সারনায়েভ ভ্রাতাদের বোস্টন ম্যারাথনে বোমা হামলা যদি সন্ত্রাসী কাজ হিসেবে চিহ্নিত হয়, তবে এর চেয়েও জঘন্য কাজ করা জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে কেন একই শ্রেণীতে ফেলা হবে না? আর সেটাই যদি হয়, তবে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলো কেন তাদের দায়িত্ব পালন করছে না? তারা কেন সন্ত্রাসীদের মতো করে ভূসন্ত্রাসী গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনছে না?

যে বিকল্প পথে হাঁটা হয়নি

আমেরিকার জনজীবনে যখন গ্যাস লাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুর্ভোগ নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার ছিল, সেই সময় ১৯৭৯ সালের ১৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার সরাসরি আমেরিকান জনগণের উদ্দেশ্যে কথা বলেন। টেলিভিশনে প্রচারিত তার ৩২ মিনিটের বক্তব্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা অবসানে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা প্রদানের কথা ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কৃত্রিম রাবার করপোরেশন যেভাবে আমাদেরকে যুদ্ধ জয়ে সাহায্য করেছিল, ঠিক সেভাবেই আমাদের জাতির ইতিহাসে কয়লা, তেল শিলা, গ্যাসোহোলের উদ্ভিজ্জ পণ্যরাজি, অপ্রচলিত গ্যাস, সূর্যকিরণ ইত্যাদি থেকে আমেরিকার জন্য নিজস্ব বিকল্প জ্বালানি উন্নয়নে শান্তিকালীন বৃহত্তম তহবিল ও সম্পদ যোগানোর আহ্বান জানাচ্ছি। যাতে আমরা জ্বালানি যুদ্ধে জয়ী হতে আমেরিকার প্রত্যয় ও সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে পারি। অধিকন্তু, আমি শিগগিরই এই জাতির প্রথম সোলার ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য আইন প্রণয়ন করতে কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন করব। এটা আমাদেরকে ২০০০ সাল নাগাদ সৌর শক্তি থেকে আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ২০ শতাংশ জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।’

এটা ঠিক যে ওই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিজ্ঞান ছিল আঁতুরঘরে। পৃথিবী অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে এমন কিছুও কার্টারের জানা ছিল না। তাছাড়া তার ‘বিকল্প জ্বালানি’ ঠিক জীবাশ্মমুক্তও ছিল না। কিন্তু তবুও বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের নিরিখে বলা যায়, তিনি বলেছিলেন, সৌদি আরবের চেয়ে অনেক গুণ বেশি তেল আমাদের মাটির নিচে মজুত আছে। এখনো এটাকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বক্তৃতা বিবেচনা করা হয়।

সেদিন যদি বিকল্প জ্বালানির দিকে বিপুল সম্পদ ও জনশক্তি বিনিয়োগ করা হতো, তবে আজ আমরা কোথায় থাকতে পারতাম? তবে তখন তিনি কিন্তু প্রশংসিত হননি। মিডিয়া পর্যন্ত তার বক্তৃতাকে ‘অসুস্থ মস্তিস্কজাত প্রলাপ’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। প্রথমদিকে তার আহ্বানে জনগণ ইতিবাচক সাড়া দিলেও মিডিয়ার প্রচারণার ফলে তারাও বিভ্রান্ত হয়। পরিণতিতে প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনাটি উদ্ভট বিষয়ে পরিণত হয়, কয়েক দশকের জন্য হিমাগারে চলে যায়।

কার্টার প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে হোয়াইট হাউজে ৩২টি সোলার প্যানেল বসিয়েছিলেন। আমেরিকার ইতিহাসে এটা সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ পরিগণিত হতে পারত। কিন্তু আমেরিকানরা ওই পথে হাঁটেনি। ১৯৮১ সালে ওভাল অফিসে প্রবেশ করে রোন্যাল্ড রিগ্যান যুগের হাওয়া ঠিকমতোই টের পেয়েছিলেন। তিনি প্রথম যেসব আদেশ দিয়েছিলেন, সেগুলোর অন্যতম ছিল ওইসব প্যানেল সরিয়ে ফেলা। কয়েক দশকের মধ্যে ওভাল অফিসে আর সোলার প্যানেল বসেনি। ওই অবস্থার অবসান ঘটান বারাক ওবামা।

কার্টার আরেকটি কাজ করেছিলেন। সোলার প্যানেল বসানোর ছয় মাস পর ১৯৮০ সালের ২৩ জানুয়ারিতে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে তিনি পারস্য উপসাগরে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। তিনি সামরিক শক্তিসহ যেকোনোভাবে আমেরিকার স্বার্থ প্রতিরোধ করার কথা বলেন।

তার এই ঘোষণায় কেউ হাসেনি। বরং সবাই তাকে সমর্থন করে। দ্রুত তার প্রস্তাব বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যায়। পারস্য উপসাগরে মার্কিন (এবং তেল) স্বার্থ রক্ষায় পেন্টাগন কাজ শুরু করে দেয়। উপসাগরে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন হয়। আবার যুক্তরাষ্ট্রেও চলছে তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম। বড় বড় কোম্পানি এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই নতুন সৌদি আরব বানানোর কাজ করছে।

এর পরিণতি কি হবে? অনেক অনেক তেল আবিষ্কৃত হতে পারে, আর এর ফলে আরো বেশি কার্বনডাইঅক্সাইড নিঃসরিত হবে, পৃথিবী ধ্বংসের কাজ আরো জোরালোভাবে চলতে থাকবে। তারা যে বিপুল মুনাফা করেছে, তা দিয়ে তারা বিপদমুক্ত পৃথিবী গড়ার কাজটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে করতে পারত। প্রকৃত বিকল্প জ্বালানিতে (সৌর, বাতাস, স্রোত, ভূ তাপ, শৈবাল ইত্যাদি থেকে) বিপুল বিনিয়োগ করতে পারত (তারা মাঝে মাঝে প্রচারকাজের জন্য এটা করে, প্রকৃত বিকল্প অনুসন্ধান তাদের লক্ষ্য নয়।)। আর তা করা হলে আমরা ভিন্ন একটি দুনিয়া পেতাম। সেটা করে তারা বিপুল মুনাফাও বাগিয়ে নিতে পারত। কিন্তু সেদিকে তারা হাঁটছে না। তারা পৃথিবী ধ্বংস করার পথ ধরেছে।

এটা যদি সন্ত্রাসী কাজ না হয়, তবে কোনটিকে আপনি সন্ত্রাস বলবেন? জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কাজ যদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিবেচিত না হয়, তবে একে কি বলবেন আপনি?

মাথায় ভর করে থাকা তাৎক্ষণিক মুনাফার কুটিল চিন্তায় আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী ধ্বংস করা করছে, বিবেকের কোনো ধরনের দংশন অনুভব ছাড়াই, তারাই কি জঘন্যতম অপরাধটি করছে না? এটাই কি ভূসন্ত্রাস নয়?

(টমডিসপ্যাস ডটকম থেকে ভাষান্তর)