Home » শিল্প-সংস্কৃতি » দুই আমেরিকান পরিবারের কথা – দুরাবস্থার প্রামাণ্যচিত্র

দুই আমেরিকান পরিবারের কথা – দুরাবস্থার প্রামাণ্যচিত্র

ওয়েবসাইট অবলম্বনে

two-american-familiesসম্প্রতি আমেরিকান একটি চ্যানেলে ‘টু আমেরিকান ফ্যামিলিস’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। অনেকের মতে এটি চলতি বছরের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক এবং একইসঙ্গে সেরা প্রামাণ্যচিত্র। এটা মানব ইতিহাসের একটি কঠোর বাস্তবতা কিংবা না বলা কঠিন পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। আমেরিকার শ্রমজীবী পরিবারগুলোর নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া প্রামাণ্যচিত্র এটা। তাদের দুরাবস্থা এত শোচনীয় পর্যায়ে চলে যায় যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় ফেরার আশাও শেষ হয়ে যায়। একটু স্বস্তির আশায় ছুটতে ছুটতে প্রতিনিয়ত আরো জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। সুখ সোনার হরিণই থেকে যায়। কল্পনা কখনো বাস্তব হয়ে ধরা দেয় না। হাত বাড়ালেই এ ধরনের জীবনের সন্ধান পাওয়া যায়, অথচ এগুলোই থাকে সবার অগোচরে। নির্মাতা সেই কঠোর সত্যই তুলে ধরেছেন সাবলীলভাবে।

বিল ময়ার্স তার ‘মিনিমাম ওয়েজ দ্য নিউ ইকোনমি’ নামের প্রামাণ্যচিত্রটি শুরু করেন মিলওয়াকির দুটি পরিবারের জীবন নিয়ে। স্ট্যানলি ও নুম্যান পরিবার দুটি ১৯৮০ এর দশকে কেন্দ্রীয় নির্মাণ শিল্পের চাকরির ওপর নির্ভর করত। আমরা ১৯৯১ সালে নুম্যান (টেরি ও টনি নামের শ্বেতাঙ্গ দম্পতি) ও স্ট্যানলি (জ্যাকি ও ক্লাউডি দম্পতি) পরিবারের চাকরি চলে গেছে। ময়ার্স এরপর ১৯৯৫ ও ২০০০ সালে আরো দুটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে পরিবার দুটিকে নিয়ে। তারপর গত বছর তিনি সবটা মিলিয়ে নির্মাণ করে ‘টু আমেরিকান ফ্যামেলিস।’

পরিবার দুটি আইন লঙ্ঘন করেনি। তাদের ওপর দৃশ্যত কোনো বেআইনি কাজও করা হয়নি। কিন্তু আইনের মধ্যেই তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হন। বলা যায়, আইনের প্যাচালো শব্দগুলোও তাদের গলার ফাঁস হয়ে দেখা দেয়। আইনের কাছে তাদের অপৌরষেয় আত্মনিবেদনই ফুটে ওঠেছে এতে।

তারা চার্চে হাজির হতেন, ক্লাউডে তো চার্চের মিনিস্টারই ছিলেন। তারা সরকারি সাহায্য গ্রহণকে ঘৃণা করতেন। এর বদলে বরং সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের কাজ করতে প্রস্তুত ছিলেন। তাদের বাচ্চারা বয় স্কাউট ছিল। তাদের মা বাবারা তাদের শিক্ষার প্রতি সর্বাত্মক নজর দিত। পরিবার দুটি এত সৎ এবং আমেরিকান ওয়ার্ক ইথিক এমনভাবে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিল যে সমস্যাগ্রস্ত অন্য আমেরিকানদের সঙ্গে তাদের মিলই নেই। যেসব আমেরিকান কাজ অবহেলা করে কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার বলয়ে থেকে কর্মবিমুখ জীবনযাপন করে, এমন লোক তারা নন। অবশ্য চার্লস মারের মতো অনেকে মনে করেন, আমেরিকার ওয়ার্কিং ক্লাসের পতনের কারণ নৈতিক, সামাজিক মূলধন, ব্যক্তিগত দায়দায়িত্ব ও ঐতিহ্যবাহী কর্তৃত্বের অবক্ষয়। সম্প্রতি প্রামাণ্যচিত্রটির সম্পর্কে লিখতে গিয়ে জর্জ প্যাকার মারেদের ধারণার তীব্র সমালোচনা করেছেন। সত্যিকার অর্থেই পরিবার দুটির মধ্যে ব্যক্তিগত দায়দায়িত্ব উপচে পড়ছিল।

প্রামাণ্যচিত্রটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ এমন যে টনি নুম্যান ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মিলওয়েকিতে একটি মাঝারি মানের ছিমছাম বাড়ি কেনার অল্প দিন পরই ব্রিগস অ্যান্ড স্ট্যাটনে তার চাকরি খোয়ান। ১৯৯১ সালে তার কাঁধে ঋণের বিশাল বোঝা। ২০১২ সালে প্রামাণ্যচিত্রটি যখন শেষ হয়, তখন পরিবারটি ওই বাড়িতে ২৪ বছর পার করে দিয়েছে। এখন জেপি মরগ্যান ওই বাড়িতে বাস করার জন্য টেরির কাছে এক লাখ ২৪ হাজার ডলার দাবি করল। ওই টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের ছিল না। ব্যাংক বাড়িটি বিক্রি করে দিল ৩৮ হাজার ডলারে। ন্যুমানরা ২৪টি বছর ক্লান্তিহীন ও বিরতিহীনভাবে কাজ করে গেছেন, যদিও কোনোকালেই তারা স্বচ্ছলতার মুখ দেখেননি।

১৯৯০ এর দশকে পরিবার দুটি একের পর এক বিপর্যয়, কম বেতনের চাকরি, সদা উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটায়। ১৯৯১ সালে ক্লাউডি স্ট্যানলি গরিবি মজুরিতে কায়িক শ্রমের কাজ নেন। জ্যাকি তার রিয়েল এস্টেটের লাইসেন্স পান। আমরা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্ট্যানলিদের সাথে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনকে দেখি। তাদের দুই ছেলে কিথ ও ইয়ং ক্লাউডি জুনিয়র। দুইভাইয়ের মধ্যে ক্লাউডি জুনিয়রকে দেখা যায় আশাবাদী, কিথ নিরাশাবাদী। রিগ্যান আমলের কথাও মনে আছে কিথের। এই ছেলেটিই পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করে। এখন কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়। তখনই তাদের আর্থিক টানাপোড়েন ভয়াবহ পর্যায়ে পড়ে। কিথের পড়াশোনা চালানোর জন্য নতুন ক্রেডিট কার্ডের দরকার হয়। আর এজন্য ১৮ শতাংশ সুদে এক হাজার ডলার নিতে হয়। ১৯৯৮ সালে তাদের ৩০ হাজার ডলার মেডিক্যাল বিল বকেয়া পড়ে। শোধ করার সামর্থ্য থাকে না তাদের। স্ট্যানলি পরিবারের বাচ্চাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ক্লাউডি নৌবাহিনীতে কাজ নিলেন। কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য চক্রবৃদ্ধি সুদে যে ক্রেডিট কার্ড নেওয়া হয়েছিল, তার ঋণ সুধাবার জন্য কিথকে দুটি চাকরি করতে হয়।

এসব কিছুই ঘটেছিল অর্থনৈতিক ঊর্ধ্বগতির সময়ই। ৬০ বছর বয়সেও ক্লাউডিকে কায়িক পরিশ্রমের দুটি চাকরি করতে হচ্ছিল। তিনি ছিলেন বিধ্বস্ত, তবে তবুও তা স্বীকার করতে চাইছিলেন না। অবসর গ্রহণ কোনো বাস্তবসম্মত অবস্থা ছিল না। নুম্যানদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। টেরি সত্যিকার অর্থেই কর্দপশূন্য গৃহহীন হয়ে পড়েন।

তাদের ছেলেরাও কায়িক পরিশ্রমের কাজ করতে থাকে। তবে এদের মধ্যে কিথ শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখে। সে তার কলেজ ডিগ্রি নিতে সক্ষম হয়, ভালো একটা চাকরিও পায় অবশেষে। আর টেরিকে বলতে শোনা যায়, আমি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কাজ করে যাব। তারপর হাঁটু মুড়ে মারা যাব।

প্রামাণ্যচিত্রটি কেবল দুটি পরিবারের নয়, বরং ‘অর্থনীতি’র শিকার হাজারো পরিবারের কথা বলে। দশকের পর দশক ধরে বিশেষ নীতির কারণে ভয়াবহ যেসব বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে, সেটাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এটা হয়তো আপনি বা আপনার পরিবারের বিষয় নয়। আপনারা হয়তো মহামন্দার মধ্যেও দারিদ্র্যে পড়বেন না। তবে আমেরিকার ৯৯ শতাংশ সম্পদ যে ১ শতাংশের মুঠোয় রয়েছে, আপনি যদি তাদের একজন না হয়ে থাকেন, তবে সামান্য ভুলের কারণেও আপনি অথৈ সাগরে পড়ে যেতে পারেন, আঁকড়ে ধরার জন্য খড়কুটোও পাবেন না। আপনি যত পরিশ্রমই করুন বা যত ঘণ্টাই কাজ করুন না কেন, আপনি স্বচ্ছলতার মুখ দেখবেন না। প্রামাণ্যচিত্রটি মাথা গরম করে দেয়।।