Home » অর্থনীতি » বিটি বেগুন – বাংলাদেশের কৃষিতে কর্পোরেট আগ্রাসন

বিটি বেগুন – বাংলাদেশের কৃষিতে কর্পোরেট আগ্রাসন

ফরিদা আখতার

BT Brinjalইংরেজি ‘কলোনি’ কথাটার আমরা অনুবাদ করি ‘উপনিবেশ’, ‘কলোনিয়ালিজম’ তাহলে ‘উপনিবেশবাদ’। এতে দখলদারির ভাবটা ঠিক আসে না। তবে এটা বোঝা যায় যে বিদেশী কোন শক্তি নিজ দেশের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে এবং সেটা তাদের দখলে রাখবার জন্য সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, আইন আদালত এবং শিক্ষা ব্যবস্থাসহ নানান ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছে। এদেশের ভূখণ্ড এক সময় বৃটিশদের দখল ছিল, আমরা পাকিস্তানের সঙ্গেও লড়েছি। ইংরেজদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রাম হয়েছে, কিন্তু তাদের যুদ্ধে পরাজিত করে আমরা নিজেরা নিজেদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করিনি। সেটা হয়েছে রাজনৈতিক দেনদরবারের মধ্য দিয়ে। ফলে ঔপনিবেশিক সম্পর্কের উৎখাত ঘটেনি, পাকিস্তান পশ্চিম ও পূর্ব অংশের মধ্যে সেটা ভিন্ন ভাবে পুনর্বহাল হয়েছে। এরপর লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এরপরে আমরা হয়তো দাবি করতে পারতাম আমরা আসলেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আমাদের ঔপনিবেশিক মনমানসিকতা থেকে আমরা মুক্ত হইনি। ভুখণ্ড থেকে আগ্রাসী শক্তিকে সরাতে পারলেও দীর্ঘদিনের তৈরী করা ঔপনিবেশিক মানসিকতা দূর করতে আমাদের বেগ পেতে হচ্ছে। ভাষা, সংস্কৃতি, পোষাক, আইন, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা মানসিকভাবে এখনো সেই দাসত্বের মধ্যেই আছি। অর্থাৎ ভুখণ্ডকে দখলদারি থেকে মুক্ত করা সহজ, কিন্তু মানসিক পরাধীনতা থেকে মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন কাজ।

দখলদারির ধরণ একালে বদলে গিয়েছে। একসময় একটি জনগোষ্ঠিকে পদানত রাখতে হলে তার ভূখণ্ড দখল রাখতে হোত। এখন দখল রাখা হচ্ছে বীজ, পানি, জ্বালানি। একটু ভেবে দেখা যাক। আমাদের জমি আছে, কিন্তু ফসলের বীজ নাই; নদী আছে, সমুদ্র আছে কিন্তু পানির হিস্যাদার আমরা নই। এই অবস্থা তো ঔপনিবেশিকতার চেয়েও ভয়াবহ। কিন্তু খুব কম মানুষ আছে যারা বোঝে বাংলাদেশের কৃষক যদি ফসলের বীজ হারায় আর তা চলে যায় বিদেশী কম্পানির হাতে তাহলে তার পরিণতি একটি জনগোষ্ঠির জন্য কী হতে পারে। পানির মালিকানা যদি জনগণের না থাকে আর তা হয়ে যায় কম্পানির সম্পত্তি তাহলে মানুষ বাঁচবে কি করে। আমাদের জীবন জীবিকা, খাদ্য ব্যবস্থা, বীজ ও কৃষি উৎপাদনের প্রকাশ্যেই আগ্রাসন চলছে। কিন্তু আমরা বেহুঁশ হয়ে রয়েছি। এই আগ্রাসন কোন একটি দেশের সমরিক বাহিনী এসে করে দিচ্ছে না, বরং বিজ্ঞানের নামে আমাদেরই বিজ্ঞানীদের দিয়ে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং মন্ত্রণালয়ের দ্বারা অনুমোদিত করে নিয়েই করা হচ্ছে। আমাদের দেশ প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে মোটেও গরিব নয়। কৃষিতে আমরা কখনোই পশ্চাদপদ ছিলাম না। আমাদের ছিল ১৫,০০০ জাতের ধান, আর শাক সব্জি, ডাল, ফলমুলের শত শত জাত। দেশটি ছোট হলেও ৫৭,০০০ বর্গ মাইলের মধ্যে অঞ্চল ভেদে রয়েছে কৃষি ফসলের নানা বৈচিত্র্য। উত্তরে যে ধান হয়, দক্ষিনে কিংবা পূর্ব পশ্চিমে মাটির ধরণ, পানি, আবহাওয়া অনুযায়ী রয়েছে জাতের পার্থক্য। কৃষকরা সেই সব ভিন্ন জাত রক্ষা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। কৃষির প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর অবদান রয়েছে অপরিসীম। আর বীজ রক্ষা তো একান্তই নারীর বিষয়। মেয়েদের জ্ঞানের ওপর কৃষি ব্যবস্থার প্রধান খুঁটিটি তৈরী হয়েছে।

আমরা এখন এমন এক সময়ের মধ্যে যাচ্ছি যখন বীজ বিপন্ন। বিজ্ঞানিরা বলেন, আসলে চলছে বীজ ডাকাতি (biopiracy)। আমাদের বলা হোল আমাদের দেশীয় জাত ভাল না, আমাদের নিতে হবে উচ্চ ফলনশীল জাত। আর আমাদের সব বীজ চলে গেল বিদেশীদের হাতে। সেগুলি এখন আছে বিদেশিদের জিন ব্যাংকে। এমনকি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ফোর্ট নক্স, ফোর্ট কলিন্স ইত্যাদি জায়গায়। এটাও শেষ নয়। বীজ বিকৃতির চেষ্টা শুরু হয়েছে। কোথায় টমেটো আর কোথায় মাছ। কিন্তু মাছের জিন ঢুকিয়ে কোয় দেওয়া হচ্ছে টমেটোর মধ্যে যেন টমেটো পঁচে না যায়। বিজ্ঞানের নামে আমাদের দেশে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি দিয়ে বীজের বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে। বেগুনের গাছের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে মাটিতে বাস করে এমন ব্যাক্টেরিয়ার জিন। স্থানীয় জাতের বেগুন বিকৃত করে সেটা ‘বিটি বেগুন’ নামে কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক চাষের জন্য অনুমোদনের অপেক্ষা করছে। এটা কি আসলেই কোন বৈজ্ঞানিক অবদান, নাকি আমাদের প্রাণ ও পরিবেশ ধ্বংস করে আমাদের পরাধীন করবার একটি প্রক্রিয়া, আমাদের বীজের ওপর সরাসরি আগ্রাসন?

ষাটের দশক থেকে শুরু হয়েছে সরকারের মাধ্যমে কৃষিতে প্রথম আগ্রাসন। সবুজ বিপ্লব বলে আনা হোল তথাকথিত উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের ধান, তার সঙ্গে সার কীটনাশক ও সেচের জন্যে মাটির তলা থেকে পানি তোলার প্রযুক্তি। ঢুকে গেল কৃষিতে ব্যবসায়ী স্বার্থ ও কর্পোরেট কোম্পানির সরাসরি সম্পৃকক্ততা। সরকার থেকে বলা হোল, এটা আধুনিক কৃষি, কাজেই সরকারি সাহায্যে কৃষি করতে হলে উফশী জাত ব্যবহার করতে হবে, সরকার সার কীটনাশক সেচের পানি দেবে। প্রথমে দিয়েছিল বিনা পয়সায়, পরে ভর্তুকী দিয়ে আর এখন নাম মাত্র ভর্তুকি বাদ দিলে উচ্চ মুল্যে সেই সব কিনতে হচ্ছে কৃষককে। উফশী করতে গিয়ে স্থানীয় ধানের জাতের চাষ কমিয়ে দেয়া হোল। হাজার হাজার জাতের পরিবর্তে এখন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ জাতের চাষ করা হয়। উচ্চ ফলনশীল বীজের ফলন বেশী পাওয়ার জন্যে আগে যে পরিমান সার লাগতো এখন তার চেয়ে দ্বিগুন বা তিন গুন লাগে, অর্থাৎ খরচ বেড়ে যায়। তাই উচ্চ ‘ফলন’শীল বীজ নয় এখন হয়ে গেছে উচ্চ ‘খরচ’শীল কৃষি। কৃষক খরচ বহন করতে না পেরে শহরে এসে রিক্সা চালাচ্ছে, ঋণগ্রস্থ হচ্ছে। এদিকে মাটির উর্বরতা শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, কীটনাশকের অতি ব্যবহারের কারণে পোকার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে, বন্ধু পোকা মাকড়, প্রজাপতি, মৌমাছি, জোনাকী কিছুই নাই। প্রাণবৈচিত্র্য নষ্ট হয়েছে, মাটির তলার এবং উপরের পানি বিষাক্ত হয়েছে।

এই ক্ষতির কথা এখন আধুনিক কৃষির পক্ষের বিজ্ঞানীরাও অকপটে স্বীকার করেন, শুধু সাফাই গাওয়ার জন্য বলেন যে জনসংখ্যা বেশী বলে অধিক খাদ্যের দরকার ছিল। কিন্তু যখন প্রশ্ন করা হয় খাদ্য উৎপাদন বাড়ল কোথায়? মাছ কই? দুধ, ডিম, মাংস কই? তেল, ডাল কই? কিছু কিছু ধানের উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু সেটা ফলনের জন্য যতোটা নয় তার চেয়ে বেশী অনেক জমি চাষের আওতায় আনার কারণে। সে বিতর্কে এই মুহুর্তে না গিয়ে বলতে পারি আধুনিক কৃষির কারণে খাদ্য উৎপাদন পরিমানগতভাবে বাড়লেও তার খাদ্য মান, পুষ্টি মান অনেক কমে গেছে, এবং বিষাক্ত হবার কারণে মানুষের মধ্যে অসুস্থতা বেড়েছে অনেক বেশী।

দ্বিতীয় পর্যায়ের আগ্রাসন আসলো হাইব্রীড বীজের মাধ্যমে। গত শতাব্দীর ৮০ দশকের শেষে এবং বিশেষ করে নব্বই দশকে বেসরকারী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, কীটনাশক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এলো হাইব্রীড বীজ, বা প্রজনন ক্ষমতাহীন শংকর বীজ। ‘বীজ’ বলা হলেও এগুলো আসলে বীজ নয়, সার ও বিষের মতো কৃষি উপকরণ। কারণ এই বীজের ধান গাছ থেকে বীজ হয় না। এই বীজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতি বছর নতুন করে বীজ কিনে এনে বুনতে হবে। ফসল থেকে সরাসরি বীজ রাখা যাবে না। ব্যবসায়ীরা বীজ বিক্রি করতে লাগলেন সাবান বা শ্যাম্প্যুর মতো রঙিন মোড়কে ঝকঝকে ছবি দিয়ে। ধান, ফুল কপি, ঢেঁড়স, বাধা কপি, বেগুনসহ শহরের মধ্যবিত্তদের ব্যবহারের সব্জিগুলো বাজারে এলো হাইব্রীড কোম্পানির মাধ্যমে। হাইব্রীড বীজে কীটনাশক উফশীর চেয়ে বেশী দিতে হয়। কীটনাশক কোম্পানিগুলো তাই কীটনাশকের পাশাপাশি বীজ ব্যবসায়ে নেমে গেছে তাদের কীটনাশকের বিক্রি নিশ্চিত করার জন্য। এই দিক থেকে বলা যায় হাইব্রীডের অপর নাম হচ্ছে কীটনাশক। হাইব্রীডে অন্য সব পণ্যের মতো বিজ্ঞাপন দিয়ে বেড়ায় আর উচ্চ ফলনের দাবি করে। রেডিও টেলিভিশনে পত্র পত্রিকায় তারা বিজ্ঞাপন দিয়ে মিথ্যা দাবী করে। এর ওপর সরকারের বা কোন কর্তৃপক্ষের কোন নিয়ন্ত্রণ নাই। কৃষক সাধারণ বীজ যে দামে কেনে তার চেয়ে ১০ গু দাম বেশি দিয়ে এই বীজ কিনে প্রতারিত হয়। বীজের সঙ্গে কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে তাদের খরচ অনেকগুন বেড়ে যায়। অথচ ফলন আশানুরূপ হয় না এবং বাজারেও দাম সেভাবে দাম পাওয়া যায় না।

উফশী ও হাইব্রীডের দ্বারা এতো ক্ষতি করার পর কৃষি মন্ত্রণালয়ের উচিৎ ছিল দেশের মানুষ এবং কৃষকদের জন্য যা উপকার তা করার। কিন্তু দুঃখের বিষয় তার ধারে কাছে না গিয়ে সরকার এবং আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা এমন প্রযুক্তি নিয়ে আসছেন যেগুলো আরও অনিশ্চিত ও ক্ষতিকর প্রমাণিত। তারা আনছেন কৃষকের সঙ্গে কোন প্রকার আলোচনা ছাড়া। এই প্রযুক্তির নাম হচ্ছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বা জেনেটিকালী মডিফাইড ফসল। সহজ বাংলায় জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিকৃতি ঘটানো বীজ। ফসলের নিজস্ব প্রাণ সংকেত বদলে দিয়ে কোম্পানির নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য তার ঘঠনে পরিবর্তন ঘটিয়ে দাবী করা যে তারা নতুন আবিস্কার করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিটি বেগুনের জন্য যে অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে তা আর কিছুই নয় সরাসরি আমাদের দেশের স্থানীয় জাতের বেগুনের জেনেটিক কারিগরির আগ্রাসন।

বিটি বেগুন তাই একটি জিএমও। অর্থাৎ, প্রাণের গঠন সংকেতে (Gene) বিকৃতি ঘটাতে সক্ষম সেই ধরণের প্রযুক্তি (Genetic Engineering) ব্যবহার করে আমাদের পরিচিত সব্জি বেগুনে বিকৃতি ঘটানো একটি বিপজ্জনক উদ্ভিদ। ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস (বিটি) ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্রিসটাল জিন বেগুনে সংযোজন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হিশেবে বলা হয়েছে বেগুনের ফল ও কা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ভারতের মহারাষ্ট্র হাইব্রীড বীজ কোম্পানি বহুজাতিক বীজ কোম্পানি মনসান্টোর সহায়তায় বেগুনের জিন বিকৃতির এ কাজটি সম্পন্ন করে ২০০৫ সালে। একই সময় বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনে বিটি বেগুন নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়।

বিটি বেগুন গবেষণা একই সাথে ভারত ও ফিলিপাইনে করা হলেও,এসব দেশে এখনো কোন ছাড়পত্র পায় নি, বরং ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয় বহুজাতিক কোম্পানি মনসান্টোর স্থানীয় সহায়ক মাহিকো উদ্ভাবিত বিটি বেগুন ছাড়ের উপর মরেটোরিয়াম জারি করেছে (দি হিন্দু, ৯ ফেব্রুয়ারি,২০১০)। এমনকি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন প্যানেল অনির্দিষ্ট কালের জন্য জিএম ফসলের সব রকম মাঠ পরীক্ষা বন্ধের সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে ফিলিপাইনের কোর্টে গ্রীনপিস দক্ষিণ পুর্ব এশিয়ার একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বিটি বেগুনের মাঠ পর্যায়ের গবেষণা বন্ধের জন্যে আদেশ দেয়া হয়েছে (Philippines Court of Appeals issues writ against trials for Bt Brinjal, May 25, 2013, fnbnews.com) জানা গেছে যে ভারতে ছাড়পত্র পেতে ব্যর্থ হয়ে তারা ফিলিপাইনে চেষ্টা চালিয়েছে। এখন তাদের শেষ চেষ্টা হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই গবেষণা কাজ সম্পূর্ণ হবার আগে এবং এর পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে নিশ্চিত না হয়েই তারা কৃষক পর্যায়ে উন্মুক্ত চাষের অনুমতি চাচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে তারা গিনিপিগ হিশেবে ব্যবহার করতে চায়।

বাংলাদেশে বিটি বেগুনের গবেষণা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক শুরু হয়েছে। অথচ এই প্রযুক্তি কৃষকের ক্ষেতে উন্মুক্ত চাষাবাদ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। দেশের মানুষকে এ বিষয় সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হচ্ছে কেন? আজ সেটাই একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ ও কৃষকদের ভাগ্য বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে ৯টি স্থানীয় জাতের বেগুনের জাত বিটি বেগুন উদ্ভাবন কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরা বেগুন, কাজলা বেগুন, খটখটি বেগুন এবং চট্টগ্রামের দোহাজারির একটি জাত বিটি বেগুনের বীজ ছাড় করানোর লক্ষ্যে অনুমোদনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন কৃষকদের শত শত বছরের উদ্ভাবিত বেগুনের জাতের ওপর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করার জন্যে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার অধিকার বারির মতো প্রতিষ্ঠানকে কে দিয়েছে? জাতগুলো ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মাহিকো কম্পানির ল্যাবরেটরিতে তাদের ওপর কারিগরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি) নিজস্ব কেন্দ্রে বিকৃত বেগুন গবেষণা পরিচালনা করছে বলে জানা গেলেও এর ফলাফল নিয়ে সরকার এখনো কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য তুলে ধরতে পারেনি। অথচ সম্প্রতি দু’একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বিটি বেগুনের বীজ শীঘ্রই কৃষক পর্যায়ে ছাড়া হচ্ছে। শাখা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার প্রতিরোধী বিটি বেগুনের বীজ ছাড়ার অনুমোদন চেয়ে বারি কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন চেয়েছে জুনের মাঝামাঝি সময়ে। অনুমোদন পাওয়া গেলে শীঘ্রই কৃষক পর্যায়ে চাষের জন্যে ছাড়া হবে। (সকালের খবর, ২৩ জুন, ২০১৩)। একই সপ্তাহে ইংরেজী দৈনিক The Financial Express (২৬ জুন, ২০১৩)বারি কর্তৃক কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমতি চাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে এর পরিবেশগত ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ রবি এবং খরি মৌসুমে ২০০৯ ১০ সালের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিশাব অনুযায়ী মোট ১১৫৪২৪ একর জমিতে ৩৪১২৬২ মেট্রিক টন বেগুন উৎপাদন করা হয়। এই সব্জি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দেশে এবং বিদেশে এর চাহিদা রয়েছে। শুধু তাই নয় এই সব্জির মধ্যে রয়েছে প্রোটিন, শর্করা, খনিজ লবন, ভিটামিনসহ অনেক পুষ্টিগুণ।

বাংলাদেশে বেগুনের ওপর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কৃষকের চাহিদার কারণে হয়নি, বরং এটা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি এর আর্থিক সহায়তায় বহুজাতিক বীজ কোম্পানি মনসান্টোর ভারতীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাহিকো সিড কোম্পানির সহায়তায়। ২০০৫ সালে ভারত, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনে এইসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অন্যন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে বিটি বেগুন উদ্ভাবনের কাজ করা হয়। বিটি বেগুন নিয়ে গবেষকদের লেখা থেকে জানা গেছে, ইতোমধ্যে বারি’র কেন্দ্রীয় গবেষণা খামার গাজীপুর ছাড়াও আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র যেমন রংপুর, যশোর,পাবনা, চট্টগ্রাম, রংপুর এবং জামালপুর এই বিপজ্জনক গবেষণায় জড়িত। এই সব স্থানে বারি এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন বোর্ড দিয়ে Confined Field Trial করা হচ্ছে, কিন্তু সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় গবেষণা নিয়ম নীতি খুব একটা মেনে চলা হচ্ছে না। অর্থাৎ, যেভাবে এলাকাটি ঘিরে রাখা দরকার যাতে পশুপাখি, মানুষ যেন যেতে না পারে সেই রকম ঘিরে রাখা হচ্ছে না।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে গবেষণা পদ্ধতির মধ্যে যদি ত্রুটি থাকে তাহলে তার ফলাফল নিয়েও সংশয় থেকে যাবে। অথচ এসব বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই আমাদের দেশের বিশাল জনগোষ্ঠির মধ্যে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, বিকৃত বেগুন যা খুব বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।।