Home » বিশেষ নিবন্ধ » রাষ্ট্রটি দখলদারদের কোনোক্রমেই যৌনকর্মীদের নয়

রাষ্ট্রটি দখলদারদের কোনোক্রমেই যৌনকর্মীদের নয়

আমীর খসরু

brothel১৯৮০ দশকের শুরুতে নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এবং ঢাকার রথখোলার কান্দুপট্টির দীর্ঘকালীন ‘সংরক্ষিত এলাকা’ যাকে অনেকে নিষিদ্ধ পল্লী বা যৌনপল্লী বলেন, তা ভেঙে ফেলা হলো ধর্মের দোহাই দিয়ে। ওই এলাকাসহ আশপাশের এলাকাগুলোর মানুষজন এই কাজটি ‘অপবিত্র’ এমন একটা দোহাই দিয়ে অসংখ্য নারী এবং তাদের সন্তানাদিদের উচ্ছেদ করলেন জোর খাটিয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখন এই উচ্ছেদকারীদেরই পক্ষ নিয়েছিল। আমি তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করি এবং এই প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য ওই সব এলাকায় যাওয়ার পরে জীবন বাঁচানোর দায়ে, প্রতারণার শিকার হয়ে কিংবা অন্য কারণে জীবনের এই ভুল ঠিকানায় যেতে বাধ্য হওয়া, সমাজের কাছে অচ্ছ্যুত নারীদের সহায়সম্বল অর্থাৎ, শেষটুকুও হারিয়ে বুকফাটা কান্নায় এলাকা ত্যাগ করতে দেখেছি। তখন এরশাদের সামরিক সরকারের ভূমিকা ছিল ওই উচ্ছেদকারীদেরই পক্ষে। ধর্মের দোহাই দিয়ে ওই উচ্ছেদ কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালিত হলেও এখন এটা দিনের আলোরও চেয়েও বেশি পরিষ্কার, সূর্যের কিরণের চাইতেও অনেক বেশি সত্য তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল জমি দখলের জন্য। ওই সব এলাকায় এখন সুবিশাল অট্টালিকা, মার্কেট, কতো কি। কিন্তু সুযোগ সন্ধানীরা ধর্মের দোহাই দিয়ে ওই সব অসহায় নারীদের শহরময় কখনো কখনো দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালীরা জমি দখলের জন্য টানবাজারে পুনরায় উচ্ছেদ ও দখল অভিযান চালিয়েছিল। এরও দোহাই ছিল ধর্মের নামে।

এখন পর্যন্ত যতোগুলো এ ধরনের উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোর ইতিহাস যদি দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে অন্য কোনো অজুহাত নয়, আসল উদ্দেশ্য জমি দখল। কখনো কখনো ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর অধিকমাত্রায় চাঁদা দাবি করার কারণে এ রকম কাজটি ঘটে থাকে।

৮০এর প্রথমদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড এতোটা বিস্তৃত ছিল না, ছিল না নারী সংগঠনগুলোর এমন উচ্চকিত কণ্ঠ। কিন্তু ২০১৩তে এসে পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে গেছে। একটি বিষয় দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করতে হয়, যখন মাদারীপুরের ‘সংরক্ষিত এলাকাটি’র অসংখ্য নারী এবং তাদের সন্তানাদিকে জোর করে বের করে দেয়া হলো, অথচ মানবাধিকার ও নারী সংগঠনগুলো সে মাত্রায় সোচ্চার হলেন না। সরকার এমন একটা অবস্থান নিল যা উচ্ছেদকারীদের সহায়তা করছে। সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকাও যথারীতি ওই উচ্ছেদ ও দখলকারীদের পক্ষে। হাতেগোনা একটি দুটি বাদে কোনো সংবাদপত্র বা সংবাদ মাধ্যমকে দেখা গেল না এই দখলদারদের বিপক্ষে এবং অসহায় নারীদের পক্ষে সামান্য একটু সহানুভূতির কথাও বলতে। কারণ সংবাদ মাধ্যম ওই দখলদার এবং শাসক শ্রেণীর কাছে দায়বদ্ধ।

উচ্ছেদকারী এবং সরকারের ভাবখানা এমন যে পৃথিবীতে এই প্রথম এ রকম একটি এলাকা গড়ে উঠেছে। আর এটা ভেঙে দিলেই সব মুশকিলের আসান হয়ে যাবে। কিন্তু বাইরের দুনিয়ার খোঁজ খবর যারা রাখেন তারা বলতে পারবেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পতিতাবৃত্তি যারা করেন তাদের যৌনকর্মী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পরে আয়াতুল্লাহ খোমেনি যৌনকর্মীদের মেরে ফেলার নির্দেশ দেননি কিংবা এমনও নির্দেশ দেননি যে তাদেরকে কোনো শাস্তি পেতে হবে। বরং তিনি ইসলামী বিপ্লব সম্পন্নকারীদের প্রতি এই আহ্বান জানিয়েছিলেন এই নারীদের যেন তারা বিয়ে করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। খোমেনির এই ডাকে অনেকেই সাড়া দিয়েছিলেন। যে কারণে পুরো ইরান জুড়ে অবৈধভাবে এরা ছড়িয়ে পড়েনি।

যৌনকর্মীদের কাজ পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই চলে আসছে। পরববর্তীকালের সরকারগুলো এই পেশাকে অনুমোদন দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী যৌনকর্মীদের সরকারি অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু পুঁজিবাদের বিকৃতির কারণে এখন একটি সংরক্ষিত এলাকার মধ্যের কর্মকাণ্ড আর ওই এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অবৈধ উপায়ে ছড়িয়ে পড়েছে শহরের আনাচে কানাচে সর্বত্র। পুঁজিবাদের বিকৃতি এ কারণে বললাম, এই পন্থা মানুষকে বৈধ কিংবা অবৈধ, তা বাচ বিচার না করে উপরে ওঠার সিঁড়ি খুঁজতে বরাবর উৎসাহী করে। আর এ কারণেই ভদ্রবেশে যে কর্মকাণ্ড চলে তার বৈধতার প্রয়োজন পরে না। কারণ এর পক্ষে সমাজের ক্ষমতাশালীরা আছে, আছে বিত্তবানরা। কিন্তু চাল চুলোহীন অসহায়, দরিদ্র ওই সব যৌন কর্মীদের উচ্ছেদ করাটা অনেক সহজ। তাদের পক্ষে কোনো বিত্তবান এসে দাঁড়াবে না, দাঁড়াবে না ক্ষমতাশালীরা বা ক্ষমতাসীনরা। এখানে একটি দোহাই দিলেই চলে। যে দোহাই দিয়ে জমি দখল করা হয়, নির্মাণ করা হয় অট্টালিকা। আর জীবনের তাগিদে এই অসহায় নারীদের আশ্রয় মেলে রাস্তাঘাটে পথে প্রান্তরে। সমাজের সর্বত্র তারা ছড়িয়ে পড়েন। সমাজের যারা নীতিনির্ধারক তারা অবৈধ পন্থায় ভদ্র পোশাক আশাকে যারা এই কর্মগুলো করেন, তাদের এক ধরনের বৈধতা দিলেও, এই অসহায় দরিদ্র নারীদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেয়।

মাদারীপুরের ঘটনা প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রটি এই দরিদ্র মানুষের নয়, কখনো ছিল না আর পরিবর্তিত না হলে কখনো তাদের হবেও না।

এখানে একটি যুক্তি দেয়া প্রয়োজন, গুটি কয়েকের সম্পদের লিপ্সার জন্য আমরা কি সংরক্ষিত এলাকার এসব নারীদের এক জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করে দেবো নাকি ছড়িয়ে দেবো সবখানে। ফলাফলটা তখন কি হবে এই বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।

এই অসহায় নারীরা যে সীমাহীন কষ্ট এবং নজিরবিহীন দূরাবস্থার মধ্যে চরম অসহায়ভাবে সংরক্ষিত এলাকায় বসবাস করেন তা কল্পনারও অতীত। এখানে প্রতিনিয়ত মাস্তান পুলিশ আর বিভিন্নজনার অত্যাচার নির্যাতন আছে, উচ্চমাত্রায় চাঁদা দিতে হয়, রাত কাটাতে হয় বিনা পয়সায় যার তার সঙ্গে। এই কালোকালিন্দির স্রোত তাদের জীবন এবং এক সময়ের শেষ ঠিকানা। মরে গেলেও তাদের সৎকারটুকু হয় না। এই যাদের জীবন তখন তাদের এই জীবন নিয়ে এমন হেলাফেলা কেন? সরকার বা বিরোধী দলের কি কিছু করার নেই? কিন্তু প্রমাণ হয়েছে, আবার প্রমাণ হয়েছে, পুনর্বার প্রমাণ হয়েছে, রাষ্ট্র, সরকার এবং ক্ষমতায় যারা আছেন বা আসবেন তারা সাধারণ মানুষের নয়।

এই মাত্র কয়েকদিন আগে সংবাদ মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে ভারতের একটি ‘সংরক্ষিত এলাকা’র একজন মেয়ে সীমাহীন সংগ্রাম করে, পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করে লেখাপড়া শিখেছেন এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বৃত্তি নিয়ে সেখানে তিনি পড়তে গেছেন। এটা যদি ভারতে সম্ভব হয় তাহলে বাংলাদেশে কেন নয়? বাংলাদেশে সম্ভব নয় কারণ এই দেশটিতে কোনো জবাবদিহিতা নেই। মানুষের প্রতি কোনো মমতা নেই। কোনো ভালোবাসা নেই। কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এ দেশটি এখন উচ্ছেদকারী, লুটেরা আর সম্পদলিপ্সুদের হাতে জিম্মি। এখানে একজন যৌনকর্মী তো নয়ই, নিরাপদ নয় সাধারণ মানুষও।।

১টি মন্তব্য