Home » প্রচ্ছদ কথা » সমঝোতায় বাধা ও বিরূপ প্রভাব সৃষ্টিকারী সিদ্ধান্ত

সমঝোতায় বাধা ও বিরূপ প্রভাব সৃষ্টিকারী সিদ্ধান্ত

. আকবর আলি খানএর বিশ্লেষণ

hasina-5প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচিবদের সভায় আগামী নির্বাচন সম্পর্কে যে ঘোষণা দিয়েছেন তা তিন ভাগে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথম বিষয়টি হচ্ছে এটা করার কি প্রয়োজন ছিল। আসলে বর্তমান সংবিধানে যে বিধান রয়েছে সে অনুসারে মন্ত্রিসভা আগামী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারে এবং ২৪ জানুয়ারি পূর্ববর্তী সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে যেটা সংবিধানে বলা নেই, সে সময় যে সরকারটি থাকবে তাদের উপরে নির্বাচনকালীন কোনো বিধিনিষেধ থাকবে কিনা। সংবিধানে প্রকৃতপক্ষে কোনো বিধিনিষেধ বা বাধ্যবাধকতা বর্তমান সরকারের উপর নেই। তবে বর্তমান সরকার নির্বাচনকালীন সময়ে নিজেরাই কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যেমন বলা হয়েছে মন্ত্রিসভা এ সময় কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেবে না এবং জাতীয় সংসদের কোনো অধিবেশন হবে না। এগুলো করা হয়েছে নির্বাচনকালীন সময়ে সরকার কি কি করবে বা করবে না তা বলার জন্য। এর কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত ভিত্তি নেই। এটা পুরোপুরি নির্বাহী আদেশ। তবে এ বিষয়গুলোকেই সরকার আইনগতভাবে করতে পারতো যদি তারা রুলস অব বিজনেস বা কার্যবিধিমালা এবং জাতীয় সংসদে রুলস অব প্রসিডিওর বা কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন করতেন বা করেন তাহলে এর একটা লিখিত আইনগত ভিত্তি থাকবে। এখন যে পরিস্থিতি তা নেহায়তেই তাদের ইচ্ছার উপরে নির্ভর করবে।

এরপরের যে প্রশ্নটি ওঠে তাহলো এর ফলে বিরোধী দলের দাবি মেটানোর কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা? আমার মনে হয় নেই। বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে সেখানে সরকারি দল চাচ্ছে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আর বিরোধী দলের দাবি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। কাজেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবশেষ যে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন তা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। সুতরাং এই অবস্থার কারণে বিরোধী দলের যে দাবি তা পূরণ করতে পারবে না। কাজেই সংঘাতের রাজনীতি নিরসনে এর কোনোই ভূমিকা থাকবে না।

যদি ধরেও নেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে তাহলে সরকার নিজ উদ্যোগে যে বিধিনিষেধ আরোপ করছে তা কি যথেষ্ট? যথেষ্ট নয়। কারণ নির্বাচনকে প্রভাবান্বিত করতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত মন্ত্রী কিংবা সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত এমন কারোর গ্রহণ করা সঙ্গত নয় এবং তা সঠিক হবে না এ ধরনের কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। এছাড়া সরকারে যারা আছেন তারা কি কি সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করবেন, সে সম্পর্কেও কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। সরকারের প্রচারযন্ত্র কিভাবে ব্যবহার করা হবে সে সম্পর্কেও কোনো কিছু বলা হয়নি। আমি মনে করি নির্বাচন কমিশন থেকেও নীতিমালা জারি করা উচিত যা সরকার নিজে করতে পারবে না।

যখন সাধারণত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তখন নীতি নির্ধারণী বিষয়ে পরবর্তী সরকার এসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এগুলো বড় কথা নয়। আসল কথা হলো সরকারের সিদ্ধান্ত নির্বাচনকে প্রভাবান্বিত করবে কিনা এবং এমন অনেক রুটিন সিদ্ধান্ত থাকতেও পারে যা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। ভারতে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকালীন সরকারের উপরে অনেক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অতীতে এক্ষেত্রে খুব একটা দেখা যায়নি। কাজেই সরকারের নির্বাচন সম্পর্কিত বিষয়ের যে সিদ্ধান্ত তা মাধ্যমে কোনোক্রমেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হবে না।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত সমঝোতার উদ্যোগে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। একে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কারণ সরকার তাদের অনঢ় অবস্থানকে আরো সংহত করেছে। অর্থাৎ তারা বলছে যেকোনো অবস্থাতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে। এর বিপরীতে বিরোধী দলের দাবি আছে। কিন্তু এ দুটোর মধ্যে কোনো আপোষ সমন্বয়ের চেষ্টা না করে সরকার অনঢ় অবস্থানে থাকার ঘোষণাই দিয়ে দিল। সেক্ষেত্রে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সমরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

২৭ অক্টোবরের পরে কোনো সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই আদেশে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সমঝোতার সময় কমে আসছে। এটাই সমঝোতার পথে প্রতিবন্ধকতা হতে পারে। যদি আপোষ রফা বা সমঝোতার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তাহলে সময় খুবই কম। ২৭ অক্টোবরের আগে এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে এরপরে সংবিধান সংশোধন করতে চাইলে সমস্যা দেখা দেবে। এবং দেশে সাংবিধানিক অচলাবস্থা দেখা দেবে।।