Home » রাজনীতি » সমর্থনের হাত ওঠে না আস্থাহীন ও অনিশ্চিত পরিবেশে

সমর্থনের হাত ওঠে না আস্থাহীন ও অনিশ্চিত পরিবেশে

আবীর হাসান

publicনেতা নেত্রীরা গর্জন করে আহ্বান জানালেও সমবেত নেতাকর্মীরা সবাই হাত তোলেন না, যে ক’জন হাত তোলেন তাদেরও প্রত্যয় এবং আস্থাহীনতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, কোনো রকমে তুলেই নামিয়ে নেন। দু’হাত তুলতে বললেও তোলেন এক হাত। বেশ বোঝা যায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ চান ৭ মার্চের আবহ ফিরে ফিরে আসুক। জনতাও গর্জে উঠুক। কিন্তু ‘মহা পরিতাপের বিষয়’ ইতিহাস কখনই পুরোমাত্রায় বা একই ভাবে ফেরে না। জোর করে ফেরাতে চাইলে তা হাস্যকর হয়ে ওঠে। যাহোক, প্রত্যয় দৃঢ়, আস্থাশীল ব্রজমুঠি কেন যে ওঠে না সে প্রসঙ্গে ফিরি। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী জনসভাগুলোর এই চিত্র আজকাল ক’দিন পর পর দেখা যায়। জনতার সমাগম করে (আসলে করিয়ে) রাজনীতির সক্ষমতা প্রমাণের কৌশল এখন কতোটা কার্যকর তা অবশ্যই প্রশ্ন সাপেক্ষ হলেও রাজনৈতিক দলগুলো তা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব সভায় যারা যান তাদের বেশির ভাগই যে স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে যান না তা এখন সবাই জানেন। স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে কিংবা কিছুর বিনিময়ে যে যোগদানের ব্যাপারটি ঘটে তাতে দৃঢ় প্রত্যয়ের বিষয়টি থাকার কথা নয় তার ওপর যদি কাজ করে আস্থাহীনতা তাহলে মুখের ভাবে বসা বা দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিতে প্রকট হয়ে ওঠে। টেলিভিশন ফুটেজে তো বেশির ভাগ সময়ই দেখানো হয় লাজুক মুখের স্কুল ড্রেস পড়–য়া কিশোরী কিংবা আবেগহীন কর্মজীবী নারীদের। তাদেরকে সংগঠিত করে নিয়ে আসেন যে সব নারী নেত্রী তাদেরকেও খুব সহজেই আলাদা করে চেনা যায় বেশভূষা এবং মুখভঙ্গিমার জন্য। তৃণমূল পর্যায়ের নেতা যারা এলাকার হকার কিংবা বেকার তরুণদের সংগঠিত করে আনেন তাদেরও চেনা যায়। মঞ্চের নেতাদের তর্জন গর্জনের সঙ্গে ওই সব তরুণ বা ভীড়ের নারী পুরুষদের অভিব্যক্তি পরিবর্তিত হয় না। যেন আসাটাই তাদের নানা কারণে ওয়াদা রক্ষা। আর কিছু নয়। শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন তারা এবং চান দ্রুত সভাস্থল ত্যাগ করতে। কারণ প্রথমত. তারা আস্থাহীন নিরাপত্তা নিয়ে। বিশ্বাস নেই আয়োজকদের আশ্বাসবাণীতে। মঞ্চে যখন নেতানেত্রীদের মুখ বদল হয় তখন কোনো রকম সংবেদনশীলতা ফুটে ওঠে না সমাগত বেশির ভাগ লোকের মধ্যে। স্লোগান ধরতে বললে অধিকাংশ লোকও ধরে না, যিনি বলেন স্লোগান দিতে তিনি আশাহত হয়ে থেমে যান। উন্নয়নের ফিরিস্তি দেয়ার পর দু’হাত তুলতে বললেও তাই তেমন প্রতিক্রিয়া হয় না। মুক্ত মুখগুলো যেমন ভাষাহীন থাকে, তেমনি দেহগুলোও যেন থাকে জড়ভরত হয়ে। কান খোলা থাকে ঠিকই এবং যে কথাগুলো ওই কূহরে প্রবেশ করে তাতে তাদের আত্মা বিবশ হয়ে পড়ে। ভাদ্রের গরমে আগের রাতে লোডশেডিংয়ে কষ্ট পেয়ে পরদিন যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যান শোনে তখন তা আস্থাহীনতাই বাড়ায়। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে দাবি তাদের কাছে অসার প্রতীয়মান হয় যখন মেলানোর চেষ্টা করে গুম, খুনসহ নৃশংস সব হত্যাকাণ্ডগুলোকে, অপহরণ সংবাদ এবং মাদকের বাস্তব চিত্রগুলোকে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কথা শুনলে অজান্তেই মনের মধ্যে আপনা আপনি হিসাবটা কষা হয় সাড়ে চার বছর আগে কয় টাকা দিয়ে সংসার চলতো আর এখন কতো লাগে! এই দীর্ঘদিন ধরে মনের হোচট খেতে খেতে ঘা সওয়া হয়ে গেলেও এখন শেষমেষ চোখে লাগে পেঁয়াজের ঝাঁঝ, হিসাব মেলাতে চায় এক গ্রাস ভাতের দাম কতো পড়ল! অথবা বাড়ির শিশুটি কতোবার দুধ পাচ্ছে আজকাল! রাস্তাঘাটের উন্নয়নের কথা বললে মনে পড়ে যায় নিজের পাড়া মহল্লার ভাঙাচোরা রাস্তাগুলোর কথা আর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া ড্রেনেজ সিস্টেমের কথাও। ঘুষ দুর্নীতির সমালোচনা শুনে তারাও মনে মনে একটা সমালোচনা খাড়া করে ফেলে। একটা ট্রেড লাইসেন্স কিংবা জমির পড়চা অথবা একটা নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট পেতে কতো ঘাটে কতো দিতে হয়েছে তার হিসাব করে ফেলে দ্রুত। ভোগ বিলাস না করার দাবির কথা শুনলে দ্রুত চোখের সামনে ভেসে ওঠে দলীয় নেতা নেত্রীদের মুখচ্ছবি তাদের শান শওকতের চিত্রটাও।

নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি আর সে সব পূরণের প্রসঙ্গ যখন নেতানেত্রীদের মেঠো বক্তৃতায় ওঠে, যখন তারা দাবি জানান সব প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে বলে তখন অশান্ত বিচলিত হন সভাস্থলে উপস্থিত কিংবা দূরবর্তী অবস্থানে থাকা দলীয় সমর্থকরাও। তারা আস্থা পান না দলের পক্ষে নতুন প্রচার চালানোর যুক্তি নিয়ে। তৃণমূল পর্যায়ে এলাকার যে সব নেতা কর্মীদের কাজ করতে হচ্ছে তারা রয়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়, কেউ আস্থা রাখতে পারছেন না শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর। কারণ সেখানে স্ব বিরোধিতা চরম হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা গিবত করে সেটা করা উচিত নয় বলেই তিনি গিবত শুরু করেন। আর ক্ষমতায় থাকার খায়েশের হিসাবটা গোলমেলে হওয়ার কথাই সবার জন্য। কারণ আর একবার নির্বাচিত করলেও ২০১৮ সাল পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু তিনি হিসাবটা নিয়ে যান ২০২১ সাল পর্যন্ত। ওই বছর স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি হবে সেটা বাস্তবতা কিন্তু ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার বিষয়টা যে কতোটা বাস্তব সম্মত তা মেলাতে পারেন না কেউই প্রক্রিয়াটাই বা কি তাও জানেন না কেউ। বার বার চরম অনিশ্চয়তাই উপহার দেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা আর ওই অনিশ্চয়তায় ভোগেন সর্বস্তরের নেতা কর্মীরাই।

আগামী বছর জানুয়ারি মাসের নির্বাচনটা নিয়েই যে ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে তাও অত্যন্ত মোটা দাগের। বলা হচ্ছে, ‘সংবিধানে যা আছে’ তাই হবে। কিন্তু অনেকদিনই বলা হয়নি সংবিধানে থাকার বিষয়টা আসলো কেমন করে? অতিসম্প্রতি ব্যাখ্যা দেয়া হলো (৩০ এবং ৩১ আগস্ট) পঞ্চদশ সংশোধনী কেমন করে পাস হলো। কতোজন (২৯১ জন) সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন কেমন করে বিল তোলা হলো আর তা পাস হয়ে গেল। সবই ইতোমধ্যে বলা হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং জনসাধারণ সবাই বুঝতে পারছেন দেশী বিদেশী সবার জন্যই একটা কৈফিয়ত তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তাতে নৈতিকতা কতোটা আছে সেটাও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এদেশের সংবিধান সংসদে দলীয় সংসদ সদস্যদের কতোটা স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার দেয় তা হয়তো তৃণমূলের লোকজন জানেন না। কিন্তু অধিকার সচেতন অনেক লোকই জানেন। সংবিধানে থাকলেই সেটা পরিবর্তন যোগ্য নয় এমন ‘বাধাদরা এবং কসম কাটা’ নিয়ম যে বাংলাদেশে চলে না তা সবাই জানেন। এখনো সব শাসক দল বা স্বৈরশাসনেই সংবিধান বদলেছে আরও বদল না হওয়ার কোনো কারণ নেই।

কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলতে এ রকম বদলাতে বদলাতে শেষ পর্যন্ত কি হবে? শেষ পর্যন্ত এ দেশটির ভবিষ্যৎ কী হবে তা যেমন কেউ জানে না তেমনি আমাদের সংবিধানের সূদুর পরিণতি নিয়েও ভাববার দরকার নেই। নিকট ভবিষ্যতটাকেই বড় করে দেখা উচিত বলে মনে করেন শান্তিপ্রিয় ও বিবেকবান মানুষ। অনিশ্চয়তার মধ্যে আস্থা রাখা যায় না এমন শাসকের অধীনেও থাকতে চায় না কেউ। স্ব বিরোধী নৈতিকতাহীন রাষ্ট্রীয় আচরণ মানুষকে সবচেয়ে আশাহত করে। যেকোনা মানুষ তা সে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষই হোক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবীই হোক অথবা রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীই হোক কেউ চায় না ফাঁদে পড়া জন্তুর মতো জীবন, এ জন্যই নেতাদের হাজারও গর্জনেও সমর্থনের হাত ওঠে না সীমাহীন অনিশ্চয়তা ও আর আস্থাহীনতার এই পরিবেশ পরিস্থিতিতে।।