Home » আন্তর্জাতিক » সিরিয়া নয় আসল টার্গেট ইরান

সিরিয়া নয় আসল টার্গেট ইরান

রবার্ট ফিস্ক

syriaসিরীয় সরকারকে রক্ষায় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ইরান এখন অনেক বেশি জড়িত। এর ফলে বাশারের জয় মানে ইরানের জয়আধুনিক দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে মূর্খতাপূর্ণ যুদ্ধটি সম্পর্কে কথা বলার আগে আমি অবশ্যই সিরিয়ার ওপর হামলার বিষয়টির কথা বলছি, যেটাকে আমরা এখনো হজম করতে পারিনি একথাও বলা যেতে পারে যে, মানুষের প্রাচীনতম নগরীগুলোতে যেসব ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে যাচ্ছে, সেগুলো নিশ্চিতভাবেই সিরিয়ার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। এগুলোর লক্ষ্য ইরানকে আঘাত করা।

এগুলো খ্যাপাটে মাহমুদ আহমদিনেজাদের বদলে এখন নতুন ও উদ্দীপ্ত প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে পরিচালিত ন্যূনতম মাত্রায় স্থিতিশীল অবস্থায় থাকা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে আঘাত হানতে চায়। ইরান হলো ইসরাইলের শত্রু। এ কারণে ইরান স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকারও শত্রু। তাই ইরানের একমাত্র আরব মিত্রের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করো।

দামাস্কাস সরকার নিয়ে খুশি হওয়ার কিছুই নেই। রাসায়নিক গ্যাস প্রয়োগে গণহত্যার প্রেক্ষাপটে এই সরকারকে রক্ষা করার জন্য এসব কথা বলা হচ্ছে না। তবে আমার ভালো করেই মনে আছে ১৯৮৮ সালে আমেরিকার মিত্র ইরাক যখন হালাবজায় কুর্দিদের বিরুদ্ধে গ্যাস ব্যবহার করেছিল, তখন আমরা বাগদাদ আক্রমণ করিনি। বরং আমরা আক্রমণের জন্য ২০০৩ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি, যখন সাদ্দামের কাছে আর গ্যাস বা আমাদের জন্য দুঃস্বপ্ন সৃষ্টিকারী কোনো অস্ত্র ছিল না।

আর আমার এও মনে আছে যে সিআইএ ১৯৮৮ সালে প্রচার করেছিল, হালাবজায় গ্যাস আক্রমণের জন্য দায়ী ইরান। আমেরিকার এই শত্রুটির সম্পর্কে যখন এই নির্জলা মিথ্যা কথা বলা হচ্ছিল, তখন তাদের মিত্র সাদ্দাম হোসেন দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। আর হালাবজায় শত শত নয়, মারা গিয়েছিল হাজারে হাজারে। কিন্তু সেটা ভিন্ন দিনের কথা, মানদণ্ডও ভিন্ন।

আমার মনে হয়, ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরাইলের ১৭ হাজার নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করার ঘটনাটাও উল্লেখ করা দরকার। বলা হয়ে থাকে, লন্ডনে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে পিএলও খুন করায় এই আগ্রাসন চালানো হয়েছিল। কিন্তু আসল কথা হলো, এই খুনের ব্যবস্থা করেছিল সাদ্দামের বন্ধু আবু নিদাল, পিএলও নয়। কিন্তু সেটা কোনো ব্যাপার নয়। আমেরিকা কেবল উভয় পক্ষকে ‘সংযত’ থাকতে বলেছিল। আর ওই আগ্রাসনের কয়েক মাস আগে বাশারের পিতা হাফেজ আলআসাদ তার ভাইকে হামায় পাঠিয়েছিলেন সেখানকার কয়েক হাজার মুসলিম ব্রাদারহুড বিদ্রোহীকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে। তখন কেউ নিন্দাসূচক একটি কথাও বলেনি। আমার পুরনো বন্ধু টম ফ্রিডম্যান এই রক্তস্নাত ঘটনাটিকে অভিহিত করেছিলেন ‘হামা রুলস’ শব্দগুচ্ছে।

যাই হোক, এখন আরেকটি ব্রাদারহুডের অস্তিত্ব রয়েছে আমাদের সামনে। আর তাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে যখন ক্ষমতাচ্যুত করা হলো তখন ওবামা এমনকি ‘ছি ছি’ শব্দও উচ্চারণ করলেন না।

ধৈর্য ধরো। যখন ইরানের বিরুদ্ধে ইরাক আমাদের ‘মিত্র’ এবং ইরানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গ্যাস ব্যবহার করে তখনও? তাই হয়েছিল। আমি দেখেছি, সাদ্দামের অন্যায় আক্রমণে ওয়াইপ্রেস জাতীয় আঘাত ছিল। আমি আরো বলব, মার্কিন অফিসারেরা পরে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে সরেজমিন তদন্ত করেছিল। তারা ওয়াশিংটনে ফিরে সেকথা জানিয়েছিল। কিন্তু আমরা এগুলোর পরোয়া করিনি। ১৯৮০ ৮৮ যুদ্ধে এই জঘন্য অস্ত্র ব্যবহার করে হাজার হাজার ইরানি সৈন্য হত্যা করা হয়েছিল।

আমি রাতে একটি সামরিক হতাহততের বহনকারী একটি ট্রেনে করে তেহরানে ফিরছিলাম। গন্ধে টিকতে না পেরে গ্যাস বের হতে দিতে করিডরের জানালা খুলে দিয়েছিলাম। আক্ষরিক অর্থেই এসব তরুণ আঘাতে আঘাতে জর্জরিত ছিল। ভয়াবহ যন্ত্রণা বিরাজ করছিল, তবে যন্ত্রণা আরো ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। এসব সৈন্যকে যখন চিকিৎসার জন্য পাশ্চাত্যের হাসপাতালগুলোতে পাঠানো হলো, তখন আমরা সাংবাদিকেরা এসব আঘাতকে বললাম আমরা দামাস্কাসের বাইরে সংঘটিত ঘটনাটি নিয়ে জাতিসংঘের কাছ থেকে যে তদন্ত প্রতিবেদন পেতে পারি, তার চেয়ে অনেক বেশি সুস্পষ্ট তথ্যপূর্ণ – ‘কথিত’ গ্যাসের শিকার।

তাহলে আমরা সম্ভাব্য কোন কাজটি করতে যাচ্ছি? সিরিয়ার মর্মান্তিক ট্রাজেডিতে অসংখ্য হাজার হাজার মারা যাওয়ার পর এখন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সত্যের অপলাপের পর আমরা মাত্র কয়েক শ’ লোকের মৃত্যুতে কষ্ট পাচ্ছি। ভয়ংকর ব্যাপার। সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বিষয়। হ্যাঁ, এটাই সত্য। ২০১১ সালে কিংবা ২০১২ সালেই এই যুদ্ধের আঘাত আমাদের দেহে অনুভূত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন কেন?

আমার মনে হচ্ছে, কারণটি আমি জানি। আমার মনে হচ্ছে, আমরা যেসব বিদ্রোহীকে গোপনে অস্ত্র দিচ্ছিলাম, বাশার আলআসাদের নির্মম সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে জয়ী হতে যাচ্ছে। লেবাননে ইরানের মিত্র লেবাননি হেজবুল্লাহর সহায়তায় দামাস্কাস সরকার কুসাইরে বিদ্রোহীদের গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং তারা এখন হোমসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি করে সিরীয় সরকারকে রক্ষায় জড়িত। আর এর ফল দাঁড়াচ্ছে বাশারের জয় মানে ইরানের জয়। আর ইরানের জয় পাশ্চাত্য বরদাস্ত করতে পারে না।

আমরা যখন যুদ্ধের বিষয় নিয়ে কথা বলছি, তখন জন কেরির ব্যাপক ঢাকঢোল পেটানো ফিলিস্তিনি ইসরাইলি আলোচনায় কি হচ্ছে? আমরা যখন সিরিয়ায় জঘন্য গ্যাস আক্রমণ নিয়ে ক্ষুব্ধ হচ্ছি, তখন ফিলিস্তিন ভূমি অব্যাহতভাবে কুক্ষিগত করা হচ্ছে। ইসরাইলের লিকুদীয় নীতি ফিলিস্তিন বিলীন না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যাও দ্রুতগতিতে ধাবিত হচ্ছে। এর ফলে জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহর দুঃস্বপ্ন (আমরা ২০০৩ সালে ‘ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের’ যে স্বপ্ন দেখেছিলাম তার চেয়ে অনেক ব্যাপ্তিপূর্ণ) ক্রমাগত বড় হচ্ছে: ‘ফিলিস্তিন’ জর্দান হবে, ফিলিস্তিন নয়।

কিন্তু আমাদের বিশ্বাস করতে হচ্ছে ওয়াশিংটন, লন্ডন, প্যারিস এবং অবশিষ্ট ‘সভ্য’ বিশ্বের নির্বুদ্ধিতার কারণে আমাদের ক্ষিপ্র ও প্রতিশোধপরায়ণ তরবারি দামাস্কানদের জর্জরিত করাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। অবশিষ্ট আরব বিশ্বের নেতৃত্বকে এই ধ্বংসে ডুগডুগি বাজাতে দেখাটা সম্ভবতঃ এই অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। এটা সবচেয়ে লজ্জাজনকও। মাথায় রাখবেন, সুন্নি মুসলমানদের হাতহালির মধ্যে আমরা অবশ্যই শিয়া মুসলিম এবং তাদের মিত্রদের ওপর আক্রমণ করব। আর এ কারণেই গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করা হয়েছে।।