Home » অর্থনীতি » ৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৭)

৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৭)

বৈষম্যের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি রাজনীতির নানা স্রোত

আনু মুহাম্মদ

60'sপাকিস্তানের ভেতর অসম উন্নয়ন গতি এবং বিশেষভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি ও কর্মসূচিই ৬০ দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির ভাব ও ভাষা নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করে। ৬০ দশকের প্রথমদিকেই রেহমান সোবহান দুই অর্থনীতির তত্ত্ব দেন, পরে আখলাকুর রহমান এমনকি এম এন হুদাও এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন যা থেকে ক্রমে এই আঞ্চলিক বৈষম্য সম্পর্কিত ধারণা একটি স্পষ্ট রূপ নেয়। তবে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনাকে কেন্দ্র করে হলেও দেশজুড়ে প্রতিবাদী চেতনা যে একটা জাতীয়তাবাদী রূপ নিতে থাকে তার কারণ শুধু এতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আরও অন্তত দুটি বিষয় এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রথমত, বৈষম্য ও বঞ্চনা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাংস্কৃতিক অবজ্ঞা, বৈষম্যও প্রকট হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বাঙালীদের নীচু চোখে দেখা এবং বাঙালী মুসলমানদের মুসলমান হিসেবেই স্বীকৃতি দানে কার্পণ্য বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। যা বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের নতুন উপলব্ধি সৃষ্টি করে কিংবা পাকিস্তান জাতির ভঙ্গুর ভিত্তি সম্পর্কে সজাগ করে। বাঙালী মুসলমান তার বাঙালী পরিচয় এবং তার শেকড় নিয়ে মনোযোগী হয়ে উঠে।

দ্বিতীয়ত, ৫০ ও ৬০ দশকে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এখানে একটি উল্লেখযোগ্য আকারের মধ্যবিত্ত বিশেষত শিক্ষক, উকিল, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী গোষ্ঠী যেমন গড়ে উঠেছিল, তেমনি কিছু শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল একটি শিল্প শ্রমিক শ্রেণী। এই মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণীই ৬০ দশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান দুটি ভিত্তি ছিল।

তবে জাতিগত নিপীড়ন ও বৈষম্য উপলব্ধি এবং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বিষয়ে নতুন মনোযোগে মধ্যবিত্তের মধ্যে সবচাইতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন বিদ্বৎসমাজ। এই ক্ষেত্রে বদরুদ্দীন উমরের সংস্কৃতির সংকট, সাম্প্রদায়িকতা ও সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে লেখালেখির প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। ১লা বৈশাখ, রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপন প্রতিবাদী কর্মসূচি হিসেবেই শুরু হয় এবং ক্রমে তা ব্যাপকতা লাভ করে। বাঙালী জাতীয়তাবাদী ধারা শেকড় গাড়ে এই মধ্যবিত্তের মধ্যেই এবং তার প্রকাশ বিদ্বৎসমাজ থেকেই ঘটে। বিপ্লবী রাজনীতির বিশাল অর্জনও এক পর্যায়ে গিয়ে জাতীয়তাবাদী ধারাকে পুষ্ট করে।

আন্দোলনের নানা স্রোত

৮০ দশকে বাংলাদেশে যেভাবে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয় ৬০ দশকেও তাই হয়েছিল। ১৯৬২ সালে নতুন শাসনতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। একই বছর সোহরাওয়ার্দীসহ অনেক প্রবীণ নেতাকেও গ্রেফতার করা হয়। ঘোষণা করা হয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট।

এই শিক্ষা কমিশন রিপোর্টকে কেন্দ্র করেই ছাত্র বিক্ষোভের সূচনা। সামরিক শাসন বিরোধী চাপা বিক্ষোভকে মূর্তরূপ দেবার ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করে অবিভক্ত এবং বেআইনী ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ছাত্র ইউনিয়ন। ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগেই এই বছর ১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয় এবং তা সফলও হয়। এই শুরু। ১৭ সেপ্টেম্বর সারা দেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়।

৬০ দশকে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে কয়েকটি প্রধান প্রবণতা চিহ্নিত করা সম্ভব। প্রথমত, আওয়ামী লীগ যা আঞ্চলিক বৈষম্য ও জাতিগত স্বত্তাধিকারকে কেন্দ্র করেই আন্দোলন পরিচালনা করছিল। এই দলই জনসমর্থন ও সাংগঠনিক ভিত্তির দিক থেকে ছিল সবচাইতে শক্তিশালী। তবে একক বৃহত্তম দল হিসেবে তার আবির্ভাব ঘটে ৬০ দশকের শেষে। শেখ মুজিবুর রহমান একটানা এই আন্দোলনের মধ্যে থেকে দলের অবিংসবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন ৬০ দশকের শেষভাগে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার হয়ে পরে তিনি যখন আন্দোলনের মুখে মুক্তি পান, তখন তিনি বাঙালী জনগণের মধ্যে সবচাইতে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সেই সময়েই তিনি ছাত্র জনতার এক বিশাল সমাবেশে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। এই দলের মধ্যেই জাতীয়তাবাদী দর্শন ক্রমে দানা বাঁধে এবং সেটাই রাজনীতির প্রধান স্রোতে পরিণত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এই দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই দলই নেতৃত্ব প্রদান করে।

দ্বিতীয়ত, কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দল এবং গ্রুপসমূহ। কমিউনিস্ট পার্টি অবিভক্ত ছিল ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত। তারপরই প্রথমে এটি দুই ভাগ ও পরে বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়ে পার্টি। এগুলো ছিল নিষিদ্ধ পার্টি। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে আলাদা হয়ে যে ন্যাপ গঠিত হয় সেখানেই তখন কাজ করতেন বিপ্লবীরা। ন্যাপের মধ্যে কাজ করেছেন, আবার পার্টির দায়িত্ব নিয়ে তাঁরা কৃষক শ্রমিকদের সংগঠন করেছেন। এই ন্যাপও ভেঙে যায়। কৃষক সংগঠনের ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানী নিজেই নেতৃত্ব দিয়ে কৃষক আন্দোলনের এক নতুন ভাষা তৈরি করেছেন। এছাড়া কৃষক শ্রমিক আন্দোলন সংগঠনে পার্টি নেতা হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন আবদুল হক ও মোহাম্মদ তোয়াহা।

টঙ্গী, আদমজী, খুলনা ও চট্টগ্রাম শ্রমিক সংগঠন ও আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে ব্যাপ্তি, সাংগঠনিক শক্তির জন্ম দিয়েছিল তা আর পরবর্তী সময়ে কখনো দেখা যায়নি। আবুল বাশার, দেবেন শিকদার অবিস্মরণীয় শ্রমিক সমাবেশ ও আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন। টঙ্গী ও আদমজী শ্রমিক আন্দোলন ঢাকা মহানগরীতে গণঅভ্যুত্থানের জোয়ার তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। ৬০ দশকের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল প্রায় নির্ধারক অবস্থানে। সেক্ষেত্রেও ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম সংগঠনগুলোর ভূমিকা ছিল প্রধান।

তৃতীয়ত, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও ধারা। মুসলিম লীগ ততদিনে খন্ডবিখন্ড। বাংলাদেশে ১৯৫৪র পর আর এই সংগঠন কখনও দাঁড়াতে পারেনি। নানারকম ঠেকা দিয়ে এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবার চেষ্টা চললেও কোন লাভ হয়নি। এর নানা খন্ড নিয়ে নানা গ্রুপ প্রাসাদ চক্রান্তের প্রয়োজনে কাজে লাগছিল বিভিন্নভাবে। আইয়ুব খান যখন রাজনীতির মাঠে স্থায়ী হবার চেষ্টা করছিলেন তখন এরকম একটি গ্রুপের উপরই ভর করেছিলেন, তার নাম কনভেনশন মুসলিম লীগ। আইযুব খানের রাজনীতির বিরুদ্ধে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে সামনে রেখে গঠিত হয়েছিল জিন্নাহ মুসলিম লীগ। এছাড়া ছিল নেজামে ইসলামী আর জামাতে ইসলামী। ১৯৬১ সালে আইয়ুব খান পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ জারি করবার পর এই দলগুলোর সঙ্গে আইয়ুব খানের সম্পর্কের বৈরীতা তৈরি হয়। এই দলগুলো বিভিন্ন সময়ে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনেও অংশ নেয়। এই আন্দোলনে কখনও কখনও আওয়ামী লীগের সঙ্গেও তাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দেখা যায়।।

(চলবে…)