Home » আন্তর্জাতিক » ইরানের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার

ইরানের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার

সাদ্দামকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা সিআইএ’র ফাইল

ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন এক্সক্লুসিভ

ভাষান্তর : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

foreign-policyদামাস্কাসের কাছে রাসায়নিক হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা করছে। অথচ এক প্রজন্ম আগে, আমেরিকার সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আরো ভয়াবহ নার্ভ গ্যাস হামলার খবর জানলেও সেটা বন্ধ করার কোনো চেষ্টাই চালায়নি, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা….

ইরাক ইরান যুদ্ধের শেষ দিকে উপগ্রহ ছবির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র জানতে পারল যে ইরাকি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ইরান বড় ধরনের কৌশলগত জয় অর্জন করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সাদ্দাম হোসেনের সামরিক বাহিনী ইরানিদের ওপর প্রাণঘাতী নার্ভ গ্যাস সারিনসহ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে এমন আশঙ্কা পুরোপুরি থাকা সত্ত্বেও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইরানি সৈন্যদের অবস্থানের খবর ইরাককে জানিয়ে দেয়।

ইরানি সৈন্যদের মুভমেন্টের ছবি ও মানচিত্রের পাশাপাশি ইরানি কৌশলগত স্থাপনা ও ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কিত তথ্যও মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়ে দিয়েছিলেন। ওইসব তথ্য ও ছবি পেয়েই ইরাক ১৯৮৮ সালের প্রথম দিকে বড় ধরনের চারটি আক্রমণ চালানোর আগে ইরানিদের ওপর মাস্টার্ড ও সারিন গ্যাস ব্যবহার করে। এসব হামলার ফলে যুদ্ধের মোড় ইরাকিদের অনুকূলে চলে যায় এবং ইরানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে ইরাকের জয় নিশ্চিত করার রিগ্যান প্রশাসনের দীর্ঘ দিনের নীতি বাস্তবায়িত হয়। রিগ্যান প্রশাসন এই রাসায়নিক হামলার কথা জানত, কিন্তু তবুও প্রকাশ করেনি।

ইরাকি রাসায়নিক হামলার বিষয়টি জানা থাকার কথা মার্কিন কর্মকর্তারা দীর্ঘ দিন ধরে অস্বীকার করে আসছিলেন। তারা জোর দিয়ে বলছিলেন, সাদ্দামের সরকার কখনো জানায়নি যে তারা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে যাচ্ছে। কিন্তু বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল রিক ফ্রানকোনা (১৯৮৮ সালে তিনি বাগদাদে সামরিক অ্যাটাশে হিসেবে কর্মরত ছিলেন) ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি ফরেন পলিসিকে বলেন, ‘ইরাকিরা কখনো আমাদের জানায়নি যে তারা নার্ভ গ্যাস ব্যবহার করতে চায়। তাদের সেটা জানানোর কোনোই দরকার ছিল না। কারণ আমরা আগেই তা জানতাম।’

ফ্রানকোনার মতো সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সাক্ষাতকার এবং সিআইএর প্রকাশ করা গোপন নথিপত্রে দেখা যায়, ১৯৮৩ সালের শুরু থেকে ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সুস্পষ্ট প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল। ইরান প্রায়ই অভিযোগ করে আসছিল যে তাদের সৈন্যদের ওপর অবৈধ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা বিষয়টি জাতিসংঘকেও জানিয়েছিল। তবে ইরাকই যে ওই হামলা চালিয়েছে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি ইরান। ফরেন পলিসি এখন মার্কিন সরকারের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পাঠানো নথি থেকে প্রমাণ উদ্ধার করেছে। তবে সিআইএ এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এখন সিরিয়া সরকারের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করা উচিত কি না সে বিতর্ক ওঠছে। অথচ তিন দশক আগে সাদ্দাম হোসেনের তার শত্রুও নিজ জনগণের উপর ব্যাপকভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ঠাণ্ডা মাথায় হিসাব নিকাষ কষেছিল। রিগ্যান প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হলে যদি যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়, তবে তা অব্যাহত থাকুক না। আর যদি সেটা ধরাও পড়ে যায়, তবে সিআইএ আন্তর্জাতিক ক্ষোভ মোকাবিলা করবে, নিন্দার ঝড় থামিয়ে দেবে।

প্রকাশ করা নথিপত্রে সিআইএ জানায়, ইরান হয়তো রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবে না, এমনকি সংস্থাটির হাতে থাকলেও না। সংস্থাটি উল্লেখ করে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতোপূর্বে আফগানিস্তানে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং সমালোচিতও হয়েছে।

আগেও খবর পাওয়া গিয়েছিল যে সাদ্দাম হোসেন রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে থাকতে পারেন, এমন সন্দেহের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে কৌশলগত গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান করেছে। কিন্তু সদ্য অবমুক্ত করা গোপন নথিপত্রে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র কত ব্যাপকভাবে রাসায়নিক হামলার খবর জানত। এতে দেখা যায়, সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবেই নার্ভ গ্যাস হামলার বিষয়গুলো অবগত থাকতেন।

প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, সিআইএ’র পরিচালক উইলিয়াম জে ক্যাসি, যিনি প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, এবং আরো কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা ইরাকি রাসায়নিক অস্ত্র প্লান্টের অবস্থান জানতেন। ইরাক যে রণাঙ্গনে থাকা তার বাহিনীর জন্য ব্যাপক মাত্রায় মাস্টার্ড গ্যাস প্রস্তুতের মরিয়া চেষ্টা করছে, তা ও তাদের জানা ছিল। এমনকি ইরাক যে ইতালি থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনার চেষ্টা করছে, সেটাও তাদের জানার বাইরে ছিল না। এসব অস্ত্র ইরানি সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর প্রয়োগ হতে পারে, সেটাও তারা জানতেন। তারা এটাও জানতেন, ইরাকের রাসায়নিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত একথা ইরান জানতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসী হামলাসহ প্রতিরোধমূলক আক্রমণ চালাতে পারে।

সিআইএ’র ১৯৮৩ সালের এক অত্যন্ত গোপন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইরাকের অব্যাহত ও ব্যাপক আক্রমণের ফলে ইরাকি চিহ্ন দেওয়া মাস্টার্ড গ্যাসের শেল ইরানের হাতে পড়াও আশঙ্কা বাড়ছে। এতে বলা হয়, সেক্ষেত্রে ইরান এই প্রমাণ জাতিসংঘে নিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করবে।

ফ্রানকোনা ফরেন পলিসিকে বলেন, তিনি ১৯৮৪ সালে ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত হন। ওই সময়ে তিনি জর্দানের রাজধানী আম্মানে এয়ার অ্যাটাসে হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দক্ষিণ ইরাকে ইরানি বাহিনীর ওপর তাবুন নার্ভ গ্যাস ব্যাবহারের সুস্পষ্ট্র প্রমাণ হাতে পেয়েছিলেন তিনি।

প্রকাশ করা সিআইএ নথিগুলোতে দেখা যায়, ক্যাসি এবং অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরাকের রাসায়নিক হামলা এবং আরো বেশি বেশি করে তা করার পরিকল্পনার বিষয়টি তারা একাধিকবার অবহিত হয়েছিলেন। একটি অত্যন্ত গোপন নথিতে লেখা ছিল : ‘ইরাকিরা যদি মাস্টার্ড গ্যাসের নতুন নতুন সরবরাহ পায় কিংবা তারা তা উৎপাদন করতে পারে, তবে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে সীমান্ত সংলগ্ন শহরগুলোতে ইরানি সৈন্যদের উপর ইরাকিরা তা ব্যবহার করবে।’ তবে এতে এই যুদ্ধে যেকোনো মূল্যে ইরাকিদের জয় নিশ্চিত করার রিগ্যানের নীতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

১৯২৫ সালের জেনেভা প্রটোকলে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এতে বলা হয়, চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী প্রতিটি দেশই অন্য সব রাষ্ট্রকে এই সমঝোতা গ্রহণ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। ইরাক এই প্রটোকল কখনো মেনে নেয়নি, যুক্তরাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করে ১৯৭৫ সালে। এ ধরনের অস্ত্র উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ‘কেমিক্যাল উইপন্স কনভেনশন’ ১৯৯৭ সালের আগে অনুমোদিত হয়নি।

ইরাকিরা ১৯৮৩ সালে প্রথম আক্রমণ চালিয়েছিল মাস্টার্ড গ্যাস দিয়ে। সাধারণভাবে এই রাসায়নিকটি প্রত্যক্ষভাবে প্রাণঘাতী নয়। কিন্তু এই গ্যাসের প্রভাবে চামড়া এবং শ্লেষা ঝিল্লিতে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এর ফলে মৃত্যুও হতে পারে। তাছাড়া চোখ এবং শ্বাসযন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ক্যান্সার হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। মাস্টার্ড গ্যাস ব্যবহারের সময় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে ইরাককে গোয়েন্দা সহায়তা করেনি। তবে ইরাক যে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে সেটা প্রমাণ করার জন্য দেশটি ইরানকেও সহায়তা করেনি। তারা জাতিসংঘকেও জানায়নি। সিআইএ নিশ্চিত ছিল যে ইরাকি রাসায়নিক অস্ত্রাগারে বোমা হামলা চালানোর মতো সামর্থ্য ইরানের আছে। অবশ্য তার আগে অস্রাগারটির সন্ধান তাদের পেতে হতো। সিআইএ মনে করতো, ইরান তা জানে।

ইরাকি রাসায়নিক আক্রমণের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৮৪ সালে। কিন্তু তাতে সাদ্দাম হোসেনের কিছুই আসে যায়নি। কোনো কিছুর পরোয়া না করেই তিনি তার নিজ জাতির ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেন। সাদ্দামের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি জেনেও পুরো যুদ্ধে সিআইএ ইরাককে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে যায়। প্রথম দিকে অবশ্য কিছুটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছিল।

কিন্তু ১৯৮৭ সালে অবস্থা বদলে যায়। সিআইএ উপগ্রহ থেকে তোলা ছবির মাধ্যমে বুঝতে পারে, ইরানিরা বসরা নগরীর পূর্বদিকে বিপুল সৈন্য ও সরঞ্জাম সমবেত করছে। তারা দেখতে পেল, ইরানিরা নগরীর ইরাকি লাইনে একটি ফাটল আবিষ্কার করেছে এবং তার সুবিধা নিতে বদ্ধপরিকর। তারা সেটা করতে পারলে ইরাকের জন্য বিপর্যয় নেমে আসবে। যুদ্ধে ইরাক পরাজিত হবে, ইরান জিতে যাবে।

এই খবর রিগ্যান পেয়ে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী সি কারলুসিকে লিখলেন, ‘ইরানি জয় অগ্রহণযোগ্য।’ সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সিদ্ধান্ত নিল। ইরানের সৈন্যদের অবস্থা এবং প্রাসঙ্গিক সব গোয়েন্দা তথ্য সাদ্দাম হোসেনকে জানানো হলো। এমনকি ইরানি লক্ষ্যবস্তুগুলোকে কোন স্থান দিয়ে আঘাত হানতে সহজে ধক্ষংস করা যাবে, তা ও জানানো হলো। এর পরপরই চালানো হলো সারিন হামলা।

এই হামলায় ঠিক কতজন ইরানি সৈন্য নিহত হয়েছিল, তা যথাযথভাবে সিআইএ জানতে পারেনি। তবে সংখ্যাটা কয়েক শ’ থেকে কয়েক হাজার হতে পারে। সিআইএ’র হিসাব অনুযায়ী, ব্যবহৃত রাসায়নিক অস্ত্রের দুই তৃতীয়াংশ ইরাক ব্যবহার করেছে যুদ্ধের শেষ ১৮ মাসে।

১৯৮৮ সাল নাগাদ সাদ্দামের সামরিক বাহিনীর কাছে অবাধে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য পৌঁছাত। ওই বছরের মার্চে ইরাক তার দেশের দক্ষিণাঞ্চল হালাবজার কুর্দি গ্রামে আরেকটি রাসায়নিক হামলা চালায়।

এক মাস পর বসরার দক্ষিণ পূর্ব দিকের ফাও উপদ্বীপে ইরানি সৈন্য সমাবেশের ওপর আরেক দফা সারিন গ্যাস নিক্ষেপ করে ইরাক। এর ফলে ইরাকি সৈন্যরা দারুণ একটি জয় পেয়ে উপদ্বীপটি পুনঃদখল করে। এই জয়ের মাধ্যমে বসরা দখলের ইরানি অভিযান প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত খুশি হয়েছিল।

ইরাকিদের ফাও উপদ্বীপ জয়ের পর ফ্রানকোনা সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে রাসায়নিক পদার্থ নিক্ষেপের শত শত খালি কৌটা দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি কয়েকটি খালি কৌটা বাগদাদে নিয়ে এসেছিলেন। এগুলো ছিল ফাও উপদ্বীপে ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ।

সাদ্দাম হোসেন যে মাত্রায় সারিন গ্যাস ব্যবহার করেছিলেন, গত ২৫ বছরে সে ধরনের কিছু ব্যবহৃত হয়নি। আর এখন দামাস্কাসে আবার রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার দেখা গেল।।