Home » মতামত » চরম এই সঙ্কটে সামাজিক ও পেশাজীবী শক্তি কোথায়?

চরম এই সঙ্কটে সামাজিক ও পেশাজীবী শক্তি কোথায়?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

weপঞ্চাশ দশক থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সকল আন্দোলন সংগ্রাম, এমনকি একটি সশস্ত্র যুদ্ধের সংগঠক হয়ে উঠেছিল এদেশের সামাজিক শক্তিগুলি প্রধানত: ছাত্র সমাজ। অনেকেই ভুরু কোঁচকাতে পারেন যে, আন্দোলন সংগ্রামে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা ছাড়া এগুলি কিভাবে সংগঠিত এবং বাস্তবায়িত হয়েছে? ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬২’র শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যূত্থান এবং এ সকল গণআন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ৭১’র সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মত বিশাল রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকার কথা নয়। তারপরেও আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রধান বাঁকগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে মূলত: ছাত্রসমাজ এবং অগ্রসর মধ্যবিত্তরাই সকল জাতীয় আন্দোলনগুলির সূচনা এবং সফল করার বিষয়ে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছিল। আমাদের দোদুল্যমান এবং অনেকটা আপোষকামী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ সকল আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত হয়েছেন ধীরে সুস্থে, অনেকটাই দ্বিধাগ্রস্ততা নিয়ে। সেটি একটি বিশাল আলোচনা ও বিশ্লেষনের বিষয়। এই কলেবরে সে বিশ্লেষণে না গিয়ে কয়েকটি উদাহরন এখানে দেয়া হচ্ছে।

৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যূত্থান এই প্রধান আন্দোলনগুলি সূচনা করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। অচিরেই সারা দেশের সচেতন মধ্যবিত্ত নিু মধ্যবিত্ত শ্রেনী যুক্ত হয়ে আন্দোলনকে বেগমান করে তোলেন এবং একটি পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ এর সবচেয়ে বড় উদাহরন। ১৯৭০’র নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এটি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ থাকতে রাজী নয়। ঐ নির্বাচনের সুষ্পষ্ট ভাষা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আওয়ামী লীগ এটি কতটা অনুধাবন করেছিলেন সে আলোচনায় না গিয়ে এটি বলা যায়, জনগণ প্রস্তুত হচ্ছিল এবং রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা প্রত্যাশা করছিল। পরের ইতিহাস সকলের জানা, ২৫ মার্চ পাকিস্তানী হানাদাররা নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে দিক নির্দেশনাহীন অসহায় বাঙালী জান বাচানোর তাগিদে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধগুলি গড়ে তুলেছিল। এসকল প্রতিরোধগুলিও গড়ে উঠেছিল ছাত্র শিক্ষক, কৃষক শ্রমিক, পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের মাধ্যমে। ৭ মার্চের শেখ মুজিবের ভাষন ছাড়া রাজনৈতিক দিক নির্দেশনাবিহীন এই বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ চলাকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে এপ্রিল মাসে প্রবাসী সরকার গঠিত হওয়ার পরে মুক্তিযুদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আসে। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে বলা যায়, আমাদের দেশে সামাজিক শক্তিগুলি সবসময় যে কোন অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সূচনা ঘটিয়েছে। ৮০’র দশকে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথমে ছাত্রসমাজ এবং পরে বিভিন্ন পেশাজীবি সংগঠন, যেমন স্কপ, আন্দোলনের সূচনা করেছিল। যার চূড়ান্ত পরিনতিতে ১৯৯০ সালে তিন জোটের সম্মিলিত আন্দোলনে এরশাদের পতন ঘটে।

নয়া শতকের দ্বিতীয় দশকে এই সামাজিক শক্তিগুলির অস্তিত্ব প্রায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরশাদের পতনের পরে ক্ষমতাসীনরা ছলেবলেকৌশলে সামাজিক শক্তিগুলিকে চূড়ান্ত অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে গেছে। এখন ছাত্র, রাজনীতিক, পেশাজীবি সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়নসমূহ এবং সামাজিক সংগঠনগুলি ক্ষমতাসীনদের পেটোয়া বাহিনীতে পরিনত হয়েছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। অবৈধ উপায়ে অর্জিত এ সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে তারা জড়িয়ে পড়ছেন প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষায়, যা মূলত: জনগণের স্বার্থবিরোধী। বাস্তবায়ন করছেন রাজনৈতিক দলগুলির গণবিরোধী এজেন্ডা। ফলে অতীতের মত এই শক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্বের গণবিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে গত দুই দশকে কোন আন্দোলন দানা বেঁধে উঠতে পারেনি, দু’একটি বিচ্ছিন্ন উদাহরন ছাড়া।

৭৩ সালে ডাকসু নির্বাচনে সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টার মধ্য দিয়ে ছাত্র রাজনীতির চরিত্র হননের যে কাজটি শুরু হয়েছিল পরবর্তীকালে সামরিক সরকারগুলির হাতে যুব কমপ্লেক্সের মাধ্যমে তা বৈষয়িক পূর্নতা পায়। অন্যদিকে, জাসদ, সর্বহারা পার্টি এবং ৮০’র দশকে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সশস্ত্র রাজনীতি গোটা ছাত্র সমাজের নৈতিক বুনিয়াদ ভেঙ্গে দেয়। এই ধারায় ৯০ দশকে কখনও ছাত্রলীগ, কখনও ছাত্রদল হয়ে ওঠে ‘ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের দানব’। এর ফলে জনগণের চাহিদা, দাবি দাওয়া এবং অধিকারের বিষয়টি এ সকল সামাজিক শক্তিগুলির কাছে উপেক্ষিত হতে হতে শত্রুতায় পরিনত হয়।

২০১৩ সালে সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেসবুক ও ব্লগের মাধ্যমে যুব তরুনরা সংগঠিত হতে পেরেছিল প্রথাগত রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে অনেকটা স্বাধীন স্বত্তা নিয়ে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সরকারের দোদুল্যমানতা, বিরোধী দলের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জামায়তের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে এই সামাজিক শক্তিটি গণজাগরন মঞ্চ নামে সংগঠিত হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, সাধারন জনগণের আকাংখার সঙ্গে এই মঞ্চ ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়ির লড়াইয়ের মাঝে একটি স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে আর্বিভূত হবে। কিন্তু অচিরেই এটি প্রথাগত রাজনীতির জটিল এবং কুটিল আর্বতে হাবু ডুবু খেতে খেতে বিলুপ্ত প্রায় হয়ে গেছে। এটিও মধ্যবিত্ত নিুবিত্তের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির পরিচর্যার অভাবে ইতিহাসে একটি উদাহরন হিসেবেই থেকে যাবে।

যে কোন গণতান্ত্রিক সমাজে, বিশেষ করে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতি পাঁচ বছর পর পর একটি সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে জনগণ তার ইচ্ছের বহি:প্রকাশ ঘটিয়ে পছন্দের নেতৃত্বকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। গণতন্ত্রের ধারাবাহিক চর্চা না থাকায়, শুধুমাত্র নির্বাচনমূখী গণতন্ত্রের কারনে বাংলাদেশে এখন নিরপেক্ষ এবং জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর মত নির্বাচন অনুষ্ঠানই মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। ১৯৯০ সালে এরশাদ পতনের পরে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার কারনে স্বাধীনতার পরে সেই প্রথম এ ব্যবস্থার ওপরে জনগণের বিশ্বাস ফিরে এসেছিল। ফলে এটিকে সাংবিধানিক রূপ দেবার জন্য আওয়ামী লীগ, জামায়াত যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে অবশেষে সাফল্য লাভ করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাংবিধানিক কাঠামোয় স্বীকৃতি লাভ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্ন, অনেক সন্দেহ থাকার পরেও ৯৬ ও ২০০১’র নির্বাচনের পরে এটিকে দলীয়করনের অপচেষ্টার পরের পরিনতি সকলের জানা। কিন্তু দেশের জনগণের নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপরে আস্থা এখনও রয়ে গেছে। কারন তারা জানে, কোন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার স্বাধীন ইচ্ছের বহি:প্রকাশ ঘটানো অনেকটাই অসম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ঘোষনা দিয়েছেন, সংসদ ও মন্ত্রীসভা বহাল রেখেই আগামী ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল, এমনকি মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টিও জানিয়ে দিয়েছে, এধরনের নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না এবং একে প্রতিহত করা হবে। নির্বাচনে যদি সকল দলের অংশগ্রহন না থাকে, শুধুমাত্র প্রধান বিরোধী দল যদি নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে কি হতে পারে, সে উদাহরন তো আমাদের নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রের ইতিহাসে আছে। ৯৬’র ফেব্রুয়ারীতে নির্বাচন বর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তারা ছিল অটল। ক্ষমতাসীন বিএনপিকে দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। ২০১৩ ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জনের যদি ঘোষনা দেয় বিএনপি? এবারেও একই দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। ইতিহাস পুনরাবৃত্তি ঘটায় বটে! কিন্তু এত তাড়াতাড়ি!

নব্বই দশকের পর থেকে সাধারন নির্বাচন নিয়ে সংকট তৈরি করছে প্রধানত: ক্ষমতাসীনরা। এই সংকটকে আরো তাতিয়ে তুলেছে বিরোধী দলরা। সংসদ বর্জনের একটি স্থায়ী কালচার তৈরি হয়েছে। জনগণের দাবি দাওয়া ও প্রধান ইস্যুগুলিকে উপেক্ষা করে পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার প্রবনতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে জনগণকে। গত সাড়ে চার বছরে সরকারের একের পর এক গণবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার বদলে সংসদে ও রাজপথে বিরোধী দল চরম দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতে সংসদ ও রাজপথে উচ্চকিত হওয়া এবং জনগণকে সংগঠিত করার চেয়ে শর্ট কাট কোন উপায় ক্ষমতায় যাওয়াই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে জনগনের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই সাড়ে চার বছর ধরে গন ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়নি।

আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতার প্রতি লালসা, সুবিধাবাদিতা এবং প্রায় ক্ষেত্রে গণবিরোধী আচরনের প্রতিবাদসমূহ অতীতের সংগঠিত এবং সংঘটিত হয়েছে ঐতিহ্যগতভাবেই সামাজিক শক্তির মাধ্যমে। তাদের আপোষহীন আন্দোলন সংগ্রামের কারনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাধ্য হয়েছে জনগণের ইচ্ছের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে। যদিও সেটি সাময়িক সময়ের জন্য। ক্ষমতাসীন হলেই জনগণের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার সমস্ত কর্মকান্ড গৃহীত হয়েছে। এর বিপরীতে বিরোধী দলও সংকীর্ণ ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ন হয়ে গণবিরোধী চরিত্র অব্যাহত রেখেছে। যে সকল সামাজিক শক্তি এর বিরুদ্ধে অতীতে দাঁড়িয়েছে, ক্ষমতার খেলায় সামিল হয়ে ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে তারা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে। আজকের বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের গণবিরোধী অনমনীয়তা এ কারনেই প্রায় ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। কারন ক্ষমতা ধরে রাখা অথবা ক্ষমতায় যাওয়া যেখানে মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে জনগণ কোনভাবেই বিবেচিত হবে না।

সময় খুব বেশি নেই। সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সুরাহা না হয় আগত শীতকাল সম্ভবত: সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাত, ধ্বংস আর রক্তপাতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ক্ষয়িষ্ণু বিলুপ্তপ্রায় সামাজিক শক্তি উত্থানের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। প্রগতিশীল এই শক্তির অভাবের কারণে ক্ষমতালিপ্সু ও চরম দক্ষিণপন্থী নানা অংশ সামিল হবে আগামী ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে। তার পরিনতি কি হতে পারে, তা প্রায় সকলেরই জানা। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই অভাগা এই জাতি কি ইতিহাসের আরেকটি পুনরাবৃত্তির সাক্ষী হবে?