Home » শিল্প-সংস্কৃতি » চলচ্চিত্র পুনরুদ্ভবনের সাধক

চলচ্চিত্র পুনরুদ্ভবনের সাধক

ফ্লোরা সরকার

dizibrilলোকপ্রথা হলো ইমেজের প্রথা। লিখে কিছু বলার চেয়ে মুখে বলা কথা বেশি শক্তিশালী। শব্দ যায় কল্পনার দিকে, কানের দিকে নয়। কল্পনা সৃষ্টি করে ইমজেকে, আর ইমেজ সৃষ্টি করে ফিল্মকে। – – – প্রতিবার ছবি নির্মাণের সময় আমি চলচ্চিত্রকে নতুন করে উদ্ভাবন করি। ছবি নির্মাণের সময় আমি এই পুনরুদ্ভবনকে অনুভব করার চেষ্টা করি এবং চেষ্টাটা যথেষ্ঠ কষ্টসাপেক্ষ বিষয়, তবু করি” এভাবেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নানান কথার মধ্যে দিয়ে সেনেগালের চলচ্চিত্রকার দিজিব্রিল দিয়প ম্যামবেতি তার ছবি নির্মাণের উদ্দেশ্য, আগ্রহ, মতাদর্শের কথা জানিয়েছিলেন। তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত আলোচনা করার আগে জেনে নেয়া যাক সেনেগালের চলচ্চিত্রের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং সেই ইতিহাসের সঙ্গে ম্যামবেতির বেড়ে ওঠারও ইতিহাস।

স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত সেনেগালের চলচ্চিত্রের খুব একটা প্রসার লাভ ঘটেনি। ১৯৫৫ সালে পউলিন ভিয়েরা নির্মিত L’Afrique sur Seine প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। পরবর্তিতে বেশ কিছু স্বল্প দৈর্ঘের চলচ্চিত্র তার হাতে নির্মিত হয়। ১৯৬০ সালের ২০ জুন সেনেগালের স্বাধীনতার পর পরই চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ ঘটে। লেখক ওসমান সেমবেনের হাত ধরে প্রথম এই শিল্পের প্রসার লাভ ঘটে। ছোট গল্পের এই লেখক মূলত তার ছবিতে সামাজিক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং ক্রমে লক্ষ্য করেন চলচ্চিত্রই হচ্ছে একমাত্র মাধ্যম যার মাধ্যমে অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। ১৯৬৩ সালে নির্মিত হয় তার প্রথম ২০ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি The Wagoner। এই ছবিটিকে আফ্রিকার কালো আফ্রিকানের হাতে নির্মিত প্রথম অনন্য ছবি হিসেবে গণ্য করা হয় যেখানে দেখা যায় একজন ক্যাব ড্রাইভারের দারিদ্র পীড়িত জীবন কাহিনী যা স্বাধীন সেনেগালের একটি নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র ছিল। ১৯৬৬ সালে সেমবেনের হাতে নির্মিত হয় সেনেগালের প্রথম কাহিনী চিত্র La Noire de….। ১৯৭০ দশক ছিল সেনেগালের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। এই সময়েই দিজিব্রিল দিয়প ম্যামবেতির উদ্ভব ঘটে এবং নির্মিত হয় বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছবি। ম্যামবেতি চলচ্চিত্র মাধ্যমটিকে আফ্রিকার সামাজিক এবং রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন এবং সেমবেনের মতো তার ছবির বৈশিষ্ট্যও ছিল রীতিবিরুদ্ধ, সুরিয়ালিস্ট, বেগবান পদক্ষেপে পূর্ণ যার সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার বর্ণনামূলক আখ্যানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রায়িত। বিশেষত সেনেগালের বর্ণশঙ্করতার ওপর তার গুরুত্ব ছিল অত্যধিক। ১৯৬৮ সালে নির্মিত তার প্রথম ছবি Contrast Cityতে সেনেগালের কসমোপলিটন রাজধানী শহর ডাকারের বারোক স্থাপত্যের সঙ্গে দেশের অন্যান্য দরিদ্রপীড়িত অঞ্চলের একটি অপূর্ব তুলনামূলক চিত্র পরিবেশন করেন। ১৯৭০ সালে নির্মাণ করেন তার দ্বিতীয় ছবি Badou Boy। যেখানে সেনেগালের রাজধানী শহরের চিরবিষন্নতা ফুটিয়ে তোলার জন্য কেন্দ্রীয় চরিত্রে একটি জটিল মনের পুলিশকে দেখা যায় যার সঙ্গে প্রথাবিরোধী একটি চরিত্রের সংঘর্ষ ঘটে। ১৯৭৩ এ নির্মিত The Hayena’s Journey ম্যামবেতির অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। যেখানে তিনি প্রান্তিক মানুষের কথা ব্যক্ত করেছেন। ম্যামবেতির প্রান্তিক মানুষ তারা যারা সমাজে বসবাস করেও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, আর তাই ছবির মরি এবং তার প্রেমিকা আনতা ডাকারের কর্দমাক্ত শহর ছেড়ে দূরে কোথাও যাবার স্বপ্ন দেখে। তাদের এই দূর যাত্রার কাহিনীকে কেন্দ্র করেই ছবির গল্প আবর্তিত। ছবিটি সেই সময় কান ফেস্টিভালে আন্তর্জাতিক ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড এবং মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভালে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে আন্তর্জাতিক ভাবে সেনেগালের ছবিকে বিশ্বের সামনে নিয়ে আসে। ১৯৯২ এ নির্মিত Hayenas তার আরেকটি অনবদ্য ছবি। ১৯৯৮ এ তার মৃত্যুর পর ১৯৯৯ এ প্রকাশ পায় তার অপর একটি ছবি The little girl who sold the sun, যেখানে রাস্তায় বেড়ে ওঠা শিশুর জীবন সংগ্রামের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। ম্যামবেতির সাক্ষাৎকারের মাঝে মাঝে আমরা এসব ছবির আলাপন জানতে পারবো। সেনেগালের অপর একজন বিশেষ উল্লেখযোগ্য নারী চলচ্চিত্রকার ড.সাফি ফাইয়ে যিনি, ফ্রান্সের সহায়তায় Kaddu Beykat ছবিটি নির্মাণের পর পরই এবং বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হওয়া সত্ত্বেও সেনেগালে তা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তবে নির্মাণ তার রুদ্ধ হয়ে যায়নি, বেশকিছু ছবি তার হাত দিয়ে নির্মিত হয়েছে। আশির দশকের দিকে সেনেগালের ছবির সংখ্যা এবং মান পড়তে থাকে। কারণ হিসেবে আর্থিক দুরবস্থাকে প্রধান বলে গণ্য করা হয়।

এই আর্থিক কারণের অপারগতার কথা দিয়েই ম্যামবেতির সাক্ষাৎকারের আলোচনা শুরু করা যাক। ম্যামবেতি তার হায়েনাস ছবি প্রসঙ্গে বলেন – “ফিল্মকে রহস্যমুক্ত করার মস্ত বড় এক স্বপ্ন আছে আমার বিশেষ করে ফিল্মের আর্থিক দিক বিবেচনায়। হায়েনায় পুরো পৃথিবীকে মানুষের গল্প শোনানোর সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছি আফ্রিকান সৌন্দর্যের প্রতি। আমার জন্য, সেই সৌন্দর্যের একটি অংশ হলো এই উপলব্ধি যে, আফ্রিকায় ফিল্ম বানানো খুব বেশি কঠিন কিছু না। এই ফিল্মের শেষদিকে চালের পরিত্যক্ত যে বস্তাগুলো কলোবানের মানুষদের পরতে দেখা গেছে সেগুলোর দাম কিন্তু বেশি না। এগুলো ব্যবহারের জন্য প্রোডাকশনকে খুব বেশি টাকা গুনতে হয়নি।”এভাবেই তিনি ছবির নির্মাণের পাশাপাশি ছবি তৈরির আর্থিক দিকের নবউদ্ভাবনও খুঁজে বেরিয়েছেন। হায়েনা ছবিতে বিশ্ব ব্যাংক এবং আই.এম.এফকে কটাক্ষ দৃষ্টিতে উপস্থাপন প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন – “তুমি যদি অর্থ চাও তাহলে তোমাদের যে কোন একজনকে জীবন দিতে হবে। আই.এম.এফ এবং বিশ্ব ব্যাংকও ঠিক এই কাজটা করে পৃথিবীর দক্ষিণের দরিদ্র দেশগুলোর সঙ্গে। তারা আফ্রিকার মানুষকে বলে – “আমরা জানি তোমরা গরীব, কিন্তু তোমাদের প্রচুর লোক কাজ করে যাদের বেতন তোমরা ঠিকমতো দিতে পারো না, কাজেই তোমাদের কাউকে না কাউকে মারা তো যেতেই হবে। এভাবে মারা যাবার পর লোকসংখ্যা যখন কমে আসবে তখন তোমাদের অর্থ দিতে পারবো। তোমাদের অর্থনীতি তোমাদেরকেই পরিস্কার করতে হবে, প্রচুর মানুষ মেরে ফেলো এবং তারপর অর্থ গ্রহণ করো। এরপর প্রশ্ন করা হয় – “কাজেই তুমি মনে করছো আফ্রিকার মানুষ এটা গ্রহণ করেছে এবং মানুষ মারছে বিশ্ব ব্যাংকের কারণে?” উত্তরে ম্যামবেতি বলেন – “নিশ্চয়ই। এটা অংকের হিসাব, মেরে ফেলো এবং অর্থ গ্রহণ করো”। হায়েনা ছবিতে তাই বিশ্ব ব্যাংক আর আই.এম.এফ কে হায়েনা রূপে প্রতীকী উপস্থাপন করেন আর হাতিকে জীবন প্রবাহের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। অপর দিকে দ্যা জার্নি অফ দ্যা হায়েনা’য় মরি এবং আন্তা নতুন সেনেগাল গড়ার স্বপ্ন দেখে না। তারা সেখান থেকে পালিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখে। ছবিটিতে শব্দ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন – “মিউজিক বাছাই করি না আমি, শব্দ বাছাই করি। সব ধরণের চলিষ্ণুতাই বোধের সহগামী। বাতাস খুব ভালোলাগে আমার। বাতাস তো মিউজিক, মিউজিকও তেমনি বাতাসের মতো”। তার হায়েনা ছবিটি মানুষ ও মানব সমাজের নগ্নতার অতি দুঃখবাদীর একটি চিত্র হলেও তার সাক্ষাৎকারে আমরা জানতে পারি দুঃখবাদকে চিরস্থায়ী করে দেখতে তিনি আদৌ আগ্রহী নন। যে জন্যে তার অপর একটি ছবি ‘দ্যা ফ্রাঁ’ তে দেখা যায় নায়ক লটারির টিকেট পাবার পর দিশেহারা হয়ে যায় নিজেকে সামলাবার জন্যে। তাই সেই ছবি প্রসঙ্গে বলেন “স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা তার আছে”। ‘দ্য লিটল গার্ল হু সোল্ড দ্যা সান’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন – “সব নায়কই মেয়েটির ম্যাগাজিন বিক্রি করতে চায় কিন্তু টাকা প্রতীকী হিসেবে আসে মেয়েটির পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিতে। একজন লোক ৫ ফ্রাঁ (ফরাসি মুদ্রা) দামের ম্যাগাজিন কেনে ৫০০ ফ্রঁ দিয়ে। এভাবে ধনী লোকটা একটা ঝামেলার সৃষ্টি করে। কিন্তু মেয়েটা ঠিক তা সামলে নেয়, কেননা ভালো কিছু স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা সে রাখে”। “দ্যা স্টোন কাটার” প্রসঙ্গে তিনি জানান – “ছবিটি দেখায় কী করে একজন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সৌন্দর্যের স্বপ্ন দেখতে পারে”। তাই তার কাছে – “স্বপ্ন দেখানোর বেলায় ফিল্ম কাজ করে যাদু হয়ে”।

স্বল্পায়ু এই পরিচালকের ছবির সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু এই স্বল্প সংখ্যক ছবি দিয়েই সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকে বিশ্ব চলচ্চিত্রে আলোড়ন তোলেন। আফ্রিকার একজন শিক্ষা স্কলার শেইলা পেটি তার সম্পর্কে বলতে যেয়ে বলেন – “আফ্রিকার অন্যান্য চিত্র পরিচালক ’৬০ দশকের শেষে এবং ’৭০ দশকের শুরুতে তাদের ছবিগুলিতে যেখানে জাতীয়তাবোধ এবং আফ্রিকান মূল্যবোধের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার সংঘর্ষকে জোর দিয়ে ছবি নির্মাণ করেন, ম্যামবেতি সেখানে জীবনের বহুমূখীনতার ওপর জোর দিয়েছেন। – – – – তার ছবি আফ্রিকান জাতীয়তাবোধ বা ফ্রেন্চ ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির সীমাবদ্ধ গন্ডীর ভেতর বাঁধা থাকেনি। তার ছবির মন্তাজ দৃশ্যের মিশেলে থাকে সনাতন ও আধুনিক আফ্রিকার এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতির বর্ণশঙ্কর চিহ্ন ও শব্দ। আর তাই তার সাক্ষাৎকারে তিনি – “ফিল্মে দিগন্ত উন্মুক্ত করার ইচ্ছা” ব্যক্ত করেন। ‘কন্ট্রাস্ট সিটি’ প্রসঙ্গে তাই তিনি বলেন – “ছবিটিতে আমি নিজেকে নিয়ে মজা করেছি। উপনিবেশবিরোধী উচ্চহাসির মানে কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে নিয়েই হেসে ওঠা। আমি ভাবদর্শবাদী না। ঠিক ভালোবাসতে জানি না, আর ভালোবাসা অস্বীকার করতেও জানি না”। তবু তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় – “কন্ট্রাসট সিটিতে আর্কিটেচারের সমালোচক বিদেশি হস্তক্ষেপ আফ্রিকান সংস্কৃতির ওপর যথেষ্ট হামলা বলেই তার বিশ্বাস এর কথা যখন ব্যক্ত করেন তখন সেই সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?” ম্যামবেতি একটি চমৎকার উত্তর দিলেন – “আপনার যদি কোন সন্তান থাকে তাহলে তার কথা আপনার মনে পড়বেই। মা আপনাকে কীভাবে পিঠে ঝুলিয়ে রাখতেন সেই কথা আপনি ভুলতে পারবেন না। আর যদি দেখেন, আপনার মা যেভাবে আপনাকে কোলে নিতেন, ঠিক সেভাবে আপনার শিশু সন্তানটিকে কোলে নেয়া হচ্ছে না, তাহলে কিন্তু আপনি ক্ষেপে গিয়ে বলবেন, ‘না না এটা এভাবে না। আমার মা এভাবে কোলে নিতেন না। এটা আমার অরিজিন না। এভাবে আমি আমার সন্তানকে কোলে নেবো না’। এটাই আমার দৃষ্টিভঙ্গি”। ম্যামবেতি তার নিজের এই প্রকৃত একান্ত নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই নির্মাণ করেছিলেন তার অসাধারণ সব আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র। ক্ষণজন্মা এই চলচ্চিত্রকার যদি মাত্র ৫৩ বছর বয়সে লাং ক্যানসারে মারা না যেতেন আমরা হয়তো তার হাত দিয়ে আরও কিছু অসাধারণ সৃষ্টি দেখতে পেতাম। কিন্তু যে কয়টা ছবি তিনি নির্মাণ করে গেছেন সেগুলোও যদি আমরা সদ্ব্যবহার করতে পারি অর্থাৎ সেসব ছবি থেকে শিক্ষা নিতে পারি তাহলে আমাদের মতো পৃথিবীর অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ক্রমোন্নতি ঘটবে।।