Home » মতামত » ত্বকী খুনের বিচার আদৌ হবে কি?

ত্বকী খুনের বিচার আদৌ হবে কি?

তারিক মাহমুদ

Tokiত্বকী খুন হয়েছেন ৬ মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত খুনিদের গ্রেফতার বা আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। পুলিশ গোয়েন্দ সংস্থা হয়ে র‍্যাব মামলাটির দায়িত্ব গ্রহন করেছে, তাও অনেক দিন হলো। অগ্রগতি বলতে শুধুমাত্র একজনের জবানবন্দি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই পর্যন্তই। এর বেশি কিছু এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে: এই খুনের বিচার আদৌ হবে কিনা।

প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত মানুষ মারা যাচ্ছে। তার মাঝে রাজনৈতিক কারণে খুনের সংখ্যাও কম নয়। রাজনৈতিক কারণে খুন হয়েছেন এমন অসংখ্য মানুষের তালিকা করা সম্ভব। বেশির ভাগই ক্ষেত্রেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে দলীয় আন্তকোন্দল, ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালীদের মধ্যেকার এবং তাদের বিরোধের কারণে এমনটা ঘটছে। ক্ষমতাসীনদের কারণে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই রকম খুনের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে।

নির্বাচনের আগে এবং পরে, রাজনৈতিক আধিপত্য টিকেয়ে রাখতে দেশের প্রধান দলগুলো নিরন্তর ভাবে সন্ত্রাসের চর্চায় নেমেছে। সবাই যে যার মত সন্ত্রাসী লালনপালন করছে। সন্ত্রাসীরা এলাকা ভিত্তিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সরকারী বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে হস্তক্ষেপ, টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে চাদাবাজী মাদক ব্যাবসা সহ এসবই নিয়ন্ত্রন করে থাকে। হুমকি ধামকি, মারধর, মিথ্যা মামলা এবং প্রয়োজনে খুন। রাষ্ট্র আছে, আইন আদালত পুলিশ র‍্যাব সবই আছে; কিন্তু নেই কোন কার্যকর ভূমিকা। যে সকল পরিবারের সদস্য খুন হচ্ছেন, তারাও একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে আর খুনিদের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ মেয়াদে এক সময়ে হতাশ হয়ে বিচার পাবার আশা ত্যাগ করেন। খুনিরা তাই দাপটেই বিরাজ করে। তারা রাজনৈতিক দলের অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় খুন জখমের তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে।

ত্বকী খুনের ঘটনাটা এরই অন্তর্ভুক্ত। পার্থক্য যেটুকু তা হলো ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষদেরকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক নানা সমস্যাসহ সন্ত্রাস দূনীতি মাদক ভেজাল ইত্যাদির বিরুদ্ধে সংগঠনিক ভাবে সক্রিয় প্রতিবাদ জারী রাখার চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ, বিআরটিসি বাস চালু করা, রেলওয়ের সম্পদ দখলের প্রতিবাদ থেকে নানা বিষয় অর্ন্তভূক্ত। নারায়গঞ্জের নাগরিকদের একটা অংশ এই সকল বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সচেতন, তাদের কর্মসূচি ও প্রতিবাদে; যেটি নারায়ণগঞ্জে যারা সন্ত্রাস ও দখলদারীর মধ্যে দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে তাদের সমস্যার কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল। আর তারই শোধ নিতে খুন করা হয় ত্বকীকে তার বাবাকে শায়েস্তা করতে।

কিন্তু অন্যান্য ঘটনার মত ত্বকী খুনের ঘটানটি নারায়ণঞ্জের মানুষের কাছ থেকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। এর কারণ নারায়ণগঞ্জবাসীর দীর্ঘকালের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ। এই খুনের বিচারের দাবীতে তারা সক্রিয় হয়েছেন গত ৬ মাস ধরে। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের অন্য যে কোন অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন নজির। আর এই ঘটনা এখন নারায়গঞ্জ সহ সারা দেশেই প্রভাব ফেলেছে। বিশেষত নারায়ণগঞ্জে যারা সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের প্রভু, তাদের অস্তিত্বের সংকটে পরিনত হয়েছে। গত মাসেই নারায়ণগঞ্জের বাস মালিক সমিতির একটি বড় অংশ সন্ত্রাসি গডফাদারদের চাদা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে। এমনি তারা নিজেরই বাসের ভাড়াও ২ টাকা কমিয়েছে। বন্ধন বাস মালিক সমিতির তথ্য থেকে জানা গেছে, গত সাড়ে ৪ বছরে সন্ত্রাসী গডফাদারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ৭ কোটি ৯ লক্ষ ৫২ হাজার ৫ শত টাকা চাদাবাজি হয়েছে। এর আগে নারায়ণগঞ্জের যাত্রি অধিকার সংরক্ষন ফোরাম দাবী করেছিলো গত সাড়ে ৪ বছরে এই সন্ত্রাসীরা পরিবহন সেক্টরের বাস মালিকদের থেকে ২০০ কোটি টাকা চাদাবাজী করছে।

পরিস্থিতি হচ্ছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে পুরো অঞ্চলের সবস্তরের মানুষ অসহায়। আর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ক্ষমতা দলের, ক্ষমতাসীন সরকার, শেষ বিচারে রাষ্ট্রের। সমস্ত বিচারে এখন নারায়ণগঞ্জে ত্বকী খুনের বিচার শুধু মাত্র একটি খুনের বিচারই না, এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত হয়ে পড়েছে। প্রতিকায় প্রকাশিত হয়েছে ত্বকী হত্যার মামলার কার্যভার র‍্যাব গ্রহন করার পর নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের সহযোগীদের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এত কিছুর পরেও এখনো ত্বকী খুনের বিচারের কোনো কূল কিনারা হয়নি। কবে হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু বিচারের দাবীতে নানা কর্মসূচি দিতে হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের মানুষকে। বিচার কাজটি আদৌ হবে কিনা এবং প্রকৃত সন্ত্রাসী ধরা পড়বে কিনা তা নিয়ে এখনো সংশয় সন্দেহ রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এতো দীর্ঘকাল ধরে একটি অঞ্চলের নাগরিকদের ধারাবাহিক আন্দোলনের পরেও রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় খুনিদের বিচার হবে কিনা, নাগরিকরা সন্ত্রাসী খুনিদের কাছ থেকে মুক্তি পাবে কিনা, সেই প্রশ্নটি স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। সন্ত্রাসী গডফাদারদের ক্ষমতার শেকড় রাজনৈতিক, ফলে ত্বকী হত্যার বিচার এবং সন্ত্রাসী গডফাদারদের উচ্ছেদ করতে হলে, এদের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে, আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতিকে নিয়ে আসতে হবে জনগণের পক্ষে এবং রাজনীতিকেই মুক্ত করতে হবে। ত্বকী খুনের বিচার সেই রাস্তা উন্মুক্ত করতে পারবে কিনা, সেটি দেখার প্রত্যাশায় এখন নারায়ণগঞ্জবাসীসহ দেশের মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে।।