Home » রাজনীতি » নির্বাচন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতা

নির্বাচন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতা

আমীর খসরু

bangladesh-govtআগামী নির্বাচনটি কোন সরকারের অধীনে হবে এ নিয়ে চরম সঙ্কটে পড়েছে পুরো দেশ। কিন্তু এই সঙ্কটের পাশাপাশি আরো নতুন কিছু সঙ্কটের আভাষ পাওয়া যাচ্ছে। নতুন এই সঙ্কটটি দেখা দিতে পারে এবং যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না, তাহলো ক্ষমতা হস্তান্তরের। অর্থাৎ বর্তমান সরকারের অধীনে মন্ত্রিসভা এবং সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে এই সঙ্কটটি যে দেখা দেবে এমন জোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।

প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে সচিবদের সভায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি সম্ভাব্য রূপরেখা দিয়েছেন। সংসদ থাকতে সচিবদের সভায় এই নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণাটিকে কেউই তেমন ভালো চোখে দেখেননি, দেখার কথাও নয়। কারণ এই ধরনের একটি রূপরেখা, সংসদ যতো অকার্যকরই হোক না কেন, সেখান থেকেই আসা উচিত ছিল। কিন্তু নির্বাচনে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকার কারণেই প্রধানমন্ত্রী এই ঘোষণাটি সেখান থেকে দিলেন কিনা সে প্রশ্নটি এখন বার বার ঘুরে ফিরে আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্প কিছুকাল আগে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল ছোট মন্ত্রিসভা থাকবে, যারা নির্বাচনকালীন সময়ে কোন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেবেন না, শুধুমাত্র দৈনন্দিন কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। কিন্তু এখন ভাবসাবে যেটা দেখা যাচ্ছে পুরো মন্ত্রিসভা থাকবে, জাতীয় সংসদ বহাল থাকবে। আর সরকারের প্রধান তো প্রধানমন্ত্রী থাকছেনই। আর এ সব কিছু রেখেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সমস্যাটি হচ্ছে সেখানেই। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অন্য দেশে যা হয় বাংলাদেশেও তাই হবে। এখানে পশ্চিমী দুনিয়ার উদাহরণটি বার বার দেয়া হচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমী দুনিয়া কিংবা পার্শ্ববর্তী ভারতেও কি নির্বাচনকালীন সময়ে যে সরকারটি থাকে তাদের মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা সীমাহীন ক্ষমতা দেখান? দেখান না কারণ নির্বাচনটি পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করে নির্বাচন কমিশন। সরকারের কেউ যদি নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে বা সহজ কথায় ক্ষমতার হম্বিতম্বি দেখান তাহলে তিনি বা তারাই বিপদে পড়েন। নির্বাচন কমিশনের নজরদারি ওই সব দেশে বেশ জোরালো এবং শক্তিশালী। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের হাল হকিকত সম্পর্কে সবারই জানা আছে। কাজেই নির্বাচন অনুষ্ঠানটি নিয়েই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে সংবিধান, তা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তার বদলে চরম অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে।

সঙ্কট শুধু এখানেই নয়। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়েও জটিলতার নানা বিষয়াদি রয়ে গেছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে সংবিধান এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বেশ কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। সংবিধানে বলা হয়েছে, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে রিটার্নিং অফিসার ফলাফল প্রকাশ করেন যথাযথ সই স্বাক্ষরের পরে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও’র ৩৯ ধারায় এ সম্পর্কে বলা হয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, রিটার্নিং অফিসার নির্বাচন কমিশনকে ফলাফলের যে কপি পাঠাবেন তার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন অফিসিয়াল গেজেট প্রকাশ করবেন। এই গেজেট কখন হবে, কতোদিনে করতে হবে এর কোনো নির্দেশনা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা সংবিধানে নেই। তবে সংবিধানের ১৪৮ () – এর () অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে – ‘১২৩ অনুচ্ছেদের ৩ দফার অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন ব্যক্তি যে কোন কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’

আবার সংবিধানের ১২৩ এর () অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে – ‘….. তবে শর্ত থাকে যে এই দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।

১৪৮ এর বিধানটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, যাতে বলা হয়েছে নির্দিষ্ট বা যথোপযুক্ত ব্যক্তির কথা। এই নির্দিষ্ট বা যথোপযুক্ত ব্যক্তি যদি স্পীকার অথবা অন্য যিনিই হোন তিনি তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়াবেন। যদি তিন দিনের মধ্যে শপথ না পড়ান বা না পারেন তাহলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন।

যদি সংসদ রেখেও নির্বাচন হয় তাহলেও গেজেট হওয়ার তিন দিনের মধ্যে শপথ পাঠ করাতে হবে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, গেজেট কবে হবে, সেখানে কোন সময়সীমা বলা নেই। এখানে নির্বাচন কমিশন বিলম্ব করেও গেজেট প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে। এছাড়াও ১৪৮ () এ বলা হয়েছে – ‘এই সংবিধানের অধীন যে ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথ গ্রহণ আবশ্যক, সেই ক্ষেত্রে শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’

তাহলে সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিলেই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ব্যক্তি ওই পদে বহাল অর্থাৎ সংসদ সদস্য রূপে বহাল রয়েছেন বলেই গণ্য হবেন। তাহলে একটি প্রশ্ন এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে আসবে। কারণ সংসদ রেখে যদি নির্বাচন হয় তাহলে গেজেট কবে হবে? তাছাড়া নির্বাচন হয়ে গেলে এবং (১২৩ এর () অনুচ্ছেদ অনুযায়ী) বর্তমান সংসদের মেয়াদ থাকলে সে ক্ষেত্রে একটি জটিলতার সৃষ্টি হবে। তাছাড়া নির্বাচন কমিশন যদি ফলাফল প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই গেজেট প্রকাশ করে এবং যদি শপথ পড়ানো হয় তাহলে একই নির্বাচনী আসনে দুইজন করে সংসদ সদস্য থাকবেন। অর্থাৎ বর্তমান যিনি সংসদ সদস্য রয়েছেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। এ ধরনের জটিলতা অতীতে ছিল না। কারণ পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদেই স্পষ্টভাবে বলা ছিল – ‘মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতিত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ এখানে সংসদ ভেঙে দেয়ার পরেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান ছিল। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে দুটো বিধান যুক্ত হয়েছে। ১২৩ এর () অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে – ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে () মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; এবং () মেয়াদ অবসান ব্যতিত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। ’ কাজেই পঞ্চদশ সংশোধনীর পরে মেয়াদ অবসানের কারণে হলে এক পদ্ধতি আবার মেয়াদ অবসান ব্যতিত অন্য কোন কারণে হলে অন্য পদ্ধতি। আর এ দুই পদ্ধতির কারণে স্বভাবতই একটি জটিলতা থেকে যাচ্ছে।

সংবিধানের ৭২ এর ১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের অতিরিক্ত বিরতি থাকবে না। কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে এক্ষেত্রে ৬০ দিনের বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী যদি ৬০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করা হয় এবং অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন যদি তফসিল ঘোষণা করে তাহলেও একটি জটিলতার সৃষ্টি হবে। এছাড়া তফসিল ঘোষণার পরে যদি কোন রাজনৈতিক সমঝোতা হয় এবং এ কারণে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হয় অথবা বর্তমান সরকার যদি মনে করে সংসদ ভেঙে দিয়ে তারা নির্বাচন করবে কিংবা সরকারের মেয়াদ যদি আরো তিন মাস বাড়ানোর অভিপ্রায় থাকে সেক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে দেয়া হলে নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পরিচালনার যে সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে তাতে ভয়াবহ সঙ্কট দেখা দেবে। কারণ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের পরিপূর্ণ এখতিয়ার এবং সংবিধানে এমনটাই বলা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন থাকে সংসদের সময়কাল কতোদিন হবে বা কবে ভাঙবে এবং এর দায়িত্বটি কার? রাজনৈতিকভাবে এটি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করলেও সংসদ ভাঙতে পারেন না, যতোক্ষণ পর্যন্ত না তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আসে এবং প্রধানমন্ত্রী আর আস্থাভাজন না থাকেন অথবা আস্থাভাজন অন্য কাউকে না পাওয়া যায়। এই অবস্থায় রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন অন্য কাউকে আর পাওয়া যাবে না সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিই সংসদ ভেঙে দিতে পারেন। এর বাইরে সংসদ ভাঙার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীকে সংবিধান দেয়নি। তবে প্রথা ও কনভেনশনে আছে প্রধানমন্ত্রী আগাম নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দেয়ার আহ্বান জানাতে পারেন। ১৯৯৬ সালে কিন্তু এ রকমটি হয়েছিল। কাজেই সংবিধান অনুযায়ী ইচ্ছা করলেই প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভেঙে দিতে পারেন না। তাছাড়া নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়াদি নির্ধারণের কর্তৃপক্ষ হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রধানমন্ত্রী এ কারণেই যেমন তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন না, তেমনি সংসদের মেয়াদও নির্ধারণ করতে পারেন না সংবিধান অনুযায়ী।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে গেজেট প্রকাশ সংক্রান্ত জটিলতা। কারণ গেজেট প্রকাশ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের হাতে ক্ষমতা রয়েছে।

এতো সব সাংবিধানিক জটিলতা সামগ্রিক জটিলতাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত। আর সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই জটিলতার সৃষ্টি করেছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? একটিই মাত্র উপায় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান।।