Home » রাজনীতি » সংলাপ হলেও সঙ্কটের জট খুলবে কিনা

সংলাপ হলেও সঙ্কটের জট খুলবে কিনা

পীর হাবিবুর রহমান

khaleda-hasina-cartoonরাজনৈতিক সংকটের জট এখন মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্তর্বর্তী সরকারেই আটকে গেছে। আওয়ামী লীগ জোট নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকেই চূড়ান্ত করে রেখেছে। শেখ হাসিনার অধীনেই অন্তর্বর্তী সরকারে তাদের ১১ সদস্যের মন্ত্রিসভা থাকবে এই প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একচুলও ছাড় দিতে নারাজ। আওয়ামী লীগের ধারণা এই জায়গা থেকে সরে গেলে বা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না থেকে সংসদের নির্বাচিত অন্য কাউকে দিলেই মাঠ পর্যায়ে তাদের দলীয় প্রার্থী ও কর্মীরা মানষিক শক্তিই শুধু হারিয়ে ফেলবে না, রীতিমত বিরোধী দলের অগ্নিরোষের মুখে পড়বে, ভোটযুদ্ধে পিছিয়ে যাবে। এছাড়া শেখ হাসিনা ছাড়া সংসদের নির্বাচিত অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী করলে দলের অধীনে নির্বাচনে নির্বাচনকালীন সরকার প্রধানের যে দৃঢ়তা ও শক্তি প্রদর্শন করতে হয় তা দেখাতে পারবেন না বলে তাদের ধারণা। অন্যদিকে, বিরোধী দল বিএনপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনে যোগদানকে তাদের নৈতিক পরাজয় ও রাজনৈতিকভাবে সরকারের পাতানো ফাঁদে পা দেওয়ার মতো আত্মঘাতী বিষয় বলে মনে করছে। তাদের এক কথা সংবিধানের আওতায় সবার অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন করতে হলে দুই পক্ষের ১১ জন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করিয়ে সেখানে আলোচনার ভিত্তিতে ১১ জন নির্দলীয় ব্যক্তিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে হবে। সরকার এটিও মানতে নারাজ। পর্দার অন্তরালে কূটনৈতিকদের অব্যাহত চাপ রয়েছে দুই পক্ষের ওপর। তাদের একটিই কথা সবার অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন করতে হবে এবং সংকট সমাধানে সংলাপে বসে পথ খুঁজতে হবে। ঢাকাস্থ পশ্চিমা কূটনীতিক এবং দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা পর্দার অন্তরালে দুই পক্ষের সঙ্গে নিরন্তর আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন প্রথমে দূত পাঠিয়ে এবং পরে দুই নেত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনার পরও সংলাপ সমঝোতার দুয়ার খোলেনি। সর্বশেষ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছতে এবং সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে দুই নেত্রীকে পৃথক পৃথক চিঠি দিয়েছেন। তিনি তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে কূটনৈতিক চাপও অব্যাহত রয়েছে। এই অবস্থায় দেশ দুনিয়াকে দেখাতে হলেও দ্রুত সংলাপের আয়োজন করা সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বও সংলাপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। দ্রুতই সংলাপ করার কথা ভাবছে সরকার। কিন্তু, দুই পক্ষ যেভাবে যার যার অবস্থানে অনঢ় তাতে সংলাপ হলেও সমঝোতা হবে কিনা এই প্রশ্ন রয়ে গেছে। কারণ, দলীয় ও নির্দলীয় সরকার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ বিএনপি যার যার অবস্থান থেকে নড়ছেন না। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে আওয়ামী লীগ যেটুকু ছাড় দিতে রাজি আছে তা হচ্ছে . প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই হবেন অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান। তার অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রীরা হবেন নিজ পছন্দের। তবে বিএনপি আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনে এলে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠণ করে তাদের হাতে প্রশাসন ছেড়ে দিতে পারেন। এমনকি নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার চিন্তা ভাবনাও করছে সরকার। বিরোধী দল বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা একটিই কোনো ফর্মূলায় কাজ হবে না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানতে হবে। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠণ ও প্রশাসন ঢেলে সাজানোর বিষয়টিতো রয়েছে। তবে বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলেই বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করছে। সব দলের সঙ্গেই তারা বৈঠক করছেন, মত বিনিময় করছেন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য তারাও খুটিনাটি সবকিছু জানার চেষ্টা করছেন। তাদেরও এক কথা সবার অংশগ্রহণে হতে হবে আগামী জাতীয় নির্বাচন। কোন কোন কূটনীতিক শেখ হাসিনার অন্তবর্তী সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিএনপিকে। পারস্পরিক অনাস্থা ও অবিশ্বাসের কারণে সরকার নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রেখে অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলছে এবং ওই পথেই হাটছে, আর বিরোধী দল ততোই আপত্তি জানাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা যেখানে সংলাপই শুরু হয়নি সেখানে ব্রিটিশ আবহাওয়ার মতো চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে আগাম ভবিষ্যদ্বানী করা যাচ্ছে না। তাদের কথা একটাই দুই পক্ষ সমঝোতায় না এলে একতরফা নির্বাচনের পরিণতি শুভ হবে না। বিরোধী দলের রাজপথের ফায়সালা আর সরকারের একগুয়ে নীতি রাজনীতিকে সংঘাত, সহিংসতার দিকেই ঠেলে দেবে। এমনকি একতরফা নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা অর্জন দূরে থাক রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দলকে মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে পরিস্থিতি বিস্ফোরণমুখ করে দেবে। সরকারের তরফ থেকে উদ্যোগ নিয়ে সংলাপে বসলে সমঝোতার আলো টানেলের শেষ প্রান্তে দেখা যেতেও পারে। পশ্চিমী দেশ ও দাতা সংস্থাগুলো যেভাবে সকলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে মরিয়া সেটি কতটা সফল হবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

পশ্চিমা কূটনীতিকদের কেউ কেউ বিএনপিকে নির্বাচনে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে এমনও বলছেন, পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যে ফলাফল দেখা গেছে তাতে বিরোধী দলের নির্বাচনে যাওয়াই হবে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত। তাদের মতে, এই সময়ে নির্বাচনে অংশ নিলে জনমত বিএনপি’র পক্ষেই থাকবে। সেই সঙ্গে নির্বাচন হবে গ্রহণযোগ্য। কারণ, ভোটার আইডি কার্ডের নির্বাচন এবং মানুষের স্বতঃস্ফুর্ততার মধ্যে তামাম আন্তর্জাতিক দুনিয়া শুধু দৃষ্টিই রাখবে না, অনেকে পর্যবেক্ষক হিসেবে মাঠে থাকবেন। বিএনপি তাদের বলছে, ক্ষমতায় যাওয়া বড় নয়। নির্বাচনী ব্যবস্থাটাই বড়। তাই তারা এই দাবিতে অনঢ়।

সব কথার শেষ কথা অনেকের ধারণা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে বিএনপি নির্বাচন কমিশন ছাড়াও প্রশাসন নিয়ে অনেক দাবি দিতে পারে যা সরকার গ্রহণ করবে বলে অনেকে মনে করছেন। কিন্তু, সংলাপের দুয়ার না খুললে সমঝোতার আলামতই পাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে সংলাপ কবে হবে, সমঝোতা হবে কিনা এবং দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকলে প্রশাসনকে প্রভাবিত করবে না, একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন হবে এমন গ্যারাণ্টি বা সুযোগ তৈরির ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতের মুঠোয়ই রয়েছে। ছাড় তিনিই একমাত্র দিতে পারেন। পর্যবেক্ষকদের মতে প্রধানমন্ত্রীর ছাড়ের পর বিরোধী দলের নেত্রীকেও ছাড় দিতে এগিয়ে আসতে হবে। দুই পক্ষ ছাড় না দিলে সবার অংশগ্রহণে উৎসবমুখর ভোটযুদ্ধের বদলে অনিশ্চয়তায় ভরা একতরফা নির্বাচনের পর্দা উন্মোচিত হবে যা কারও কাম্য নয়।।