Home » রাজনীতি » সহি ক্ষমতা হস্তান্তর নামা

সহি ক্ষমতা হস্তান্তর নামা

আবীর হাসান

songlapএই কথা এখন বাংলাদেশে রাষ্ট্র হয়েছে যে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। আগের আমলের মতো ‘এলান কিয়া যায়ে…’ বলে ঘোষণা দেয়া হয়নি। কিংবা তারও আগের আমলের মতো হাটে বাজারে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে (ঢোল বাজিয়ে) ঘোষণা দেয়া হয়নি। দেশের ‘সর্বময়’ ক্ষমতার অধিকারী বলেছেন, ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন বাগিয়ে সেই বাণী রেকর্ড করা হয়েছে এবং তা যথানিয়মে সম্প্রচার করা হয়েছে।

সর্বময়কর্তা আরও বলেছেন যে, ‘ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণ হবে’। মারামারি কাটাকাটি কে চায়? তাই ‘শান্তিপূর্ণ’ শব্দটি অমিয় বাণী হিসেবেই বর্ষিত হয়েছে। তবে শুধু একটু খেদ রয়ে গেছে পরের ঘটনা আগে এসে গেছে কিনা সেই প্রশ্নে। কারণ সবাই জানে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে নির্বাচন হতে হবে। আর সেই নির্বাচন নিয়ে জটিলতা এখনো কাটেনি। ‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচন’, ‘সবার জন্য সমান সুযোগ’ এসব কথা ক্রমাগত জোরালো হয়ে উঠছে। দেশে উঠছে, বিদেশে উঠছে, জাতিসংঘে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

নির্বাচন নিয়ে অবিশ্বাস অনিশ্চয়তা, পরবর্তীতে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টিকে তাই নতুন করে দেখতে হবে। জটিল এবং ভারি বিষয়টাকে সরিয়ে বা পেরিয়ে তো যেতে হবে হালকা না স্নিগ্ধ একটি বিষয়ের দিকে। এখন ব্যাপারটা এমন একটা জায়গায় এসে আটকে গেছে যে মনে হচ্ছে ক্ষমতা হস্তান্তর ধরনের পরিণতির দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়াটাই শুরু হয়নি।

কেউ কেউ বলেন – ‘হতে পারেনি ক্ষমতাসীনদের সংবিধানকে জড়িয়ে গোঁ ধরে বসে থাকার জন্য’। কিন্তু এটাকে এক সময় অনেকে উল্টো দিক থেকেও দেখেছিলেন, তাদের ভাষ্য ছিল, ‘গোঁ ধরেছে’ বিরোধী দল এবং তারা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক যে নিয়ম : আগের সরকারের প্রধানকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান মেনে নির্বাচনে যেতে চাইছে না। কিন্তু ক্রমে ক্রমে প্রকাশ হয়ে গেল সব কিছু ক্ষমতাসীনরাই বললেন, সংবিধানে যে সংশোধনী (পঞ্চদশ) তারা এনেছেন, তার ভিত্তিতেই তারা নির্বাচন করতে চান। আরও খোলাসা করেও তারা বলেছেন যে, ‘সংসদও বহাল থাকবে মন্ত্রিসভাও থাকবে।’ যদি নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক নিয়মের ব্যতিক্রম বলে ধরা হয়ে থাকে তাহলে তো এই ব্যবস্থাটা অর্থাৎ ‘সংসদও থাকবে মন্ত্রিসভাও থাকবে’ এই নিয়মটাও তো স্বাভাবিক নয় আরও ব্যতিক্রমীই। এই ব্যতিক্রমের ব্যতিক্রম নিয়ে প্রথমে নির্বাচন তারপর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হবে কেমন করে?

দিল্লি দূর অস্তএর মতো একটা বিষয়ই হয়ে গেছে এখন নির্বাচন। ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত একটা সীমা দেয়া হয়েছে কিন্তু ওই সীমা থাকলেই কি আর না থাকলেই কি? ওই সময়টায় কার নেতৃত্বে কোন ধরনের সরকার থাকবে সেটাই বড় কথা। এই সরকার যে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে তা বিরোধী দলীয় নেতারা যেমন বলছেন, তেমনি সাধারণ মানুষও বলছেন। কারণ ঘটনাগুলো তো দূর অতীতের নয়। আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করে নিয়েছিল। সেই সুবাদেই তারা এখন ক্ষমতায়। আর মাত্র দু’বছর আগে ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন কমিটির সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকবে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিন নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে।’ কমিটিতে অন্য যে সদস্যরা ছিলেন তারাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষেই ছিলেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে বলা হয়েছিল, ‘আগামী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। তবে এতে বিচার বিভাগের কাউকে সম্পৃক্ত রাখা সমীচীন হবে না।’

এখন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার দলীয় লোকজন যেভাবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দোহাই দিয়ে তাদের তৈরি নতুন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলছেন তা আসলে একেবারেই ঠিক নয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রথম অংশটি ধরে নিয়েই নিজেদের সুবিধা মতো বিধান করেছে। সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। ফলে মন্ত্রী এমপিরা স্বপদে বহাল থেকেই নির্বাচন করতে পারবেন। সরকারের কুশীলরবরা এখনো ‘আন্তর্জাতিক মানের’ কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের কথা বললেন প্রকাশ্যে নয় সচিব সভায় এটাই বা কেমন হলো? সংসদে বা অন্তত দলীয় কোন সভাতেও তো ঘোষণাটা হতে পারতো। এটাই ছিল প্রত্যাশিত।

এখানে আরো কিছু বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠানই যে গোল বেধেছে তা নয়। সমস্যাটা তত্ত্বাবধায়ক কি তত্ত্বাবধায়ক নয় বা নির্দলীয় কি নির্দলীয় নয় এটুকু পর্যন্তও নয়। সমস্যাটি আরো গভীরে। ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়েও সমস্যা দেখা দিয়েছে খোদ সংবিধানেই। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে কাটাছেড়া এমনভাবে হয়েছে যে, সমস্যা রেখে দেয়া হয়েছে নানা স্থানে। নির্বাচনটি কবে হবে এমন প্রশ্নটিও রয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ১২৩ () () () অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং () মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সচিবদের সভায় বলেছেন, ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থানই নিচ্ছে না নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে। ১২৩ () () অনুযায়ী যদি নির্বাচন হয় তাহলে সময় তো হাতে নেই। কিন্তু নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত তিনশ আসনের নির্বাচনে এমন কোন আলামত নেই। তাহলে সংবিধানের ১২৩ () অনুচ্ছেদ নিয়েও নানা ধরনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ফাঁকঝোঁক থেকে যাচ্ছে। () অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে আবার () অনুযায়ী মেয়াদ অবসান ব্যতিত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংসদটি ভেঙে যাচ্ছে কিভাবে? স্বাভাবিক নিয়মে না মেয়াদ অবসান ব্যতিত অন্য কোনো কারণে? নির্বাচনটি কবে হবে তা নিয়ে অস্পষ্টতার কারণে এখন নির্বাচন অনুষ্ঠানটি নিয়েই জনমনে নানান সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশনের উচিত যথাশিগগির নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দেয়া। অবশ্য খোদ নির্বাচন কমিশনটি নিয়েই তো বিরোধী দলের ঘোর আপত্তি। আর আপত্তি থাকারই কথা। এমন নির্বাচন কমিশন আগে কি কখনো দেখা গেছে। আজ একথা কাল ও কথা বলে তারা সময় পার করছে। এমন নির্বাচন কমিশন দিয়ে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানও কি সম্ভব?

নির্বাচন হলেও বর্তমান সংসদের মেয়াদ কতোদিন থাকবে এবং নতুন সংসদ কবে থেকে কার্যক্রম শুরু করবে এ নিয়েও আছে নানা সাংবিধানিক জটিলতা। এতদিন ধরে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান ছিল। আর সংসদ ভেঙে যাবার পরে অটোমেটিক সংসদ সদস্যরাও আর তাদের পদে বহাল থাকবেন না। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর পরে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়েও জটিলতা দেখা দিতে পারে।

এমনটা যদি পরিস্থিতি হয় তাহলে কি পঞ্চদশ সংশোধনী এনে আসলেই নতুন একটি সংবিধান আমাদের উপহার দেয়া হয়েছে? আর এই সংবিধান দিয়ে তাহলে ক্ষমতা হস্তান্তরটি হবে কিভাবে এবং কবে? এটা কি হবে ডান হাত থেকে বাম হাত বা বাম হাত থেকে ডান হাতে? অথবা নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও ‘অনির্দিষ্টকাল’ পরে? পুরো বিষয়টিই গোলমেলে এবং জটিলতায় পূর্ণ।।