Home » বিশেষ নিবন্ধ » ৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৮)

৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৮)

৬ দফা এবং গণঅভ্যুত্থানের সূচনা

আনু মুহাম্মদ

60'S১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধের সময় এটা স্পষ্ট হয় যে, পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার ব্যাপারে পশ্চিম কেন্দ্র্রিক নেতৃত্বের কোন মাথাব্যথা নেই। সামরিক বাহিনীর বাঙালী সৈনিক ও অফিসাররাও পশ্চিম ফ্রন্টেই নিয়োজিত হন। পূর্ব পাকিস্তানে এই বিষয়টি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ১৯৬৫ সালের ৫ জুন ন্যাপ তার ১৪ দফা প্রকাশ করে। ১৯৬৬ সালের ফ্রেব্রুয়ারীতে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা উত্থাপন করেন। এই ৬ দফায় আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসন ও স্বায়ত্তশাসনসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য একটি সামগ্রিক কর্মসূচি উপস্থাপিত হয়। যে কর্মসূচি নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক মহলসহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ৭ জুন সারা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ও আদমজী, সিদ্ধিরগঞ্জ ও ডেমরায় ১৪৪ ধারা ভেঙে শ্রমিক সমাবেশ হয়। পুলিশের গুলিতে সেদিন নিহত হন ১০ জন।

৬ দফার কর্মসূচির সারকথা ছিল নিম্নরূপ:

প্রস্তাব নং ১ শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রকৃতি

দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং এর ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারী ধরনের। আইন পরিষদের (Legislature) ক্ষমতা হবে সার্বভৌম এবং এই পরিষদও নির্বাচিত হবে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারণের সরাসরি ভোটে।

প্রস্তাব নং ২ কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা

কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অংগ রাষ্টগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরংকুশ।

প্রস্তাব নং ৩ মুদ্রা বা আর্থ সম্বন্ধীয় ক্ষমতা

মুদ্রার ব্যাপারে নিুলিখিত দুটির যে কোন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারে – () সমগ্র দেশের জন্যে দুটি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে, () বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্যে কেবলমাত্র একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসু ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভের পত্তন ও অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।

প্রস্তাব নং ৪ রাজস্ব, কর বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা

ফেডারেশনের অংগ রাষ্ট্রগুলির কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অংগ রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অংগ রাষ্ট্রগুলির সব রকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।

প্রস্তাব নং ৫ বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা

() ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের বহির্বাণিজ্যের পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।

() বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অংগ রাষ্ট্রগুলির এক্তিয়ারধীন থাকবে।

() কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোন হারে অংগ রাষ্ট্রগুলিই মিটাবে।

() অংগ রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্যাদি চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা কর জাতীয় কোন বাধা নিষেধ থাকবে না।

() শাসনতন্ত্রে অংগ রাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং স্ব স্বার্থে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।

প্রস্তাব নং ৬ আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা

আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অংগ রাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।

পাকিস্তান সরকার ও ডানপন্থীরা ৬ দফা কর্মসূচীকে দেখেন পাকিস্তান ভাঙার দলিল হিসেবে আর বামপন্থীদের একটি অংশ এই কর্মসূচিকে দেখেন কৃষক শ্রমিক আন্দোলন বিকাশের মুখে ভীত সাম্রাজ্যবাদের কূটকৌশল হিসেবে। তবে এসব মতামত জনগণকে প্রভাবিত করতে পেরেছে খুব কমই। অল্পদিনেই এই ৬ দফাই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়। সেসময় প্রচারিত ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ পোস্টার এবং ‘বাঙালীর বাঁচার দাবি ৬ দফা’ শীর্ষক শেখ মুজিবুর রহমানের পুস্তিকা বাংলাদেশের শহর বন্দর গ্রামগঞ্জ সর্বত্র ব্যাপক ভাবে প্রচারিত এবং সমর্থিত হয়। এসব বিষয় পরিণত হয় জনগণের মুখের বুলিতে।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য, শেখ মুজিবসহ বিভিন্ন নেতা সংগঠক বাঙালী সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বেতার টিভিতে রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা, হত্যা দমন পীড়ন নির্যাতন সহ আইয়ুব খানের দশ বছরের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণজাগরণের সৃষ্টি হতে থাকে ১৯৬৮ সালের শেষ দিক থেকে। শেখ মুজিব জেলে থাকা অবস্থায় এই আন্দোলনকে তীব্র পর্যায়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মওলানা ভাসানী। ৮ ডিসেম্বর মওলানা ভাসানীর ডাকা হরতালের মধ্য দিয়ে, বলা যায়, গণঅভ্যুত্থান পর্বের শক্তিবিস্তার ঘটতে শুরু করে। শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ পুরো আন্দোলনকে দ্রুত জঙ্গী করে তোলে। গ্রামাঞ্চলে মৌলিক গণতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে, গরুচোর ও থানা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিক্ষোভ দ্রুত ছড়াতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে গণআদালত গঠন করে গণশত্রুদের শায়েস্তা শুরুহয়। শ্রমিক এবং কৃষকদের সংগঠিত করায় বিপ্লবী সংগঠন ও কর্মীদের ভূমিকা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বলাই বাহুল্য।।

(চলবে)