Home » বিশেষ নিবন্ধ » আইনশৃঙ্খলা – এ কোন দেশে বসবাস

আইনশৃঙ্খলা – এ কোন দেশে বসবাস

আবীর হাসান

disappearenceগত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার দুই থানার পুলিশ উদ্ধার করেছে একটি লাশ। হাত পেটসহ নিচের অংশ উদ্ধার করেছে হাজারিবাগ থানা আর বুকের অংশ উদ্ধার করেছে কেরানীগঞ্জ থানা। মাথার কোন হদিস নেই। দুই থানার পুলিশ আবার মিলিয়েও দেখেছে তাতে তাদের মনে হয়েছে টুকরোগুলো একই ব্যক্তির লাশের অংশ। শিউরে ওঠার মতো ঘটনা। অন্যদেশ হলে তোলপাড় হতো কিন্তু এদেশে কোন কোন পত্রিকার ভেতরের পাতায় এক কলাম আড়াই ইঞ্চি খবর হয়েছে মাত্র। তাও হতো না দুই থানা মিলে এক লাশ উদ্ধার না করলে।

খুন হচ্ছে, প্রতিদিন হচ্ছে, দিনের গড় দাঁড়িয়েছে ১২ জন করে। গত বছরের গড় ছিল ১১ জন। এ পরিসংখ্যান কোন বেসরকারি সংস্থার নয়, সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১২ সালের যে হিসাব দিয়েছিলেন তার ভিত্তিতে এই গড়। সে সময় তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে দাবি করে বলেছিলেন ৪ হাজার ১১২টি খুন হয়েছিল ২০১২ সালে।

হয়তো তাদের কাছে এটা ‘মাত্রের ব্যাপার।’ দিনে ১১/১২। ওতে কী আসে যায়? ওনারা টালি করেন আগের বছরের সঙ্গে কিংবা আগের সরকারের আমলের সঙ্গে। ঘটনা প্রবাহ যতোটা ভয়াবহতা তুলে ধরে পরিসংখ্যান আসলে তা করে না বরং বাস্তবতার রূঢ়তাকে অনেক খাটো, অনেক হালকা করে দেয়। আর ক্ষমতাসীনরা এবং তাদের অধীনে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দাবিতে থাকা সংস্থাগুলোর কর্তারা সে সুযোগটাই নেন। হিসেব দিয়েও দাবি করেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। যেমন এক বছরের পরিসংখ্যান বলছে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত খুন হয়েছে ২৯০৬ জন। আর গত জুলাই মাসে ৩১২ জন এবং আগস্ট মাসে ৩৩২ জন। আবার এই পরিসংখ্যানের মধ্যে ঢুকতে পারেননি যাদের মৃত্যু হয়েছে রহস্যজনকভাবে রক্তারক্তি ছাড়া অন্যান্য অস্বাভাবিক কায়দার কিংবা মামলা হিসাবে যাদের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়নি।

খুন ছাড়াও অস্ত্র ব্যবহার হয় এমন অপরাধও ঘটছে অনেক। এ বছর জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ডাকাতি নথিভুক্ত হয়েছে ৭৮৮টি। এটা একটা মজার ব্যাপার, ডাকাতির ঘটনা ডাকাতি হিসেবে নথিভুক্ত করানোটাই কঠিন ব্যাপার। কারণ পুলিশ মনে করে ডাকাতি তাদের জন্য মানহানিকর। কাজেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের ঘটনাকে চুরি হিসাবে দেখানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ওই চোররাও যে আজকাল অস্ত্র ব্যবহার করছে এবং খুন খারাবি করছে। তারপরও ৭৮৮টি ডাকাতির নথিভুক্ত ঘটনা কিন্তু ভয়াবহ ব্যাপারই।

এরপর সশস্ত্র আর একটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে ছিনতাই। রাজধানীতে এখন প্রতিদিন গড়ে ২০১টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এই সব অঘটনের বিপরীতে অপরাধী ধরা পড়ছে ক’জন? যারা বলছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে তারা স্বাভাবিকের কোন মডেল ফলো করছেন? অস্ত্রধারীদের পালিয়ে বেড়ানোর স্বাভাবিকতার? অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা কোথায় যায়। এ প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রামপুরায় নিজের বাড়িতে খুন হয়েছিলেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ফজলুল করিম খান। গুলি করে তাকে হত্যা করেছিল সন্ত্রাসীরা। তারপর তারা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল! ১৩ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ীতে রাত দেড়টায় বাড়িতে ঢুকে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা বাবা মায়ের সামনে খুন করে গেল এ লেভেল পড়–য়া ছেলে বখতিয়ার লতিফকে। এক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত কোন গ্রেফতার নেই, অস্ত্র উদ্ধার নেই। এর আগে ২৯ জুলাই মধ্যরাতে গুলশানের সপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে ফিল্মি স্টাইলে খুন করা হয়েছিল যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে। তারপর অনেক নাটকীয় ঘটনা ঘটলো। কিন্তু হুকুমের আসামি বাতাসের সঙ্গে মিশে গেছে। ২১ আগস্ট ২৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মোক্তারকে হত্যা করা হয়। কিন্তু আসামিদের ক’জন ধরা পড়েছে, অস্ত্র উদ্ধারই বা কোথায়? ৩০০শ’র বেশি সশস্ত্র সন্ত্রাসী এখন জনারন্যে মিশে আছে আর পুলিশের ভাব গা ছাড়া। তাদের বক্তব্য : রাজনীতিক সহিংসতা প্রতিরোধে সদা ব্যস্ত তারা। অন্য অপরাধী ধরা বা অস্ত্র উদ্ধারের সময় নেই তাদের। এটা একটা যুক্তি বটে। কারণ ভীত ব্যক্তি ও তার পরিবারের নিরাপত্তা বিধানই তাদের প্রধান দায়িত্ব। কারণ তিনি যে ক্ষমতার শীর্ষ থেকে নামতে চান না যে কোন পরিস্থিতিতে।

যে দেশের সরকারের প্রধান নির্বাহী বলতে পারেন কারোর বেডরুম পাহারা দেয়ার দায়িত্ব নিতে পারবেন না তার অধীনের পুলিশ অপরাধী ধরার বা অস্ত্র উদ্ধারে এগোবে না এতো স্বাভাবিক। কাজেই দুর্বৃত্তের সংখ্যা বাড়বে অস্ত্রের চালান আসবে, বেচাকেনা বাড়বে, ইয়াবার মতো মাদকে ছেয়ে যাবে দেশ এ আর বিচিত্র কি? হোক না পত্রিকায় লেখালেখি, টেলিভিশন টকশো’র সমালোচনা কিংবা বিশেষ সংবাদ তাতে এখন এদেশের সরকারের কারোর কিছু যায় আসে না।

তার ওপর গত রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রী পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে। কাজেই এখন দুর্বৃত্তরা বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে মানুষ মারুক কিংবা লাশ টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলুক কিংবা বস্তাবন্দী করে ডাস্টবিনে ফেলে দিক অথবা নদীতে ভাসিয়ে দিক তাতে কারোর কিছু যাবে আসবে না।

কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বা তা কর্মকর্তাদের বিবেক জাগ্রত করার চেষ্টা করছেন দেশপ্রেম ও দায়িত্ব বোধের কথা তুলে ধরে কিন্তু দুর্নীতি আর দুষ্ট চক্রের পাকচক্রে পড়ে যাওয়া বাহিনীগুলোকে যখন জনদায়িত্ব থেকে সরিয়ে ব্যক্তিদায়িত্বে নিয়োজিত করা হয় তাহলে কি তারা আর স্বাভাবিক নিয়মের দায়িত্ব পালন করতে পারে?

কাজেই এখন থেকে আরও ‘পরিসংখ্যানের উন্নতির’ অপেক্ষাতেই থাকতে হবে। প্রতিদিনের গড় খুন ১২ থেকে ১৩ বা ১৪ এ উন্নীত হলেও তো এই কথাই শুনতে হবে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে আছে!

বিচিত্র! ভয়াবহ!! এমনকি অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী শাসনামলের চেয়ে খারাপ! এসব বললেও তো টনক নড়বে না কারোর। কারণ সেই সব আমলের পদলেহীরাই তো এখনো বসে আছে দন্তমুন্ডের অধিকর্তা হয়ে সেই সব আমলের অলিখিত বিধিবিধান জনগণকে মানানোর জন্য।।