Home » শিল্প-সংস্কৃতি » আনোয়ার হোসেন – একটি প্রতিনিধিত্বকারী যুগের অবসান

আনোয়ার হোসেন – একটি প্রতিনিধিত্বকারী যুগের অবসান

ফ্লোরা সরকার

anwar hossainআমাদের দেশে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত নাগরিকদের মাঝে নিম্নবর্গের পেশাজীবীদের পরেই সব থেকে যারা নিগৃহীত ও অবহেলিত তারা হলেন শিল্প ও সংস্কৃতিতে নিয়োজিত বিভিন্ন শিল্পী কলাকুশলীবৃন্দ। তাদের বর্ণময়,কর্মময় জীবনের আনন্দ উচ্ছাসটুকু দর্শক শ্রোতরা নিঃশেষে শুষে নেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে চলে গেলেই তাদের মূল্য মূল্যহীন হয়ে পড়ে। একজন কায়িক শ্রমিকের সঙ্গে একজন শিল্পী বিশেষত অভিনয় শিল্পীর শ্রমের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। বরং বলা চলে একজন কায়িক শ্রমিকের চাইতে একজন অভিনয় শিল্পীর পরিশ্রম তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। কেননা, একজন অভিনয় শিল্পীকে শুধু কায়িক শ্রম দিলেই চলেনা, একইসঙ্গে মানসিক শ্রমও ব্যয় করতে হয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী অথবা বেসরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা যে নির্দিষ্ট পেনশান ভোগ করেন, শিল্প ও সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ সেটা থেকেও বঞ্চিত। এসব বঞ্চনার কথা ছেড়ে দিয়েও দেখা যায় একজন শিল্পীর সারাজীবনের সেই কঠোর শ্রমের কোন মর্যাদা বা সম্মান আজও আমরা দেই না বা দিতে শিখিনি। সুদিনে তাদের পিঠ চাপড়ালেও দুর্দিনে পিঠ ফিরিয়ে নেই। আমাদের চোখের সামনেই বিনা চিকিৎসায়, অর্ধাহারে, করুণ পরিণতি নিয়ে তাদের বিদায় হতে হয়। মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে এসে যখন তারা উপস্থিত হন, তখন কেউ কেউ নিছক করুণা বশে এবং অধিকাংশ মিডিয়ায় প্রচারের উদ্দেশ্যে সেই মৃত্যু পথযাত্রী শিল্পীকে অনুদান দিতে এগিয়ে আসেন। ঠিক এই রকমই একটি ঘটনা ঘটতে দেখা গিয়েছে অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে। তিনি অসুস্থ হবার পর কিছু শিল্পী (তাদের নাম উল্লেখ করা হলো না, তাদের সম্মান রক্ষার্থে) মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকার একটি চেক প্রদানের জন্যে পারলে পঞ্চাশটা ক্যামেরা সঙ্গে নিয়ে যান। অর্থাৎ টাকার অংকের চেয়ে প্রচারের অংকটা যেন শতগুণ অধিক হয়। যেদিন চেকটি প্রদান করা হয় সেদিন টিভি পর্দায় লক্ষ্য করেছিলাম এই প্রথম অভিনেতা হয়েও অভিনেতা আনোয়ার হোসেন ক্যামেরার সামনে সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছেন। যে ক্যামেরার সামনে ১৯৬১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত, পঁয়তাল্লিশটা বছর বীরদর্পে উপস্থিত হয়েছেন, আজ সেই ক্যামেরাকেই যেন ভয় করছেন। অথচ এই আনোয়ার হোসেন চলচ্চিত্রের পর্দায় শুধু একজন শক্তিমান ও প্রতিভাধর অভিনেতা নন, নন শুধু বাংলার শেষ নবাব নবাব সিরাজউদ্দৌলার আইকন, তিনি আমাদের বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একটি বিশেষ যুগকে প্রতিনিধিত্ব করেন।

আনোয়ার হোসেনের এই প্রতিনিধিত্ব তিন দিক থেকে পাওয়া যায়। প্রথমতঃ বাংলা চলচ্চিত্রের ঊন্মেষলগ্নের যুগকে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৬১ সালে মহিউদ্দীন পরিচালিত “তোমার আমার” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার প্রথম আগমন ঘটে, যখন চলচ্চিত্রের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। এটা সেই সময় যখন চলচ্চিত্রে অভিনয় করার মতো অভিনেতা অভিনেত্রীদের সংখ্যা একেবারেই বিরল। সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট চলচ্চিত্র শিল্পের মতো বৃহদায়তন শিল্প গড়ে ওঠার প্রস্তুতভূমি সবেমাত্র গড়ে উঠছে। এফ.ডি.সি. বা চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা গঠিত হয়ে চলচ্চিত্রের কাজ একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে। দ্বিতীয়তঃ বাংলা ভাষা বিশেষত চলচ্চিত্রে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত করার যুগকে আনোয়ার হোসেন প্রতিনিধিত্ব করেন। যে সময়ে তার চলচ্চিত্রে আগমন সেই সময়ে এই দেশে উর্দু এবং হিন্দী ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। সেই একচ্ছত্র দাপটের মাঝে বাংলা ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা একদিকে যেমন প্রতিকুল, প্রতিযোগিতাময় ছিলো, অন্যদিকে ছিলো তেমনি কঠোর সংগ্রামী একটি প্রচেষ্টা। তারপরেও দেখা গেছে এই ষাটের দশকই বাংলা চলচ্চিত্রের সেই যুগ যা ‘সোনালী যুগ’ নামে পরিচিত। এই সময়ে একাধারে বাংলা চলচ্চিত্র পরিমাণগত এবং গুণগত ভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছিলো। তৃতীয়তঃ তিনি এই দেশের প্রতিবাদ প্রতিরোধের যুগকেও প্রতিনিধিত্ব করেন। ছাত্র আন্দোলন, এগারদফা আন্দোলন, ছয়দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভূথ্যান সহ বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে এ দেশের মধ্যবিত্ত বাঙ্গালি মুসলমান শ্রেণী তাদের সাজাত্যবোধ, অধিকারবোধ আর ইতিহাসের পুণর্মূল্যায়নের সংগ্রামে একত্রিত হচ্ছিলো। চলচ্চিত্রও সেই সংগ্রাম থেকে পিছিয়ে থাকেনি। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছিলো তারই একটি অংশ। যে নবাব আঠার শতকের নবাব নয় আধুনিক নবাবকে খুঁজে বেরিয়েছে। এই সময়টিতে নির্মিত হয় নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছাড়াও শহীদ তীতুমীর, জীবন থেকে নেয়ান মতো ছবি। যেসব ছবি উল্লেখিত আন্দোলনগুলোকে আরো বেগবান করতে সহায়তা প্রদান করে। কাজেই অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের প্রয়াণ শুধুমাত্র একজন অভিনেতার প্রয়াণ নয়, একটি যুগের অবসান। আর তাই এই মহীয়ান অভিনেতার অভিনয় একং অভিনীত কিছু ছবি নিয়ে আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয়।

সোফিয়া লোরেন তার আত্মজীবনীতে পরিচালক ডি সিকার একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরেন – “অভিনয় করবে সমস্ত শরীর দিয়ে। শরীরের প্রতিটি অংশ একত্রে অভিনয়ে মেতে উঠবে। তোমার দেহ, পায়ের পাতা, আঙ্গুলগুলো তোমার মুখ ও কন্ঠের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিনয় করবে”। অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের মাঝে ঠিক এই গুণগুলো আমরা দেখতে পাই। জহির রায়হান পরিচালিত “কাঁচের দেয়াল” (১৯৬৩) ছবিতে আমরা যেমন একজন প্রেমিক আনোয়ার হোসেনকে পাই, খান আতাউর রহমান পরিচালিত “নবাব সিরাজউদ্দৌলা” (১৯৬৭) ছবিতে পাই একজন দৃঢ়চিত্ত, প্রতিবাদী, আপোষহীন, দেশপ্রেমিক নবাবকে। প্রেমিক আনোয়ার আর নবাব আনোয়ারের চলাফেরা, কথা বলা, তাকানো সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুধু বাইরের প্রকাশ ভঙ্গীই নয় তিনি জানতেন অভিনেতার কণ্ঠস্বরের কারুকাজ কী করে বুনতে হয়। প্রেমিক আনোয়ারের কণ্ঠস্বর যতটা মোলায়েম ঠিক ততটাই কঠোর নবাব আনোয়ারের। শুধু তাই নয়, কণ্ঠস্বর ভাঙ্গনের রীতি তিনি যেন গণিতের মতো প্রকাশ করতেন। কোথায় কণ্ঠস্বর ভেঙ্গে চুরমার করতে হবে, কোথায় উচ্ছাসের উচ্ছলতা প্রকাশ পাবে, কোথায় ধীর স্থির থাকবে সব যেনো মেপে বলতেন। আর তাই নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুক্তি পাবার পর এবং তারও পরে অনেক সংলাপ মানুষের মুখে মুখে মুখস্তশোনা যেত। অভিনেতা আনোয়ার হোসেন জানতেন কীভাবে চরিত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হয়। তার যে কোন ছবিতে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চরিত্রের এই ধারাবাহিকতা আমরা লক্ষ্য করি, যা একজন দক্ষ অভিনেতার অবশ্যম্ভাবী একটি গুণ। এমনকি চরিত্রের মেটামোরফসিসের ক্ষেত্রেও তার অনন্যতা দেখা যায়। “লাঠিয়াল” এবং “পালঙ্ক” দুটি ছবিতেই চরিত্রের এই মেটামোরফসিস বা রূপান্তর অত্যন্ত চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে। অভিনয়কে বিজ্ঞানের সঙ্গে এই কারণেই তুলনা করা হয় যে অভিনয়ের সময় আবেগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবেগে আপ্লুত ভাব, দর্শককে ধাঁধায় ফেলে দিতে পারে কিন্তু তা কখনো অভিনয় হয়না। অভিনেতা আনোয়ার হোসেন জানতেন আবেগের পরিমিতবোধের রহস্য। তাই তার অভিনয় আবেগ দ্বারা কখনো নিয়ন্ত্রিত হয়নি বরং আবেগকেই তার নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। ওবায়দুল হক পরিচালিত “দুই দিগন্ত” (১৯৬৪) এবং আমজাদ হোসেন পরিচালিত “গোলাপী এখন ট্রেনে” (১৯৭৮) ছবি দুটি দুই ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের চিত্র। প্রথমটি শহুরে সামন্ততন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু চিত্র, দ্বিতীয়টি গ্রামীণ। দুই দিগন্তের আনোয়ার, সৎ, চরিত্রবান এবং আপোষহীন যুবক। গোলাপী’র আনোয়ার গ্রামের সহজ সরল বয়স্ক কবিয়াল। গান গেয়ে বেড়ানোই যার কাজ। দুই দিগন্তের আনোয়ারকে কখনোই তার অফিসের বড়কর্তার সামনে হাসতে দেখা যায়না, কিন্তু বিয়ে যোগ্য কন্যার পিতা গোলাপী’র আনোয়ার গ্রামের মোড়লের সামনে বিনয়ে ছোট হয়ে যান, তাই বেশির ভাগ সময় হেসে কথা বলেন। গোলাপী’র আনোয়ারের সরলতা আর আর্থিক অবস্থান তাকে হাসতে বাধ্য করে। আজিজ ও আজহার পরিচালিত “চোখের জলে” ছবিতে দেখি একজন অসহায় পিতা হিসেবে, যে তার আর্থিক অসঙ্গতির কারণে স্ত্রীপুত্রকন্যাকে নিয়ে শহরে বাস করতে পারেননা। কিন্তু ভিন্ন চেহারায় দেখি জহির রায়হান পরিচালিত “জীবন থেকে নেয়া” এবং আবদুস সামাদ পরিচালিত “সূর্য সংগ্রাম” (১৯৭৯) ছবিতে। জীবন থেকে নেয়ার আনোয়ার একজন শহরের মধ্যবিত্ত বিপ্লবী, দেশের মাটি ছাড়া যার জীবনে আর কোন স্বপ্ন নেই। সূর্য সংগ্রামের আনোয়ার গ্রামের বিপ্লবী যুবক। যে যুবক চে গুয়েভারার মতো শোষণমুক্ত সমাজের জন্যে সংগ্রাম করে। নারায়ন ঘোষ মিতা পরিচালিত “লাঠিয়াল” ছবিতে ভিন্ন এক আনোয়ারকে পাই। যে আনোয়ার গ্রামের লাঠিয়াল নেতা মোতালেব (ওবায়দুল হক সরকার) ব্যবহৃত হলেও তার ভেতর কোন অনুশোচনা হয়না। কেননা, সে তার মনিব মোতালেবের বেতনভোগী কর্মচারী। যদিও ছবির শেষে তার মেটামোরফসিস ঘটে, যে রূপান্তর চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তোলেন। তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক চরিত্রে দেখা যায় রাজেন তরফদার পরিচালিত “পালঙ্ক” ছবিতে। পালঙ্ক ছবির সময়কাল পাকিস্তান স্বাধীন হবার ঠিক পরবর্তী সময়। ভাষা আন্দোলন তখনও সংঘটিত হয়নি। পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের ভারত গমন প্রক্রিয়া তখনও চলছে। গ্রামের অবস্থাপন্ন হিন্দু বৃদ্ধ ধলা কর্তার (উৎপল দত্ত) পালঙ্ক নিয়ে গ্রামের গরীব মাঝি মকবুল (আনোয়ার হোসেন) এর মাঝে দ্বন্দ্বের উদ্ভবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ছবির কাহিনী। কোন এক আবেগের মুহূর্ত্তে ধলা কর্তা তাকে তার বহুদিনের স্মৃতি বিজড়িত পালঙ্কটি মকবুলের কাছে বিক্রি করে দেয়। তারপর আবার সেই পালঙ্ক ফেরত চাইলে মকবুল আর ফেরত দিতে চায়না। মকবুলকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। এমনকি তাকে একঘরে করা হয়। অর্থের অভাবে ক্রমশ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হতে থাকা মকবুল ভাঙ্গে কিন্তু মচকায় না, পালঙ্ক সে হাতছাড়া করেনা। পালঙ্ক মূলত মাতৃভূমির প্রতীকী হয়ে ছবিতে চিত্রায়িত। দৃঢ়চিত্ত মাঝি চরিত্রের মকবুলকে মুহূর্ত্তের জন্যেও আনোয়ার হোসেন মনে হয় না। মনে হয় বাংলাদেশের কোন গ্রামের পরিচিত মকবুলকে দেখছি, যে মকবুলেরা প্রাণ দিয়ে হলেও নিজ মাতৃভূমি রক্ষা করে। ছবিটি প্রসঙ্গে একুশে টিভিতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা আনোয়ার হোসেন জানিয়েছিলেন কোলকাতায় ছবিটি দেখার পর পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাকে অনেকক্ষণ বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। তারপর আনোয়ার হোসেন যখন দেশে ফেরত আসেন তখন তাকে কেউ বলেছিলেন, তার আর ছবি করার প্রয়োজন নেই। কারণ সত্যজিৎ রায়ের রায় পেয়ে গেছেন। উত্তরে আনোয়ার হোসেন বললেন “যে যা ই রায় দিক। ছবি আমাকে করে যেতে হবে”। এমনই মনেপ্রাণে একজন অভিনেতা ছিলেন অভিনেতা আনোয়ার হোসেন। চার্লি চ্যাপলিন যেমন বলেছিলেন – “অভিনয়ের সামগ্রিক আবেদন হৃদয়ের দিকে, বুদ্ধিদীপ্তির স্থান সেখানে গৌণ”।

অভিনেতাদের সম্পর্কে উৎপল দত্ত তার গদ্যসমগ্রে (নাট্যচিন্তা) বেশ চমকৎকার কিছু কথা বলেছেন – “দাম্ভিক মানুষ অভিনেত্ইা হতে পারে না। অভিনয়ের প্রাকশর্ত হচ্ছে নিজ সত্তা বিলোপ। নিজেকে ভুলে নাটকের চরিত্র হতে হবে। দাম্ভিক মানুষ নিজেকে ভুলতে পারেনা। যত রিহার্সলই দিক না কেন, নিজের অজান্তে সে নিজেকে চরিত্রটির ওপর আরোপ করবে, নিজের ওপর চরিত্র আরোপ করবে না। – – – দাম্ভিক মানুষের কাছে নাট্যকারের উদ্দেশ্য মূল্যহীন, গোটা নাটকটার বক্তব্য গুরুত্বহীন, তার কাছে নাটক হচ্ছে নিজেকে জাহির করার একটা বাহনমাত্র”। নিভৃতচারী আনোয়ার হোসেন কোনদিন এই ‘জাহির’ বা ‘শোঅফ’ নামক শব্দের ধারে কাছে ভিড়েননি। নিজ সত্তা বিলোপ করে নিজের ওপর চরিত্র আরোপ করেছিলেন বলেই দুই দিগন্তের সৎ আপোষহীন যুবক হিসেবে, কাঁচের দেয়ালের মিস্টি প্রেমিক হিসেবে, জীবন থেকে নেয়ার বিপ্লবী যুবক হিসেবে, পালঙ্কের এক দৃঢ়চিত্ত মাঝি হিসেবে বা নবাব সিরাজউদ্দৌলার নবাব হিসেবে আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকবেন। এমনকি কোন ছবির চরিত্রের সঙ্গে অন্য ছবির চরিত্রের কোন সংঘাত কখনো ঘটেনি। মনে রাখা প্রয়োজন ষাট, সত্তর এবং আশির দশকের অভিনেতা আনোয়ার হোসেনকে প্রতিদিন তিন থেকে চারটা ছবির শুটিং একটানা করতে হতো। প্রায় পাঁচশটির মতো ছবিতে অভিনয় করেও প্রতিটি ছবির চরিত্রকে বিশিষ্ট করে রেখেছেন। যা এখন পর্যন্ত আমাদের দেশের কোন অভিনেতার দ্বারা সম্ভব হয়নি। উঁচু মাপের অভিনেতা বলে নিজেকে কখনো মনে করেননি বলেই তিনি উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। সাধারণের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন বলেই তিনি অসধারণ। তার বাস্তব চরিত্রের অসাধরণ একটি ছোট্ট স্মৃতিচারণ করে এই লেখা শেষ করবো। আনোয়ার হোসেন অভিনীত “চোখের জলে” ছবিতে তার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করি। ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসের একটি দিনে ছবির শুটিং শেষ করে সন্ধ্যার পর সাভার থেকে গাড়িতে সবাই একসঙ্গে ঢাকায় ফিরছি। আমি তখন বেশ ছোট। সেদিন মন খারাপ করে গাড়িতে বসেছিলাম। আনোয়ার হোসেন ঠিক লক্ষ্য করলেন বিষয়টা। জানতে চাইলেন মন খারাপ কেনো। গম্ভীর হয়ে নালিশের সুরে বললাম “আজ আমার জন্মদিন, আর আজকেও শুটিং রাখলো”। আনোয়ার হোসেন কোন কথা না বলে শুধু গাড়ি থামাতে বললেন। গাড়ি থেকে নেমে দুই সের মিস্টি (তখন সের হিসেবে মিস্টি বিক্রি হতো এবং বর্তমানের মতো কেক কেটে জন্মদিন পালিত হতোনা) কিনে আমাদের মতিঝিল কলোনীর বাসা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন হৈচৈ করতে করতে। খুব অবাক হয়েছিলাম সেদিন তার ব্যবহারে। আজ আর বিস্মিত হই না। কারণ মহান চরিত্রের মানুষেরা পর্দায় আর বাস্তবে মহানই থাকেন। এই মহান মানুষটির জন্যে রইলো স্বশ্রদ্ধ শ্রদ্ধা।।

১টি মন্তব্য

  1. “দাম্ভিক মানুষ অভিনেত্ইা হতে পারে না। অভিনয়ের প্রাকশর্ত হচ্ছে নিজ সত্তা বিলোপ। নিজেকে ভুলে নাটকের চরিত্র হতে হবে। দাম্ভিক মানুষ নিজেকে ভুলতে পারেনা। যত রিহার্সলই দিক না কেন, নিজের অজান্তে সে নিজেকে চরিত্রটির ওপর আরোপ করবে,নিজের ওপর চরিত্র আরোপ করবে না। – – – দাম্ভিক মানুষের কাছে নাট্যকারের উদ্দেশ্য মূল্যহীন, গোটা নাটকটার বক্তব্য গুরুত্বহীন, তার কাছে নাটক হচ্ছে নিজেকে জাহির করার একটা বাহনমাত্র”। নিভৃতচারী আনোয়ার হোসেন কোনদিন এই ‘জাহির’ বা ‘শো-অফ’ নামক শব্দের ধারে কাছে ভিড়েননি। 
    Oshomvob vaalo ekta lekha,ottonto mormosporshi!khub vaalo laglo!