Home » আন্তর্জাতিক » ওবামার কাছে খোলাচিঠি

ওবামার কাছে খোলাচিঠি

জেড নেট থেকে অনুবাদ মোহাম্মদ হাসান শরীফ

open-letter(নোবেল পুরস্কারজয়ী অ্যাডোলফো পেরেজ এসকুইভেল সম্প্রতি খোলা চিঠি লিখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে। এক নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর কাছে অপর জয়ীর চিঠি সবসময়েই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সিরিয়া সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে চিঠিটির গুরুত্ব আরো বেড়েছে।)

জনগণের চিৎকার শুনুন!

সিরিয়ার পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র আবারো বিশ্বের পুলিশি ভূমিকা গ্রহণ করে ‘স্বাধীনতা’ ও ‘মানবাধিকার’ রক্ষার নামে সিরিয়ায় আক্রমণ শানানোর প্রস্তাব করেছে।

আপনার পূর্বসূরি জর্জ ডব্লিউ বুশ তার মিসাইনিক (মানবজাতির ত্রাণকর্তা সংক্রান্ত) পাগলামিতে আফগানিস্তান ও ইরাকে তার মিসাইনিক যুদ্ধ শুরু করতে ধর্মীয় মৌলবাদকে উস্কে দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে, তিনি ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ঈশ্বর তাকে ইরাক আক্রমণ করতে বলেছেন। তিনি দাবি করলেন, ঈশ্বরই তাকে বিশ্বে ‘স্বাধীনতা’ রফতানি করার বার্তা পাঠিয়েছেন।

আপনি রেভারেণ্ড মার্টিন লুথার কিংয়ের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী এবং নোবেল পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রথম দাস কব্জাকারী গণতন্ত্রে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার সংগ্রামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারীর ‘স্বপ্নে’ সম্পূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। মার্টিন লুথার কিং ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি আমাদের সময়ের শহীদ। ওয়াশিংটনের সমাবেশের পর তারা তাকে হত্যা করেছিল। কারণ তিনি ভিয়েতনাম জনগণের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে যোগ না দিয়ে আইন অমান্য আন্দোলনের হুমকি দিয়েছিলেন। আপনি কি সত্যিই মনে করেন যে আরেকটি জনগণের উপর সামরিক হামলা চালিয়ে এই স্বপ্ন রূপায়ন করা যাবে?

আপনার দেশ এবং আপনার মিত্রদের কাছে ন্যাটোকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে বিদ্রোহীদের সশস্ত্র করা নতুন কিছু নয়। ব্যাপক ধ্বংসকারী অস্ত্র থাকার অভিযোগ তুলে কোনো কোনো দেশে আক্রমণ চালানোও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন ঘটনা নয়, ইরাকেও একই ধোঁয়া তুলে হামলা চালানো হয়েছিল, যদিও পরে দেখা গেছে, তা সত্য ছিল না। সাদ্দাম হোসেন সরকার যখন কুর্দি জনগণকে নিশ্চিহ্ন এবং ইরানি বিপ্লব ধ্বংস করার জন্য রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল তখন আপনার সরকার সেটা সমর্থন করেছিল। তখন অবরোধের কথা ওঠেনি। কারণ ওই সময়ে তারা [সাদ্দাম ও ইরাক] ছিল আপনাদের মিত্র। কিন্তু এখন আপনি সিরিয়ায় হামলা চালানোর প্রস্তাব করছেন। অথচ এখনো সিরিয়া সরকারই যে ওই হামলা চালিয়েছিল, সে সংক্রান্ত জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার যে অনৈতিক এবং সেটা যে নিন্দাযোগ্য, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ওই অজুহাতে আপনার সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনোই নৈতিক ভিত্তি নেই।

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, সিরিয়ায় সামরিক হামলার ফলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

বর্তমানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী আমার দেশ আর্জেন্টিনা স্পষ্টভাবেই সিরিয়া প্রজাতন্ত্রে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ঘোষণা করে ‘নতুন নতুন মৃত্যুর দুষ্কর্মে’ সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

পোপ ফ্রান্সিসও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক আন্দোলনের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান ঘোষণা করার জন্য একদিনের প্রার্থনা ও উপবাস পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি আপনাদের ঐতিহাসিক মিত্র যুক্তরাজ্যও এই হামলায় শরিক হতে (অন্তত এই মুহূর্তের জন্য) অস্বীকার করেছে।

আপনার দেশ ‘আরব বসন্ত’কে ন্যাটোর নরকে রূপান্তরিত করছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্ররোচনা দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক করপোরেশনগুলোকে অবাধ লুটপাটের লাইসেন্স দিয়ে দিচ্ছে। আপনি যে হামলার প্রস্তাব করেছেন সেটা কেবল আরো সহিংসতা এবং আরো মৃত্যুর পথ রচনা করবে, সেইসঙ্গে সিরিয়া এবং সার্বিকভাবে পুরো অঞ্চলকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলবে। কিসের জন্য? রবার্ট ফিস্কের প্রাণবন্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই হামলার লক্ষ্য হলো ইরান এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা স্থগিত রাখা। এটাই আপনার লক্ষ্য। শত শত সিরীয় শিশুর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে আপনি এই সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছেন না। আর এই হামলাটি এমন এক সময়ে চালাতে চাচ্ছেন, যখন ইরানের একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মডারেট সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে, যাদের মাধ্যমে বিদ্যমান সঙ্ঘাত আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব। আপনি এবং আপনার সরকার যে নীতি গ্রহণ করেছে, তা আত্মঘাতী হতে পারে।

সিরিয়ার প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান, সামরিক নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত যেসব সামাজিক সংস্থা শান্তির জন্য কাজ করছে, তাদের সমর্থন দেওয়া। অন্য যেকোনো সরকারের মতো সিরীয় জনগণেরও আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে এবং আমাদের উচিত সেগুলো অর্জনে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করা।

ওবামা, সিরিয়া বা অন্য কোনো দেশে আক্রমণ চালানোর কোনো নৈতিক অধিকার, বৈধতা কিংবা আইনগত ভিত্তি আপনার দেশের নেই। আপনার দেশ ব্যাপক ধ্বংসকারী বোমা ফেলে জাপানে দুই লাখ ২০ হাজার লোককে হত্যার চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক হালকা।

যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কংগ্রেসপারসনই আইনসম্মত নয় এমন বিষয়কে আইনসম্মত করতে পারেন না, বৈধ না থাকা বিষয়কে বৈধ করতে পারেন না। আমরা যদি কয়েক দিন আগে দেওয়া সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের বিবৃতিটি আমলে নিলে বিষয়টি বিশেষভাবে সত্য মনে হবে। তিনি বলেছিলেন : ‘যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিয়াশীল গণতন্ত্র নেই।’

আপনার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে টেলিফোনে আড়িপাতার যে কাজটি করেছে তা গলধকরণ কঠিন। কারণ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, মার্কিন নাগরিকদের ৬০ শতাংশ আপনি যে আক্রমণ চালাতে যাচ্ছেন তার বিরোধী।

আর তাই মিস্টার ওবামা আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আপনি কার কথা শুনবেন?

আপনার সরকার আন্তর্জাতিক ভারসাম্য এবং একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। এটা এমন এক দেশে পরিণত হয়েছে যা তার ক্ষমতা ও তার অর্থনীতি বজায় রাখার জন্য মৃত্যু রফতানি প্রতিরোধ করতে পারছে না। আমরা একাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টায় ক্ষান্তি দেব না।

সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতকারী হামলার আগে ১৯৯০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা চালানোর পর আমি ইরাকে গিয়েছিলাম। আমি গাইডেড মিসাইলের আক্রমণে ছিন্নভিন্ন নারী ও শিশুতে পরিপূর্ণ উদ্বাস্তু শিবির দেখেছি। আপনি এসবকে ‘সমভাবাপন্ন ক্ষতি’ হিসেবে অভিহিত করতে পারেন।

জনগণ এখন যুদ্ধ সম্পর্কে বলছে ‘যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়।’ মানবতা এখন শান্তির এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের কথা বলছে। জনগণ এখন তরবারিকে লাঙলের ফলায় পরিণত করতে চায়।

জনগণ এখন যুদ্ধ সম্পর্কে বলছে ‘যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়।’ মানবতা এখন শান্তির এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের কথা বলছে। জনগণ এখন তরবারিকে লাঙলের ফলায় পরিণত করতে চায়। তারা মনে করে ‘যুদ্ধংদেহী মনোভাব বদলানোর’ মাধ্যমেই তা করা সম্ভব।

মিস্টার ওবামা, আপনি নিশ্চয় ভুলে যাননি যে আমরা সবসময়েই যে বীজ বপণ করি, তার ফলই ভক্ষণ করি। প্রত্যেক মানুষের বিশেষ করে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী ব্যক্তির উচিত মানবতা ও শান্তির বীজ বপণ করা। আমি আশা করি মার্টিন লুথার কিং ‘ভ্রাতৃত্ববোধের স্বপ্ন’কে আপনি জনগণ এবং মানবতার দুঃস্বপ্নে পরিণত করবেন না।

আমার এই শান্তি ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।।

অ্যাডোলফো পেরেজ এসকুইভেল

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী