Home » রাজনীতি » চাপিয়ে দেয়া সাংবিধানিক কাঠামো এবং অপপ্রচার তত্ত্ব

চাপিয়ে দেয়া সাংবিধানিক কাঠামো এবং অপপ্রচার তত্ত্ব

ওমর ইব্রাহিম

propagandaতেতুঁল তত্ত্ব এবং চুল চত্ত্বের পর এবার নতুন এক তত্ত্ব হাজির হয়েছে যার নাম অপপ্রচার। গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তাবৎ ছানা পোনা নেতা প্রবীণ নেতা হঠাৎ নেতা সবাই অনুযোগ করছেন বিরোধী দল তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। কী অপপ্রচার? যেটা নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে। বিরোধী দল যে বলছে, বর্তমান জাতীয় সংসদ বহাল রেখে, প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকলে এবং এই নির্বাচন কমিশন থাকলে তারা নির্বাচনে যাবেন না এবং নির্বাচন হতেও দেবেন না এই ‘চরমপত্র’ কেও খুব একটা আমলে নিয়ে ক্ষমতাসীনরা অপপ্রচারকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন এবং তাদের উষ্মা বিদেশীদের কাছে বলা বিরোধী দলের কথা নিয়ে। তারা হুংকার ছাড়ছেন কোন বিদেশী কিছু করতে পারবে না সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই নির্বাচন হবে। আরও একটু আগ বাড়িয়ে কেউ কেউ বলছেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় সেভাবে নির্বাচন হবে। অথচ সমস্যা দেখা দিয়েছে এখানেই। অন্যান্য সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে মেয়াদ শেষে কিংবা তার আগে প্রধানমন্ত্রী ইস্তফা দেন তার মন্ত্রিসভাসহ তখন রাষ্ট্রপতির অনুরোধক্রমে একটি ছোট মন্ত্রিসভা নিয়ে নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন স্বাধীন স্বচ্ছ এবং বিস্তর ক্ষমতাশালী নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে। ওই ক্ষেত্রে অন্তবর্তী সরকারগুলো কোনোক্রমেই নির্বাচনকে প্রভাবিত করার বাসনায় কিংবা মানসে কোনো কর্মকাণ্ডই পরিচালনা করে না এবং তার সুযোগও নেই। যদি সুযোগ নেয়ার চেষ্টাও করা হয় সেক্ষেত্রে ওই সব দেশের অসীম ক্ষমতাধর নির্বাচন কমিশন যে ব্যবস্থা নেয় তা বহু ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবেই থেকে যায়। কাজেই ওই সব দেশে জ্বি হুজুর মার্কা নির্বাচন কমিশন নেই। কিন্তু বাংলাদেশে এখন সমস্যা তৈরি হয়েছে এখানেই। পঞ্চদশ সংশোধনী কেবল নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই বাতিল করেনি। তা প্রধানমন্ত্রীর ইস্তফার বিষয়টিকেও ধূম্রচ্ছন্ন করে ফেলেছে। প্রধানমন্ত্রী ইস্তফা নিচ্ছেন না বা মন্ত্রিসভাও ভেঙে দিচ্ছেন না, সংসদও বহাল থাকছে। মেয়াদ শেষের আগে তিন মাস সময়ের মধ্যে নির্বাচন করবেন তিনি তার সমস্ত অধিকার নিয়ে ক্ষমতার দাপট দিয়ে।

গণতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক মান কি এতে রক্ষা হয়? হয় না যে, এ কথাটা বলাই তাদের দৃষ্টিতে ‘অপপ্রচার’ হয়ে যাচ্ছে। এবং বিরোধী দল এ কথাটা বিদেশী যারা আসছেন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সম্ভাবনা যাচাই করতে তাদেরকে জানাচ্ছেন।

ক্ষমতাসীন দল যে সাংবিধানিক কাঠামোর কথা বলছেন তা ওই বিধানটি অর্থাৎ নতুন সংযোজিত ১২৩ () অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সম্পর্কে এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ সংযোজনের আগে অর্থাৎ আগের সংবিধানে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধানটি ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার এসে এই অনুচ্ছেদটি দুই ভাগে ভাগ করলো। ১২৩ () – এর () বলা হলো মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আবার () – তে বলা হলো মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে নির্বাচন হবে ভেঙে যাবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, সংসদটি তা হলে ভাঙবে কিভাবে? এখানেই হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের চাতুর্যপূর্ণ কৌশলটি। যেহেতু এই অনুচ্ছেদে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক নিয়ম নেই বরং আছে নানা প্যাচ গোছ আর ক্ষমতাসীন দলের পুরো সরকার এবং সংসদ থাকা অবস্থায় নির্বাচনের বিধান সেহেতু তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বেশি দিতে চাচ্ছেন না ক্ষমতাসীন দলের সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ভাষ্যকাররা। কারণ নিশ্চিতই এর সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে কোন দেশের বিধি বিধানের উদাহরণ তাদের হাতে নেই এবং ‘পবিত্র’ কোনো সত্যও তারা তুলে ধরতে পারছেন না। বলছেন বটে সাংবিধানিক কাঠামোর কথা কিন্তু এই সাংবিধানিক কাঠামো কে তৈরি করলো তা বলছেন না। বলছেন না যে এর ভিত্তিটা কি?

কাজেই ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গেছে, নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের সুবিধা মতো সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করেছেন তারা। তবে ওই টুকু করে ছেড়ে দিলে হয়তো একটা জোরালো কিছু থাকতো। কিন্তু সঙ্কটের কথা মাথায় রেখে সংবিধান বিশেষজ্ঞ যারা ‘নির্দেশনা মোতাবেক’ সংবিধানের নতুন কাঠামো তৈরি করেছেন তারা আর একটা বিধান জুড়ে দিয়েছেন সেটা ১২৩ () () অনুচ্ছেদে যাতে কিনা বলা হয়েছে, মেয়াদ অবসান ব্যতিত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। এই অনুচ্ছেদ মোতাবেক যদি নির্বাচন হয় তাহলে নির্বাচনকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী আর ক্ষমতায় থাকবেন না এবং সংসদটিও থাকছে না। বিরোধী দল যে বলছে, অনেক ছাড় দিয়ে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেও তারা নির্বাচনে যেতে রাজি আছে তা এই অনুচ্ছেদের কারণে। কিন্তু সরকারি দল বলছে, এই অনুচ্ছেদটি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে না ঠিক তখনই।

আসলে এটাও যে খুবই খোঁড়া যুক্তি তা সংবিধানের বিবেকবান ভাষ্যকাররা বোঝেন তা তিনি যে দলেরই হোন না কেন। নির্বাচনের তিন মাস আগে যদি প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার ইস্তফা দেয়ার বিষয়টা মানা হয় তাহলে আর সংসদের মেয়াদ বা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থাকার প্রশ্ন ওঠে না। কারণ সরকার না থাকলে প্রধানমন্ত্রী না থাকলে ইস্তফা দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার যুক্তি খাটে না। তৈরি হবে অপেক্ষাকৃত একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড।

এখন তাহলে কোনটা হচ্ছে অপপ্রচার ক্ষমতাসীনদেরটা না বিরোধী দলেরটা? এখনই দেখা যাচ্ছে আলোচনার কথা বলছেন কেবল বিদেশীরা। ক্ষমতাসীনরাও বলেন না বিরোধীরাও বলেন না। আর ক্ষমতাসীনরা জানেন আলোচনায় বসলেই সংসদ কিভাবে ভাঙবে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং কেন কার স্বার্থে এটা করা হয়েছে তার উত্তর দিতে হবে। সেটা তাদের জন্য হবে খুবই বিব্রতকর। তার ওপর ক্ষমতাসীন দলের সংবিধান বিশ্লেষক ভাষ্যকাররাও জানেন এর পেছনে গণতান্ত্রিক কোন যুক্তি নেই।

অতএব বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে এটা জনসাধারণকে বোঝানোরই এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বর্তেছে তাদের কাঁধে। কী সে অপপ্রচার তার মধ্যে কতোটা অসত্য এবং দূরভিসন্ধী আছে একদলীয় নির্বাচন করার (?) সেটা বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ লজ্জা পাচ্ছেন এবং আচনক আটকে যাচ্ছেন যুক্তি দেখাতে গিয়ে তা ইদানীংই বোঝা যাচ্ছে মধ্যরাতের টিভি টক শোতে। কথা উঠলেই তারা এমন একটা ভাব করেন যেন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তারা যে সব বিষয়গুলো সন্নিবেশিত করেছেন তা গায়েবিভাবে সংবিধানের মধ্যে ঢুকে পড়েছে এবং তাদেরকে কঠিন কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে এটা মেনে চলার জন্য অর্থাৎ নির্বাচন এর অধীনেই করতে হবে এবং জবরদস্তি হলেও গোঁ ধরে থাকার জন্য। সংবিধানের এই কাঠামোটা যে অতি কৃত্রিম এবং অস্বাভাবিক গণতন্ত্রহীন তাই বুঝতে পারছেন না ক্ষমতাসীনরা। এই একবিংশ শতাব্দীতেও ক্ষমতা যে গণতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখায় তার প্রমাণ এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না।

সরকার বলছে তারা প্রায় ৭ হাজার নির্বাচন করেছে নিরপেক্ষভাবে। কিন্তু সেগুলো যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনকে ওইগুলোর আদল দেয়া হবে কেমন করে? কেমন করে তা হবে এখন পর্যন্ত কেউ জানে না। সে কারণেই সবাই বলছে আলোচনার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কার সঙ্গে কার আলোচনা? দু’দলে দু’নেত্রী ছাড়া আর কে আছেন যে তারা আলোচনায় বসলে কোন সুফল ফলবে? আর কারই বা এখতিয়ার আছে?

আলোচনার বিষয়টা তাই অবাস্তব এবং বিভ্রান্তিকর। সমাধানটা হওয়ার একমাত্র জায়গা হচ্ছে সংসদ এবং সংবিধানের ওই কাঠামোগত যে পরিবর্তন করা হয়েছে সেই কাঠামোর পরিবর্তন করেই সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।।