Home » মতামত » ছাত্রলীগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া

ছাত্রলীগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

students-opinionঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ এখন তার ঐতিহ্য হারিয়েছে। এই ছাত্র সংগঠনটির কর্মকাণ্ড নিয়ে শিক্ষকশিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী সে কথাই জানিয়েছেন আমাদের বুধবারকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অমিয় কুমার বালা বলেন, ছাত্রলীগ এক আতঙ্কের নাম। তাদের অব্যাহত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে দেশের শিক্ষাকার্যক্রম এবং শিক্ষাঙ্গনের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। হেন অপকর্ম নেই যার সাথে সংগঠনটির নাম জড়িত নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের হাতে নিহত হয়েছে নিজ সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী। প্রতি ঘটনার পর ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের অপকর্মে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। সিলেটের ঘটনাতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সরকার ও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে নির্যাতিতদেরই নানাভাবে হয়রানি করছে। আইন এ ক্ষেত্রে নিজস্ব গতিতে চলছে না। আর এ জন্যই তারা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছে। সরকারের দায়িত্ব শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্বার্থে এমসি কলেজের ঘটনা এবং ইতঃপূর্বে সংঘটিত প্রতিটি অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুল আলম বলেন, কিন্তু থামানো যাচ্ছে কি ছাত্রলীগের এ বেপরোয়া গতি? ছাত্রলীগের ব্যাপ্তি ও ভয়াবহতায় ক্ষনেক্ষনে মনের ভেতর একটি প্রশ্নই ছাত্রলীগ কি অপ্রতিরোধ্য? তারা কি প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাধর? এমনতর প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। কারন ছাত্রলীগ এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে দেশের প্রধানমন্ত্রীর হুমকি ধমকিতেও এখন আর কাজ হচ্ছে না। ছাত্রলীগের বেপরোয়া আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের ‘অভিভাবকত্ব’ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন; প্রতিটি ঘটনায় হুশিয়ারীও উচ্চারণ করেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। যারা দল নেত্রীকে মানে না; যারা দেশের একজন প্রধানমন্ত্রীর আদেশ নির্দেশকে পরোয়া করে না, তারা কতটা বেপরোয়া তা সহজেই অনুমেয়। আর তাদের কাছে সাধারন মানুষের অসহায়ত্বের বর্ণনা দেয়ার বোধ করি প্রয়োজন পরে না। যদিও ছাত্ররাজনীতি গুণগত মান হারিয়েছে ’৯০ এর আন্দোলনের পর থেকেই। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অনেক নেতাই আদর্শচ্যুত হয়ে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়ে যায়। ডাকসু নেতা পরিচয় কাজে লাগিয়ে অনেকেই ঢাকা শহরে ২০টি ফ্ল্যাটের মালিক বনে যায়। ওয়ানইলেভেনের সময় এসব নেতার মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। ’৯০ পরবর্তী সময়ে ওই ধারা থেকে ছাত্ররাজনীতি আর বের হয়ে আসতে পারেনি। ছাত্রনেতা মানে নীতি বা আদর্শ নয় বরং টাকা বানানোর কারখানা এ রকম একটা ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ’৯১ ৯৬ সালে ছাত্রদলের ব্যানারে সব অপকর্ম করা হয়। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ছাত্রলীগ নেতারা একই কায়দায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নেমে পড়ে অর্থ উপার্জনের রাস্তায়। সেই যে অসুস্থ ধারা শুরু হয়েছে তা আজো অব্যাহত রয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী নাসিম বলেন, বিরোধী দল আওয়ামী লীগের তেমন কোনো ক্ষতি করতে না পারলেও ছাত্রলীগের কর্মকান্ডে যা ক্ষতি হয়েছে, তারপর তো বিরোধী দলের আর কিছু করার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে ছাত্রলীগে চেইন অব কমাণ্ড বলে কিছু নেই। এই যে কদিন আগে সিলেট এমসি কলেজের শত বছরের পুরোনো ছাত্রাবাসটি তারা পুড়িয়ে দিল, তাতে লাভ হলো কার? সিলেট শহরের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে এই ছাত্রাবাস পোড়ানোর ঘটনায়। এর জন্য তো ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগকেই চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। সিলেটের এ ঘটনা একটি উদাহরণ। এমন ঘটনা সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। এই ভীতিকর পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। লাগাম টেনে ধরতে হবে নিয়ন্ত্রণহীন বেপরোয়া ছাত্রলীগের। তা হলে আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে বড় আকারে। বর্তমান সরকারের অর্জন প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে যাচ্ছে এরা। তাই সময় থাকতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে নিজের ঘরের শত্রু ছাত্রলীগের কারণে চরম মূল্য দিতে হবে আওয়ামী লীগকে। নির্বাচনে আ’লীগকে শুধ ছাত্রলীগের কারণে লস করতে হবে। আর ছাত্রলীগকে এখনি নিয়ন্ত্রণে না নিলে তাদের বেপরোয়ার সুযোগ নিয়ে বিএনপিজামায়াত। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীকে এখনি কঠোর হাতে ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা নূরুল আলম বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনের উপস্থিতি না থাকলেও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড কিন্তু থেমে নেই। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা একাধিক দল উপদলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে নিয়মিত খুনখারাবিতে লিপ্ত থাকে। কদিন আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হোটেলে ফাউ খাওয়াকে কেন্দ্র করে ওই হোটেলে তারা তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। আবার দুই গ্রুপে মারামারি শুরু করলে পুলিশ তা থামাতে গেলে উভয় পক্ষ সম্মিলিতভাবে পুলিশের মাথা ফাটিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ইংরেজি বিভাগের জুবায়ের খুন হয়েছে গত জানুয়ারিতে। পদ্মা সেতুর নামে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে খুন হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ছাত্র আবদুল্লাহ আল হাসান। যে সংগঠনটি বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে গড়া, সেই সংগঠনকে তো কিছু দুর্বৃত্তের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সাম্প্রতিক কালে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের তেমন কোনো ক্ষতি করতে না পারলেও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে যা ক্ষতি হয়েছে, তারপর তো বিরোধী দলের আর কিছু করার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে ছাত্রলীগে চেইন অব কমাণ্ড বলে কিছু নেই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইয়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী লাবনী বলেন, বেপরোয়া ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরতে পারছে না সরকার। ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির নাম শুনলে এখন মানুষ আঁতকে ওঠে। প্রায়ই নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হচ্ছে সংগঠনটি। সংগঠনটির নেতাকর্মীদের সহিংসতায় ছাত্র, শিশু, সাংবাদিক, পুলিশসহ নিহত হয়েছে বহু লোক। গত সাড়ে ৪ বছরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব এবং প্রাধান্য বিস্তারে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ২ সহস্রাধিক। লাঞ্ছিত করা হয়েছে অগণিত শিক্ষক ও ছাত্রীকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা এমনকি এসিড নিক্ষেপের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধের ঘটনাও ঘটিয়েছে সংগঠটির নেতারা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এসব ঘটনার কোনো বিচার হয় না। ছাত্রলীগের এক সময়ের নেতা ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, বর্তমান সরকারের যা কিছু অর্জন তার সবই বিসর্জন দিয়েছে ছাত্রলীগ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিয়েও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের। শেষ মুহূর্তে এসে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নেতাকর্মীরা বেপরোয়া রূপে আবির্ভূত হলেও রাশ টেনে ধরতে পারছে না সরকার। এই সরকারের সাড়ে চার বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, হাজী দানেশ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২২ ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, শিবির নেতাকর্মী, সাধারণ শিক্ষার্থী ও মানুষ। বেপরোয়া ছাত্রলীগের কারণে সরকারি দলের বিপদ বাড়ছে। আর তাই অপ্রতিরোধ্য ছাত্রলীগকে সামাল দেয়া এখনই প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষার্থী বিপ্লব বলেন, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার চিত্রটি আরও একবার স্পষ্ট হয়েছিল। আর ছাত্রলীগের অন্তঃসারশূন্যতাও ফের উদ্ভাসিত হয়েছে। এখনও সময় আছে, ছাত্রলীগ নেতাদের বিশেষ করে কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত যেন ব্যর্থতায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে ভাবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে ব্যক্তিগতভাবে এ দু’জনকে চিনি। সে জায়গা থেকেই বলছি, আপনারা এই সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামোর দিকে নজর দিন। টাকা অথবা পেশিশক্তিনির্ভর নেতা নির্বাচন না করে প্রকৃত ছাত্রনেতাদের হাতে সংগঠনের দায়িত্ব দিন। মেধাবী ছাত্ররা যদি সংগঠনের দায়িত্ব পায় তবে হয়তো বা এই সংগঠন তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে। নতুবা কোনো একটি ঘটনা ঘটলে অনুপ্রবেশকারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে অথবা কয়েকজনকে বহিষ্কার করে সংগঠনের ভবিষ্যৎ পতনকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। ভাবছেন ছাত্রলীগ অনেক বড় সংগঠন; এর কর্মী সংখ্যাও অনেক। কিন্তু যদি কর্মীদের অধিকাংশই সুবিধাবাদী হয়, তবে বিপদের দিনে অথবা সংগঠনের দুর্দিনে সার্চলাইট দিয়েও তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করলে বিপদের দিনে রাগ ক্ষোভ আর অভিমানে তারাও রাজপথে নামবে না। তাই সময় থাকতেই সচেতন হওয়া জরুরি। আমাদের বিশ্বাস, মোধাবী, যোগ্য ও ত্যাগী কর্মীদের হাতে নেতৃত্বের ভার অর্পণ করা হলে হয়তো ছাত্রলীগের রাজনীতি কলুষমুক্ত হবে। তারা অন্তত এই সংগঠনের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করবে না। তারা চাইবে না তাদের কারণে সংগঠনের সুনাম ক্ষুন্ন হোক। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এ রকম যোগ্য নেতৃত্বের কারণে বারবার অস্থিতিশীল হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। আর ছাত্রলীগের রাজনীতি যদি ছাত্রদের কল্যাণের রাজনীতি হয়ে ওঠে, তবে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির চেহারাটাই বদলে যাবে। কারণ বৃহৎ এই ছাত্র সংগঠনের প্রভাবে অন্য সংগঠনও বদলে যেতে বাধ্য হবে।

জগ্ননাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সালেহ বলেন, ছাত্রলীগের নেতারা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনুগত কর্মীকে ব্যবহার করছে। কাল যখন এই কর্মী নেতা হচ্ছে, তখন সেও অনুরূপ কাজ করছে। ফলে বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আদর্শ ভুলে তারা এখন টাকার আদর্শের জয়গান গাইছে। যদি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করে দেশের কল্যাণে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রদের কল্যাণে কাজ করার মহান ব্রত নিয়ে কেউ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে আসত, অন্তত সেই ছাত্রটি কখনও ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করত না। নিরীহ পথচারী বিশ্বজিৎকে হত্যা করার প্রশ্নই আসে না।।