Home » রাজনীতি » জনগণের উপর আস্থাহীন সরকার

জনগণের উপর আস্থাহীন সরকার

ফারুক আহমেদ

peopleঅবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হস্তান্তর আমাদের দেশের গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং যুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৪২ বছর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সেই প্রাথমিক শর্তটুকু শাসকেরা তৈরি করতে পারেনি। অবস্থাদৃষ্টে বরং এটাই প্রতীয়মান হয় যে,শাসন সংকটই যেন বাংলাদেশে শাসকদের রাজনৈতিক ভিত্তি। কারণ রাজনীতিতে জনগণের আস্থার ওপর দাঁড়াতে হয়। বাংলাদেশে শাসকদের জনগণের ওপর সে আস্থা নেই। এ পর্যন্ত যারা যে নামেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তাদের কেউই জনগণের ওপর আস্থা রাখেনি। ফলে যে নামেই ক্ষমতায় গিয়েছে তারা শাসকরূপে আবির্ভুত হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ হলো জনগণের ওপর আস্থাহীনতার একমাত্র বৈধ মালিক। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর জনগণকে আস্থায় না নেওয়া এবং জনগণের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার যাত্রা আওয়ামী লীগই শুরু করে এবং এখন পর্যন্ত তা জারি রেখেছে।

১৯৭২ সালের সংবিধানের কথা বলা হয়। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে আর্জিত স্বাধীন দেশের শাসনতন্ত্র তৈরীর মত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ কি জনগণের রায়ের এবং জনমতের তোয়াক্কা করেছিল? ফলে ১৯৭২ সালের যে সংবিধান তৈরী করা হয়েছিল তা হয়েছিল আওয়ামী লীগের দলীয় সংবিধান। জনগণের রাজনৈতিক এবং সামরিক অংশগ্রহনে অসংখ্য আতœত্যাগের মধ্যদিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা একদিকে, অপরদিকে জনগণের তোয়াক্কা না করে একটি দল এককভাবে কর্তৃক শাসনতন্ত্র রচনা। ফলে শুরু থেকেই এর মধ্যে বৈপরিত্য থেকে গিয়েছে। মূলনীতিগুলোকে যেভাবে সামনে আনা হয়েছে ভিতরের ব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন ধারার মধ্যে থেকে গিয়েছে সেই নীতির স¤পূর্ণ বিপরীত অবস্থান। অর্থাৎ সংবিধানের মধ্যে শুরু থেকেই দুই রূপ রাখা হয়েছে। একটি লোক দেখানো আলংকারিক রূপ এবং অপরটি শাসকদের স্বার্থরক্ষার আইনি আসল রূপ। ফলে শাসকদের পক্ষ থেকে সংবিধানের সব রকমের দোহাই দেওয়াই সম্ভব হয়। নিজেদের সুবিধার জন্য তাদেরকে এই রূপ বদলাতেও হয়েছে বার বার। যতবারই সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে কখনোই তা জনগণের মত নিয়ে করা হয়নি। সংবিধান প্রণীত হওয়ার পর পর এ যে সব সংশোধনী অর্থাৎ সংবিধানে জরুরি অবস্থার বিধান, চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করা হয় স্বাধীনতা লাভের ঠিক পরপরই। আর এভাবেই সংবিধানে সন্নিবেশিত হয় গণবিরোধী কালাকানুন।

বর্তমানে নির্বাচন কিভাবে হবে তা নিয়ে শাসকদলগুলো জনগণের ওপর যে অন্যায্য সংকট চাপিয়ে দিয়ে তা জারি রেখেছে তার গোড়ায় আছে জনগণের ওপর আস্থাহীনতা। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি জনগণকে আস্থায় নেয়নি। তাই একটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচন করার জন্য তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল এবং জনগণ নিশ্চিত হয়েছিলেন তাদের দ্বারা একটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়। জনগণের অনেক ভোগান্তির মধ্যদিয়ে শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংশোধন করে শাসক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকাররের অধিনে নির্বাচনের এক সমঝোতায় আসে। সে নির্বাচনে আওয়ামীলীগ জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা জনগণের ওপর আস্থা রাখেনি। উপরন্তু গণবিরোধী নানা নীতির মধ্যদিয়ে জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। জনগণকে আস্থায় না নিয়ে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য তারা প্রশাসনকে এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে নির্বাচনে তাদের জয় নিশ্চিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাদের দ্বারা গঠিত হবে সেদিকে তারা নজর দেয়নি অথবা সে সময় সেদিকে নজর দেওয়ার বড়বেশি সুযোগ ছিল না। তাই তারা প্রশাসনের ওপর দৃষ্টি দিয়ে প্রশাসনকে সেভাবেই সাজিয়েছিল। কিন্তু সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান খুব দ্রুততার সঙ্গে প্রশাসনের রদবদল করেন। ফলে আওয়ামীলীগের সকল পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়ে যায়। বিচারপতি লতিফুর রহমানের সেই কর্মে আওয়ামীলীগের লোকেরা এখনও খোলাখুলিভাবেই কেঁদে থাকেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ভরাডুবি হয়। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়।

ক্ষমতার এই পরিবর্তনগুলোতে জয়ী দলগুলোর জয়ের পিছনে তাদের নিজেদের কৃতিত্ত্বের চেয়ে বিদায়ী ক্ষমতাসীন দলের কৃতিত্ব অনেক বেশি। নেগেটিভ ভোট বা নেতিবাচক ভোটেই এরা ক্ষমতায় আসে। তাই ক্ষমতাসীন হওয়ার পর জনগণের ওপর আস্থা রাখার যে রাজনৈতিক ভিত্তি তা এদের থাকে না। তাই ক্ষমতাসীন হওয়ার পর নিজেদের স্বার্থে নানা রকমের কালাকানুন এবং জনবিরোধী নীতি তারা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে থাকে। চারদলীয় জোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পরও তার কোন ব্যাতিক্রম হয়নি। তাই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য তাদেরকে অন্য পথ বেছে নিতে হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাদের নিয়ে গঠিত হবে সেদিকে নজর না দিয়ে শুধুমাত্র প্রশাসনিক রদবদলের ফাঁকিটুকু বিচারপতি লতিফুর রহমান ধরিয়ে দিয়ে গেছেন। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা ক্ষমতায় গিয়েই সে লক্ষ্যে কাজ করে দলীয় ব্যাক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বানানোর সকল ্আয়োজন পাকা করে। ফলে তার বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগের নের্তৃত্বে আন্দোলনের এক পর্যায়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের মধ্যদিয়ে যে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয় তারই পথ ধরে বেনামি সামরিক সরকার গঠিত হয়। দুই বছর পর নির্বাচনে ব্যাপকভাবে জয়ী হয়ে আওয়ামীলীগের নের্তৃত্বে মহাজোট ক্ষমতাসীন হয়। এদের এই ব্যাপক জয়ের পিছনেও পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন চারদলীয় সরকারের কৃতিত্বই বেশি। কাজেই দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন হতে এবং হয়ে জনগণের ওপর আস্থা রাখার কোন প্রয়োজন এখনও পর্যন্ত নেই।বর্তমান সরকারের মধ্যে তার লেশমাত্র দেখা যাচ্ছে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীনদের কারসাজির সকল উপায় তারা ব্যবহার করে ফেলেছে। এখন আর তা বহাল রেখে ক্ষমতাসীনদের কারসাজির কোন সুযোগ নেই। সেই কারণে বর্তমান সরকার সর্বপ্রথম কর্তব্য মনে করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের। এর জন্য তারা সংবিধান সংশোধন করে তারই আবার দোহাই দিয়ে চলেছে। এ কাজের জন্য তারা আদালতেরও দোহাই দিচ্ছে। জনগণের ওপর আস্থাহীনতা শাসকদের এমন এক জায়গায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে যে, নিজেদের সুবিধার জন্য তারা কখনো জাতীয় সংসদকে আদালতের অধীনস্থ করছে আবার কখনো সংসদের মাধ্যমে আদালতের ওপর চড়াও হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে তারা নিজেরা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যতই বলুক না কেন সংবিধান যেমন তাদের হাতের খেলনা, জনগণের রায় ছাড়াই একে যেমন খুশি তেমন কাটা যায় ছেঁড়া যায়, তেমনই এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তারা যেমন খুশি তেমন নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে।

আওয়ামীলীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কোথাও বলেনি যে, তারা ক্ষমতাসীন হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করবে। তাহলে সংসদে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্টতায় সংবিধান সংশোধন করলেই কি এ বিষয়ে জনমতের প্রতিফলন ঘটে যায়? এর পক্ষে জনরায় কোথায়? গণতন্ত্রের দিক থেকে দেখলে নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্বাচনী ইশতেহার নিছকই একটি কথার কথা নয়। নির্বাচনী ইশতেহারে এটা সেটার দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে সেসব না করা বা উল্টো কাজ করার অভ্যাস শাসক দলগুলোর আছে। জনগণের সঙ্গে এ প্রতারণা তারা সবাই সব সময়ই করে চলেছে। তবুও এর সাথে রাজনৈতিক শাসনতান্ত্রিক বিষয়গুলো একসাথে যায় না। তাই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, যে পদ্ধতিতে নিজেরাই নির্বাচিত হয়ে এসেছে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা বাতিল করা কোন মতেই জনগণের রায়ের প্রতিফলন

নয়। কাজেই যে সংবিধানের সংশোধন জনগণের মত ছাড়াই শাসক দলগুলো বহুবার করেছে তার দোহাই দেওয়ার অর্থ হলো জনগণকে আস্থায় না নিয়ে তার সঙ্গে প্রতারণা করা ছাড়া আর কিছু নয়।

জনগণকে আস্থায় না নিলে যা হতে পারে বাংলাদেশে তাই হয়েছে। এখানে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জনগণের জীবন জীবিকার, জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোন রকমের কর্মসূচীর বা জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার কোন প্রয়োজন হয় না। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের জনগণের ওপর তাণ্ডবের কৃতিত্বে¡ই অপর অংশ ক্ষমতায় যেতে পারে। তাই তাদের আর কোন রাজনৈতিক কর্মসূচীর প্রয়োজন পড়ে না। এ কারণে এই দলগুলো আর জনগণের রাজনৈতিক দল নয়। এখানে কোন নীতি আদর্শের প্রশ্ন নয়। এই দলগুলো হলো সংগঠিত পেশিশক্তি। তাই জনগণ এদের লক্ষ্য নয়। সংকট সমাধানের জন্য এরা জনগণের দারস্থ না হয়ে বরং এরা দ্বারস্থ হয় তাদের বিদেশি প্রভুদের। বাংলাদেশে এখন সেই তৎপরতাই চোখে পড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দাতা বলে কথিতরা এখন বেশ তৎপর।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সংগঠিত পেশি শক্তির এই দলগুলোর কাছে বর্তমান সংকট কোন সংকট নয়। এ সংকট তারা জনগণের ওপর চাপিয়ে রেখেছে। এদের জনস্বার্থ এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী নীতি, ব্যাপক দুর্নীতি, লুটপাট, সন্ত্রাস সহ অসংখ্য গণবিরোধী অবস্থানের ফলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং এই সঙ্কটকে জিইয়ে রেখেই তারা জনগণকে শাসসন করতে চায়। কিন্তু এর ফলে জনগণের দিক থেকে সরকারের ওপরে অনাস্থার সৃষ্টি হয় তা তারা আমলে নেন না। এই দেখাটা এখন এমন হয়েছে যে,তাদের কিছুটা সচেতন এবং কিছুটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে এ সংকটকে জিইয়ে রাখা এবং শাসক দলগুলোর রাজনৈতিক দল রূপ থেকে নিজেদের নিজেরাই বিলুপ্ত করে সংগঠিত পেশিশক্তির দলে পরিণত হওয়াতে সমাজের মধ্যে যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণের জন্য অগণতান্ত্রিক এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে এখন তাই হচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ শাসক দলগুলোতো বটেই তার সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী নামে পরিচিতদের মেরুণ্ডহীনতা। এদের নিজেদের কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী নেই। শাসক দলগুলো যে সংকট জনগণের ওপর চাপিয়ে রাখে তার স্বরূপ তুলে ধরার যোগ্যতা তাদের নেই। জনগণের পক্ষের কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী তাদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।

অতীতের মত জনগণকে জিম্মি করে এরা একভাবে যখনই হোক নির্বাচন করবে কিন্তু এই সংকটকে নির্মুল করবে না। বরং এই সংকটকে তারা জনগণের ওপর চাপিয়েই রাখবে। এই সংকটে তারা আক্রান্ত হয় না। এ সংকটে আক্রান্ত হচ্ছেন জনগণ। তাই জনগণই পারে এর স্থায়ী সমাধান করতে।।