Home » প্রচ্ছদ কথা » জনপ্রিয়তায় ধস – টিকে থাকার শেষ চেষ্টা

জনপ্রিয়তায় ধস – টিকে থাকার শেষ চেষ্টা

হায়দার আকবর খান রনো

politicsবর্তমান সংসদের অধিবেশন বসেছে। সম্ভবত এটাই শেষ অধিবেশন। সংবিধানের সংশোধনী আনতে হলে এটাই শেষ সুযোগ। আগামী নির্বাচনকে অর্থবহ ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে এই অধিবেশনে সংশোধনী এনে প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনতে হবে। কারণ তারা বলে দিয়েছে কোনো অবস্থাতেই দলীয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনে তারা যাবেন না। এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বেন না। প্রধানমন্ত্রীর কথা নিয়ে বেশ খানিকটা শব্দের খেলা, ইংরেজিতে যাকে বলে PUN হয়ে গেল। একদা PUNএ দক্ষ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের শিবরাম চক্রবর্তী। সাহিত্যে PUN বেশ রস যোগ করে তা উপভোগ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু এতো রাজনীতির জায়গা। সেখানে চুল শব্দটি নিয়ে যে ধরনের চুলাচুলি হয়ে গেল তা মোটেও তৃপ্তিদায়ক নয়। শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা যে ‘এক চলুও নড়বো না’ তার প্রতি উত্তরে খালেদা জিয়া বললেন, ‘আন্দোলনের তোড়ে সব চুল উড়ে যাবে।’ এই ধরনের বাক্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রীদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। কিন্তু এই বাক্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা বললেন তা আরও অরুচিকর। তিনি বললেন, ‘ওনার সবকিছুই তো নকল, চুলও নকল, নকল চুল উড়ে যাবে।’

বস্তুত এই ধরনের সাংস্কৃতিক মান ও রুচিবোধ এতে আমাদের দুই প্রধান দলের নেতানেত্রীদের। দেশের সর্বনাশ হয়েছে অনেকাংশে সেই কারণে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। বড় দুই শাসক দল কোন একটা সমঝোতায় আসতে না পারলে সংঘাত, অস্থিতিশীলতা অনিবার্য এবং সেক্ষেত্রে যেটুকু গণতন্ত্র এখনো আছে তাও থাকবে না। কোন অপশক্তি চেপে বসতে পারে।

শেখ হাসিনা বলছেন, তিনি সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বেন না। কিন্তু ২০০৮ সালে যে সংবিধানের অধীনে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন সেই সংবিধান পরিবর্তনের কোন নির্বাচনী কর্মসূচি অথবা খোদ আওয়ামী লীগসহ কোনো মহল থেকেই এ রূপ দাবি কখনই ওঠেনি। হঠাৎ করেই তিনি নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধান তুলে দিয়ে নতুন সংবিধান বানালেন। অতএব সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বেন না বলে তিনি যে অত্যন্ত নীতিনিষ্ঠ হিসাবে নিজেকে দেখাতে চাচ্ছেন, বাস্তব ঘটনা কিন্তু তা নয়। তিনি নিজেই সংবিধান সংশোধন করে (পঞ্চদশ) যে সংবিধান বানিয়েছেন, তা আবার সংশোধন করে পুরনো জায়গায় ফিরে যাওয়া যায়।

এই নিয়ে এক আলোচনায় জনৈক সরকার দলীয় নেতার সঙ্গে মৃদু বিতর্ক হচ্ছিল। তিনি বললেন, ওটা তো আমরা বাধ্য হয়েছি। কারণ হাইকোর্ট নিজেই নির্দেশ দিয়েছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান রাখা যাবে না। আমরা কি করবো? আমি বললাম, ‘হাইকোর্ট কিন্তু আরও একটি কথা বলেছিল। আগামী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হোক, তবে কিছু শর্ত ছিল।’

আমার আওয়ামী বন্ধু বললেন, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে কিন্তু এসব কথা নেই। আমার জবাব ছিল, কোন বিচারপতি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর যে রায় দেন তা কতোখানি গ্রহণযোগ্য সেটাও তো প্রশ্নসাপেক্ষ। আমার আওয়ামী বন্ধু তারপর অন্য যুক্তি আনলেন। হ্যাঁ, হাইকোর্টের রায়ে বলা ছিল, সব কিছু সংসদে পাস করতে হবে। আমি বললাম, যথার্থ। যে কোন আইন বা আইনি (সংবিধানী আইনসহ) পরিবর্তন তো সংসদে পাস করাতে হবে। আপনাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে পাস করিয়ে নিন। ব্যাস। মিটে গেল সমস্যা।

তিনি বললেন, না আমরা পার্লামেন্ট দ্বারা এই আইন পাস করাবো না। এবার তিনি ভিন্ন যুক্তি ও নীতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। অনির্বাচিত কেউ একদিনের জন্যও ক্ষমতায় বসুক, এটা মানা যায় না।

বাহ! তাহলে ১৯৯৫ সাল ও ১৯৯৬ সালে কেন তত্ত্বাবধায়ক দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। সেদিন বিএনপি যুক্তি হিসেবে যা বলেছিল তাই ই এখন আওয়ামী লীগের মুখে এবং অন্যদিকে বিএনপি এখন সেদিনের আওয়ামী লীগের সুরে কথা বলছে। এর মধ্যে যুক্তির সারবত্তা নেই, আর নেই আন্তরিকতা। সরকারে থাকলে তত্ত্বাবধায়কের বিধান চাই ননা। কেননা সরকারি অবস্থান থেকে কারচুপি করা ও প্রশাসনকে ব্যবহার করা সহজ। আর সরকারের বাইরে থাকলে তত্ত্বাবধায়ক চাই। সম্ভবত শেখ হাসিনা জনপ্রিয়তা যে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এটা টের পেয়ে আগেভাগেই তত্ত্বাবধায়কের বিধান বাতিল করেছেন। আর বিরোধী দল (১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, ২০১৩ সালে বিএনপি) ঠিক একই কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবো না বলে সদম্ভ ঘোষনা দিচ্ছেন।

আলোচনার এই পর্যায়ে আওয়ামী নেতা বললেন, তখন মাগুরার নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করতে। এখন তো আমরা ক্ষমতায়, আমরা তো আর ভোট ডাকাতি করবো না।

আমি বললাম, ভরসা কোথায়? মাগুরার উদাহরণ যেমন আছে তেমনি আছে টাঙ্গাইলের দৃষ্টান্তও জোর করে হারিয়ে দেয়া হয়েছিল। সবই তো চোখের সামনে হয়েছে। তাই জনগণ কোন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আস্থা পায় না।

যুক্তিতর্কে, বিশেষত কূটতর্কে কোন সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে না। সঙ্কট নেই বলে চোখ বুঁেঝ থাকলেও সঙ্কট অপসারিত হবে না। বরং প্রতিদিন গভীরতর হচ্ছে।

তাই উদ্বেগ বাড়ছে জনগণের। চাপ বাড়ছে সরকার, বিরোধী দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ওপর। এমতাবস্থায় সংসদ অধিবেশন বসেছে। এখনো পর্যন্ত সমাধানের কোন প্রস্তাব আসেনি সরকারের পক্ষ থেকে। প্রস্তাব সরকারকেই দিতে হবে, কারণ সংসদে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে আলোচনা বা সমঝোতা সরকারের পর্দার অন্তরালেই হয়। সংসদ তাকে বৈধতা দেয় মাত্র।

বিরোধী দল বলছে আগের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলেও চলবে, শুধু চাই নির্দলীয় সরকার প্রধান। সরকারি দল কখনো কখনো বলছে, পঞ্চদশ সংশোধন পরবর্তী সংবিধানের ভেতরেই সমাধান আছে। থাকলে সেটা বলুন। আমরা চাই সমঝোতা হোক, এবং সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন হোক। অন্যথায় ভবিষ্যত ভয়াবহ।

বিদেশী চাপও রয়েছে। জাতিসংঘ পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্কটে ভূমিকা রাখতে চাচ্ছে। বান কি মুন ফোন করেন দুই নেত্রীর কাছে। মার্কিন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে উদ্যোগ নিচ্ছেন। সমঝোতার কথা বলছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যে চীন দীর্ঘদিন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় থেকে দূরে থাকতো, তারাও এখন বক্তব্য রেখেছে, বলেছে সমঝোতা চাই।

আমরাও মনে করি, সমঝোতা চাই। সে জন্য ছাড় দিতে হবে। নির্বাচন ইস্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধাপরাধীর বিচার, জামায়াত, হেফাজতের ইস্যু। সমঝোতার ব্যাপারে বিএনপি আন্তরিক হলে তাকে ছাড়তে হবে এই অপশক্তিকে। অন্যদিকে গণতন্ত্রকে (যেটুকু এখনো আছে) অব্যাহত রাখতে হলে আওয়ামী লীগকে ছাড় দিতে হবে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে। অন্তত নির্বাচনকালীন সময়ে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী থেকে সরে আসতে হবে।

আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা যে এখন শূন্যের কোঠায় তা প্রায় সকলেই বলছেন। মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব বেশি নয়। বিএনপি আমলের দুর্নীতির কথা মানুষ ভুলে গেছে। কারণ তার সামনে এখন রয়েছে বর্তমান সরকারের আরও বড় বড় ও আরো বিস্তৃত দুর্নীতির ঘটনাসমূহ। তারেক রহমান কতো টাকা বিদেশে পাচার করেছে সেটা যতো না মানুষকে উদ্বিগ্ন ও উত্তেজিত করে তার চেয়ে অনেক বেশি আতঙ্কিত করে ঘৃণাবোধ জাগ্রত করে যখন স্থানীয় পর্যায়ের কোন মাস্তান তার সামান্য সম্পত্তিটুকু কেড়ে নেয়, সামান্য কারণে হত্যা করে এবং উঠতে বসতে অপমান তো করছেই।

মিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের হিসাব সাধারণ মানুষ রাখতে পারে না। হাজার কি বড় জোর লাখের উপর সে ধারণাটুকু করতে পারে না। হল মার্কের কেলেঙ্কারির কথা বোঝে কিন্তু দুর্নীতির টাকার পরিমাণ কতো তা পরিমাপ করতে পারে না। কারণ অর্থের পরিমাণটা অনেক অনেক বড়। কিন্তু চাকরি দেব বলে যখন কেউ লাখ টাকা নেয়, কিন্তু চাকরি হয় না, ধর্না দিয়ে জবরদস্তি করে যখন গরিব বা মধ্যবিত্তের হাজার হাজার টাকার সম্পত্তি বেহাত হয় তখন মানুষ সরকার বদলের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। সন্ত্রাস যখন গায়ের ওপর এসে পড়ে মাস্তানের ভয়ে চুপসে থাকতে হয়, অপমানিত হতে হয় অথবা ঘরের মেয়েটিকে লাঞ্ছিত হতে হয় (গুম, হত্যা তো আছেই) তখন মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে। উপরন্তু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, অরাজকতা, বেকারত্ব, অনাহার অর্ধাহার তো আছেই।

সরকার উন্নয়নের বিরাট ফিরিস্তি তুলে ধরছে বিল বোর্ডে। সরকরারের পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু মানুষ অঙ্ক কষে বিচার করে না। উন্নয়নের ছোয়া যদি তার গায়ে না লাগে অথবা লাগলেও তা যদি দলীয় মাস্তানের কারণে ফের লোপাট হয়ে যায়, তখন তারা হয় অভ্যুত্থান না হয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের চিন্তা করে। বিএনপির মতো দুর্নীতিপরায়ণ ও সুবিধাবাদী দল অভ্যুত্থানের পথে যেতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে হয়তো এখনো পর্যন্ত কোন দৃশ্যমাণ শক্তিশালী তৃতীয় বিকল্প না থাকাতে জনগণ বিএনপিকেই এবার ভোট দেবে, যেমন দিয়েছিল ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগকে।

শেখ হাসিনার সরকার সেটা আচ করেছেন বহু আগেই। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করেছেন। এখনো চেষ্টা হচ্ছে পরাজয়ের খেলাকে কোনোভাবে জেতানো যায় কিনা। এক তরফা নির্বাচন, কারচুপি ইত্যাদির পরিকল্পনা যদি তাদের মাথায় থাকে, তাহলে সেটা তাদের জন্যই মারাত্মক ভুল হবে।

গণরায়কে মেনে নেয়াই ভালো। জনগণকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনোভাবে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টা কখনই সফল হতে পারে না।

গণতন্ত্র কতোটুকু থাকবে অথবা রাজনীতির ধারা কোনদিকে মোড় নেবে তা প্রধানত সরকারি দল এবং কিছুটা বিরোধী দলের ওপর নির্ভর করছে। তবে একটু দীর্ঘমেয়াদী হিসেব করলে দেখা যায়, রাজনীতি গণতন্ত্রের ধারায় ও জনস্বার্থে পরিচালিত হতে পারে তখনই যখন জনগণের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের মিলিত কোনো শক্তিশালী তৃতীয় বিকল্প দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। শেষ ভরসা সেখানেই আওয়ামী লীগ বিএনপিতে নয়।।